জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচারের উদ্দেশ্যে পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দিন দিন মামলার পাহাড় জমলেও সেই অনুপাতে নিষ্পত্তি বা রায়ের সংখ্যা অত্যন্ত ধীরগতির। বিগত প্রায় দুই বছরে ট্রাইব্যুনালে তদন্ত ও বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেলেও এ পর্যন্ত চূড়ান্ত রায় এসেছে মাত্র ছয়টি মামলার। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এবং ট্রাইব্যুনাল-২— এই দুটি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে আরও ২০টি গুরুত্বপূর্ণ মামলা। এর পাশাপাশি ৩৮টি অভিযোগের গভীর তদন্ত কার্যক্রম চালুর পাশাপাশি প্রাথমিক বাছাই শেষে আরও অর্ধশতাধিক অভিযোগ রাখা হয়েছে। প্রসিকিউশন দপ্তরে ইতোমধ্যে জমা পড়ে থাকা শত শত অভিযোগের পর্যালোচনা অব্যাহত থাকায় ভবিষ্যতে বিচারাধীন মামলার চাপ আরও বহুগুণ বাড়বে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। একটি মামলার চূড়ান্ত বিচার ও রায় পেতে বেশ কয়েক মাস সময় লেগে যাওয়ায় দ্রুত বিচার পাওয়ার প্রত্যাশায় থাকা জুলাইয়ের শহীদ পরিবার ও আহতদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা আরও প্রলম্বিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দায়ের হওয়া ও তদন্তের আওতাভুক্ত মোট ৫৮টি মামলায় আসামির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৯৪ জনে। এই বিশাল সংখ্যক আসামির মধ্যে বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবাস করছেন ১৪৭ জন, আর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মূল আসামিদের একটি বড় অংশ এখনও পলাতক রয়েছে। এ পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ছয়টি রায়ে মোট ৬২ জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। সাজার তালিকায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন এবং ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান। এছাড়া ট্রাইব্যুনালের রায়ে সাভারের আশুলিয়ায় হত্যা ও লাশ পোড়ানো, রংপুরের শহীদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড এবং রাজধানীর চানখাঁরপুল ও রামপুরার নৃশংস ঘটনার বিচার সম্পন্ন হয়েছে।
তবে বিচারের গতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংক্ষুব্ধ ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছে। প্রসিকিউশনের কাজের চাপ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বর্তমানে প্রতিদিন একসঙ্গে চার থেকে পাঁচটি মামলার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। একটি মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালে অন্য মামলার কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে মামলার বর্তমান চাপ সামাল দিয়ে যথাসময়ে রায় নিশ্চিত করতে বিচারিক আদালতের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রসিকিউশন টিম, তদন্তকারী কর্মকর্তা ও লজিস্টিক সহায়তা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এবং সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম উভয়ই মনে করেন যে, দুটি ট্রাইব্যুনাল দিয়ে এত বিশাল সংখ্যক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব নয়। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও জাতীয় সংসদে নিশ্চিত করেছেন যে, বিচার ত্বরান্বিত করতে প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনাল ও জনবল বৃদ্ধি করা হবে।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অপরাধের পাশাপাশি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৫ বছরের শাসননামলে সংঘটিত গুম, খুন ও নির্যাতনের বহু ঘটনাও এখন ট্রাইব্যুনালের বিচারিক আওতায় আসছে। সম্প্রতি ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের মামলায় শেখ হাসিনা ও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। একই সাথে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় দলটির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আইনি প্রক্রিয়া চলছে। ট্রাইব্যুনাল-২-এ ইতোমধ্যে কুষ্টিয়ার একটি হত্যা মামলায় রায় অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে এবং ওবায়দুল কাদেরসহ সাত নেতার বিচারিক যুক্তিতর্ক চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আওতায় নতুন নতুন অপরাধের তথ্য ও অভিযোগ যুক্ত হতে থাকায় আদালতের গঠনগত পরিবর্তন ও ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো ছাড়া দ্রুত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা