• বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০১:১৫ পূর্বাহ্ন

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করছে সরকার

Reporter Name / ৫ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ সহজলভ্য করার লক্ষ্যে আবারও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার ২৯৫টি ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করে একটি জাতীয় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করেছিল। তবে আগের সরকারের সেই তালিকা কার্যকর না করে, বর্তমান বিএনপি সরকার নতুন করে এই তালিকাটি হালনাগাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে ২২ সদস্যের একটি শক্তিশালী ‘জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠন করা হয়েছে। গত রোববার (২১ জুন) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে সভাপতি করে গঠিত এ পরিষদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি এবং ঔষধ শিল্প সংশ্লিষ্ট সংগঠনের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সদস্য করা হয়েছে। এই কাউন্সিলের নেতৃত্বে থাকবেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব।

পরিষদের অন্যান্য উচ্চপদস্থ সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন—স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান, অর্থ বিভাগের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব এবং খাদ্য, শিল্প, বিদ্যুৎ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবরা। এছাড়া মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের সচিব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি ও রসায়ণ বিভাগের চেয়ারম্যান এবং এফবিসিসিআই, বিএপিআই ও বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যাল সোসাইটির সভাপতিদের এই পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নতুন গঠিত এই ‘জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ’-এর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হবে কেবল প্রচলিত অ্যালোপ্যাথিক ওষুধই নয়, বরং আয়ুর্বেদিক, ইউনানি, হোমিওপ্যাথিক, বায়োকেমিক, হারবাল ও ভেটেরিনারি ওষুধের মধ্য থেকেও প্রয়োজনীয় ওষুধকে ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ’ হিসেবে ঘোষণা করে তালিকা প্রকাশের বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রতি দুই বছর অন্তর এই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বাধ্যতামূলকভাবে হালনাগাদ করার বিষয়ে তারা কাজ করবে। এছাড়া এই কমিটি বছরে অন্তত দুইবার বৈঠকে বসবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত (কো-অপ্ট) করতে পারবে।

এর বাইরে, এই পরিষদ জাতীয় ঔষধনীতি বাস্তবায়ন, দেশীয় ঔষধ শিল্পের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে ওষুধের উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিতকরণ বিষয়ে সরাসরি সরকারকে গাইড করবে। একই সঙ্গে ওষুধ এবং এর কাঁচামাল আমদানি, উৎপাদন ও রপ্তানি-সংক্রান্ত বিষয়ে নীতিগত পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা এবং ওষুধ উৎপাদন, আমদানি, বিতরণ ও বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধনে ভূমিকা রাখবে। জরুরি পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় যেকোনো বিষয়েও এই পরিষদ সরকারকে তাৎক্ষণিক পরামর্শ দিতে পারবে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইকিউভিআইআই-এর এক চাঞ্চল্যকর তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে প্রতি ১০০ টাকা ব্যয়ের মধ্যে ৪৪ টাকাই খরচ হয় শুধু ওষুধের পেছনে, যেখানে বৈশ্বিক গড় খরচ মাত্র ১৫ টাকা। ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুসারে, ওষুধের এই উচ্চমূল্যের কারণে দেশের প্রায় ৬১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। ২০১৬ সালে সর্বশেষ অ্যান্টিবায়োটিক, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি, ডায়াবেটিস ও ভিটামিনসহ ২৮৬টি ওষুধকে অত্যাবশ্যকীয় তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল, যার মধ্যে মাত্র ১১৭টি ওষুধের দাম সরকার নির্ধারণ করতে পারত। প্রতিবছর এই তালিকা হালনাগাদ করার নিয়ম থাকলেও বিগত ১০ বছর ধরে এর কোনো কার্যকর তদারকি করা হয়নি।

পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি এক গেজেটের মাধ্যমে আগের ১১৭টি ওষুধের সাথে আরও ১৭৮টি ওষুধ যুক্ত করে মোট ২৯৫টি ওষুধের তালিকা অনুমোদন দিয়েছিল। তৎকালীন নীতিতে ওষুধের দাম নির্ধারণে বিজ্ঞানভিত্তিক কাঠামো তৈরি এবং প্রতিটি ওষুধ কোম্পানিকে তাদের মোট বার্ষিক বিক্রয়ের অন্তত ২৫ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহ করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছিল। জেনেরিক ওষুধের ক্ষেত্রে খুচরা বিক্রয়মূল্যে সর্বোচ্চ ৩৩ শতাংশ মার্ক-আপ নির্ধারণের বিধানও রাখা হয়েছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ এ প্রসঙ্গে বলেন, “প্রস্তুতকৃত তালিকাটি সরকার চাইলে সরাসরি বাস্তবায়ন করতে পারত, তবে নতুন করে হালনাগাদ করার সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানানো যায়। তবে খেয়াল রাখতে হবে, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম এমনভাবে নির্ধারিত হোক যাতে সাধারণ রোগী এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান—উভয় পক্ষই লাভবান হয়”।

তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে এই তালিকার দ্রুত ও সফল বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটি নিশ্চিত করতে একটি উপযুক্ত আইনি কাঠামোর আওতায় দেশের ওষুধ প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর সংস্থায় রূপান্তর করতে হবে।

তথ্যসূত্র: সমকাল ও জাগো নিউজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category