বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের অনেক বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে | সম্প্রতি রাজধানীর পূর্বাচলে পুলিশের একজন অতিরিক্ত ডিআইজির বিলাসবহুল বাড়িতে ডিবি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আকস্মিক অভিযান পরিচালনার পর থেকেই মূলত পুলিশ কর্মকর্তাদের গোপন সম্পত্তি ও দুর্নীতির বিষয়টি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে | পূর্বাচলের বিভিন্ন আকর্ষণীয় প্রজেক্টে পুলিশ কর্মকর্তাদের নামে একাধিক আলিশান ফ্ল্যাট, প্লট ও বাড়ি তৈরি করে তা ভাড়ায় খাটানোর চাঞ্চল্যকর তথ্য গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের চোখ এড়ায়নি | শুধু দেশের ভেতরেই নয়, বরং দেশের বাইরেও অঢেল অর্থ পাচার করে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে এই বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে | এছাড়া তাদের সন্তান-সন্ততিরা কীভাবে দেশের নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা ইউরোপ-আমেরিকার ব্যয়বহুল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে তীব্র সংশয় ও প্রশ্ন | চাকরির সুনির্দিষ্ট বেতনের সঙ্গে তাদের এই অস্বাভাবিক জীবনযাত্রার কোনো মিল খুঁজে না পাওয়ায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন কঠোর অবস্থান নিয়েছে |
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঠিক পরপরই সাবেক ও বর্তমান অনেক পুলিশ কর্মকর্তার এই স্ফীত সম্পদ ও ব্যাংক হিসাবের বিবরণ দেখে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও রীতিমতো হতবাক হয়ে গেছেন | এই নজিরবিহীন দুর্নীতির তথ্য হাতে পাওয়ার পর থেকেই দুদক এবং গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সাবেক ও বর্তমান পুলিশ সদস্যদের সম্পদের ওপর বিশেষ নজরদারি বা স্পেশাল ওয়াচ রাখছে | বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে যে, ইতোমধ্যে সন্দেহভাজন পুলিশ কর্মকর্তাদের একটি বিশাল তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং সরকারের হাইকমান্ড বা উচ্চপর্যায় থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে | স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ বাহিনীর ভেতরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন অসাধু ও দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির ফিরিস্তি এখন গোয়েন্দা সংস্থার টেবিলে জমা পড়েছে | পিআরবি বা পুলিশ রেগুলেশনস বেঙ্গলসহ প্রচলিত যাবতীয় বিধিবিধান ও আইন লংঘন করে রাজনৈতিক দলের সরাসরি আজ্ঞাবহ হয়ে যারা জনগণের সেবা বাদ দিয়ে দলীয় স্বার্থ উদ্ধার করেছেন, তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জোর প্রস্তুতি চলছে |
গোয়েন্দা সংস্থার গোপন তালিকাটিতে সাবেক বেশ কয়েকজন আইজিপি, অতিরিক্ত আইজিপি, ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি এবং এসপিসহ পুলিশের বহু প্রভাবশালী কর্মকর্তার নাম জোরালোভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে | এদের মধ্যে অনেকেই বিগত সময়ে ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে ঢাকা, গাজীপুর, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে বেনামি জমি, প্লট, ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক ব্যবসা গড়ে তুলেছেন | অতীতেও বেশ কিছু পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার নজির দেখা গেছে | উদাহরণস্বরূপ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কর্মকর্তা ও সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম এবং তার স্ত্রীর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদক তাদের সম্পদ বিবরণী তলব করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে, যেখানে প্রাথমিক অনুসন্ধানেই প্রায় তিন কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের হদিশ মিলেছে | একইভাবে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় কর্মরত পরিদর্শক মোখলেছুর রহমান বা ফখরুদ্দীন ভূঞার বিরুদ্ধেও আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়েছে | আলোচিত সাবেক ডিআইজি হারুন অর রশীদ এবং সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে অর্থ পাচারের মামলা এবং তদন্ত কার্যক্রম ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে |
পুলিশের এই অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়গুলো অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে দুদক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মূলত সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে চুলচেরা বিশ্লেষণ চালিয়ে যাচ্ছেন | কোনো একজন পুলিশ কর্মকর্তা যখন দায়িত্ব পালন করেন, তখন তার বৈধ আয়ের সঙ্গে অর্জিত সম্পত্তির পরিমাণের কোনো সামঞ্জস্য আছে কি না, পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের নামে বেনামি সম্পত্তি কেনা হয়েছে কি না এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঘুষ বা অনৈতিক সুবিধা নেওয়া হয়েছে কি না—সেগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে | বিশেষ করে মামলা গ্রহণ, নিখুঁত তদন্ত প্রক্রিয়া প্রভাবিত করা, আসামি গ্রেপ্তার বা ছেড়ে দেওয়া, থানা এলাকায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন অপরাধপ্রবণ এলাকায় অভিযান পরিচালনার নামে বড় অংকের চাঁদাবাজি ও অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগগুলো খুব গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে | তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, কাউকে উদ্দেশ্যমূলক বা অহেতুক হয়রানি করা তাদের লক্ষ্য নয়, কেবল সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ এবং গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে |
অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বা জটিলতার বিষয় হলো এই সমস্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ‘প্রকৃত মালিকানা’ বা বেনামি রূপ উদঘাটন করা | অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, কোনো বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, প্লট বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কাগজে-পত্র্রে অন্য কোনো সাধারণ ব্যক্তির বা আত্মীয়ের নাম ব্যবহার করা হয়েছে, অথচ এর পেছনে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন খোদ কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা তার নিকটআত্মীয় | এই লুকোচুরি ভেদ করতে দুদক ও গোয়েন্দারা এখন অর্থ লেনদেনের সঠিক উৎস, ক্রয়মূল্য পরিশোধের ব্যাংক রেকর্ড, ঋণের সঠিক নথি এবং অংশীদারত্বের চুক্তিগুলো অত্যন্ত কঠোরভাবে যাচাই করছেন | বিশেষ করে পুলিশ কর্মকর্তাদের সন্তানরা বিদেশে কোন উৎস থেকে অর্থ নিয়ে পড়াশোনা করছে এবং তাদের জীবনযাত্রার খরচ কীভাবে মেটানো হচ্ছে, তার পেছনে থাকা আর্থিক সহযোগীদের পরিচয় উদঘাটনের কাজও সমানতালে এগিয়ে চলছে | গুটিকয়েক দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতা লোভী কর্মকর্তার এমন অসাধু কর্মকাণ্ডের কারণে আজ গোটা পুলিশ বাহিনীর দীর্ঘদিনের গৌরব ও সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলে মনে করেন সচেতন মহল |
গোয়েন্দা ও দুদকের তালিকায় যাঁদের নাম অত্যন্ত জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে, তাঁদের একটি বিশাল অংশ বিগত দেড় দশক ধরে পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পদে থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন | এই দীর্ঘ তালিকায় সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ছাড়াও ডিএমপির সাবেক কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া, খন্দকার গোলাম ফারুক ও শফিকুল ইসলাম, আলোচিত অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ, পিবিআইর সাবেক প্রধান বনজ কুমার মজুমদার, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি ওয়াই এম বেলালুর রহমান, সিআইডির সাবেক প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া, দেবদাস ভট্টাচার্য্য, খন্দকার লুৎফুল কবীর, মীর রেজাউল আলম, আবদুল বাতেন, চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির, শেখ নাজমুল আলম, মাহবুব আলম, মো. মনিরুজ্জামান, জয়দেব কুমার ভদ্র, ইমাম হোসেন, মো. আসাদুজ্জামান, শাহ মিজান শফিউর রহমান, আনিসুর রহমান, মোল্যা নজরুল ইসলাম, এসএম মোস্তাক আহমেদ, জিহাদুল কবীর, মো. ইলিয়াস শরীফ, শাহ আবিদ হোসেন, মো. জামিল হাসান, সৈয়দ নূরুল ইসলাম, বিপ্লব বিজয় তালুকদার, হামিদুল আলম, ড. শামসুন্নাহার, শেখ রফিকুল ইসলাম, ড. একেএম ইকবাল হোসেন, বিপ্লব কুমার সরকার, মারুফ হোসেন সরদার, বিজয় বসাক, সুব্রত কুমার হালদার, আ স ম মাহতাব উদ্দিন, মোহা আহমারুজ্জামান, খন্দকার নূরুন্নবী, এসএম মেহেদী হাসান, মোহাম্মদ জায়েদুল ইসলাম, প্রলয় কুমার জোয়ারদার, এসএম শফিউল্লাহ, মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন, আসমা সিদ্দীকা মিলি এবং গোলাম মোস্তফা রাসেলের মতো প্রভাবশালী ও শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারাও রয়েছেন |
আইনগত দিক থেকে সরকারি কর্মচারীদের নিয়মিতভাবে তাদের সম্পদের হিসাব বা বিবরণী দাখিল করার সুস্পষ্ট আইনি বিধান থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ অত্যন্ত নগণ্য বা প্রায় অনুপস্থিত বললেই চলে | সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ১৩ নম্বর বিধিতে প্রতিটি সরকারি চাকুরের জন্য তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ঘোষণা এবং পরবর্তীতে সম্পদে কোনো ধরনের পরিবর্তন ঘটলে তার বিবরণ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়ার কঠোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে | বিগত ২০২৪ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর সরকারের তরফ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় সব সরকারি কর্মচারীকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের নিজ নিজ সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল | কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সেই নির্দেশনা জারির পরও পুলিশ প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা বা সদস্যই তা আমলে নেননি এবং হিসাব জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে একধরনের অনীহা ও লুকোচুরি বজায় রেখেছেন | ফলশ্রুতিতে অতীতে এই জবাবদিহিহীনতার সুযোগ নিয়ে দুর্নীতিবাজরা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে |
পরিশেষে বলা যায় যে, রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পবিত্র দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীর ভেতরে এই ধরনের ব্যাপক দুর্নীতির বিস্তার কোনোভাবেই বরদাস্ত করা যায় না | জনগণের ট্যাক্সের অর্থে চলা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীকে যারা ব্যক্তিগত আয়ের হাতিয়ার বানিয়েছিলেন, তাদের মুখোশ উন্মোচন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি | গোয়েন্দা সংস্থা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের চলমান এই জোরালো নজরদারি এবং বিশেষ তদন্ত প্রক্রিয়া যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে পুরোপুরি নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়, তবে তা ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের প্রশাসনিক দুর্নীতি রোধে একটি শক্তিশালী দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে | আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে এবং দুর্নীতিমুক্ত একটি জবাবদিহিমূলক জনবান্ধব পুলিশ প্রশাসন গড়ে তুলতে এই অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন জাতির সর্বস্তরের মানুষের প্রত্যাশায় পরিণত হয়েছে |
তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর