• শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০৮:৩১ অপরাহ্ন
Headline

আমলাদের বিদেশ ভ্রমণ বিলাস বন্ধে কঠোর বার্তা সরকারপ্রধানের

Reporter Name / ৪ Time View
Update : শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

খিচুড়ি রান্না শেখা, এসি চালানো বোঝা কিংবা ঘাস চাষের অভিজ্ঞতা অর্জন—সরকারি কর্মকর্তাদের এমন অদ্ভুত সব অজুহাতে বিদেশ সফরের বায়না এদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে নতুন কোনো বিষয় নয়। বিভিন্ন সময়ে এসব বিচিত্র উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ খরচ করে বিদেশ ভ্রমণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বারবার জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও হাসির খোরাক জুগিয়েছে। তবে এবার অতীতের সমস্ত রেকর্ডকে ছাড়িয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে মশা নিয়ন্ত্রণ শিখতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরের একটি অদ্ভুত প্রস্তাব। তবে এই প্রস্তাবিত সফরের চেয়েও বর্তমানে দেশজুড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা ও প্রশংসা কুড়াচ্ছে এই সংক্রান্ত ফাইলের ওপর সরকারপ্রধানের দেওয়া অত্যন্ত বাস্তবমুখী ও কঠোর একটি মন্তব্য। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় এই ফাইলটিতে তাঁর কঠোর অভিমত ব্যক্ত করেছেন, যা আমলাতন্ত্রের এই অন্যায্য বিলাসিতার বিরুদ্ধে একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি অত্যন্ত যৌক্তিক পরামর্শ দিয়ে বলেছেন যে, মশা দমন বা নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল শেখার জন্য এই মুহূর্তে সরকারি টাকায় আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকার ফ্লোরিডায় যাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সরকারপ্রধানের এই মন্তব্যটি কেবল কোনো চটজলদি রসিকতা বা উপহাস ছিল না, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে একটি গভীর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বার্তা, যা দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা আমলাদের সফর বিলাসের সংস্কৃতিকে সরাসরি আঘাত করেছে।

দীর্ঘদিন ধরে দেশের প্রশাসনিক রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা সরকারি অর্থ উড়িয়ে বিদেশ ভ্রমণের এই সংস্কৃতিকে যারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, তারা সবাই সরকারপ্রধানের এই সময়োপযোগী মন্তব্যকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন। সাধারণ মানুষ ভাবছে, অতীতে মশা মারতে কামান দাগার গল্প অনেক শোনা গেলেও, মশা মারার সাধারণ বিদ্যা অর্জন করতে খোদ আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার মতো বিলাসী চিন্তার পেছনে কী ধরনের প্রশাসনিক মানসিকতা কাজ করতে পারে। কিন্তু এই মশার গল্পের রেশ কাটতে না কাটতেই দেশের আরেকটি বড় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান তথা রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নতুন এক সফরের ফাইল নিয়ে হাজির হয়েছে। এবার আর মশা মারার কোনো বিষয় নয়, এবার তাদের ভ্রমণের বিষয় হলো আলো। রাজশাহী শহরের রাস্তাঘাট আরও আধুনিক উপায়ে আলোকিত করতে এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার সরজমিনে দেখতে ফ্রান্সে যাওয়ার জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন রাজশাহীর বর্তমান প্রশাসক মাহফুজুর রহমান। যদিও এই ফরাসি সফরের বিষয়ে প্রশাসক নিজে দাবি করেছেন যে এটি কেবলই একটি প্রযুক্তি দেখার আমন্ত্রণ এবং এর সাথে কোনো কেনাকাটা বা নতুন চুক্তির সম্পর্ক নেই। একই সাথে তিনি আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন যে স্থানীয় সরকার मंत्रालয়ের আনুষ্ঠানিক অনুমতি ছাড়া তারা কোনো দেশেই যাচ্ছেন না, তবুও আমজনতার মনের ভেতরের মূল প্রশ্নটিকে তিনি এড়াতে পারছেন না।

আমাদের দেশের সরকারি বা বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ভেতরের নথি উল্টালেই একটি সাধারণ চিত্র দেখা যায়, যেখানে অভিজ্ঞতা অর্জন কিংবা দক্ষতা বৃদ্ধির সুদৃশ্য নামে একটি বিশাল অঙ্কের বাজেট বিদেশ সফরের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা করে বরাদ্দ রাখা হয়। মূল প্রকল্পের কাজ মাঠে কতখানি বাস্তবায়িত হলো বা না হলো, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের খুব একটা মাথাব্যথা না থাকলেও, বিদেশ সফরের কোটাটি যেন কোনোভাবেই অপূর্ণ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে মরিয়া থাকেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কারণ এই সমস্ত তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক বিদেশ সফরে গেলে দৈনিক মোটা অঙ্কের ভ্রমণ ভাতা বা টিএ-ডিএ পাওয়া যায়, যা মূল বেতনের বাইরে একটি বিশাল অতিরিক্ত আকর্ষণ। এর পাশাপাশি সরকারি খরচে দলবলসহ উন্নত দেশগুলো ঘুরে আসার একটি চমৎকার ও বৈধ সুযোগ তৈরি হয়। আবার বর্তমান আমলাতান্ত্রিক সমাজে কে কতবার সরকারি খরচে বিদেশে গেলেন, সেটাকে অনেকেই মেধার চেয়েও বেশি নিজেদের সামাজিক ও প্রশাসনিক পদমর্যাদার অন্যতম বড় প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন।

কিন্তু এই সমস্ত পশ্চিমা দেশ ভ্রমণের পেছনে যে বিশাল খরচ করা হয়, তার সাথে আমাদের ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা রাজশাহীর মতো শহরের বাস্তব পরিস্থিতির কতখানি মিল আছে, তা নিয়ে তীব্র সংশয় রয়েছে। আমেরিকা বা ফ্রান্সের মতো উন্নত দেশগুলোর আধুনিক প্রযুক্তি, জলবায়ু এবং নগর ব্যবস্থাপনা কি হুবহু এনে আমাদের দেশের সীমিত সম্পদ ও ঘনবসতিপূর্ণ বাস্তবতায় খাটিয়ে দেওয়া সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তরটি বোধহয় যেকোনো সচেতন নাগরিকের কাছেই একেবারেই নেতিবাচক। এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। দুর্নীতিবিরোধী এই সংস্থার মতে, স্বয়ং সরকারপ্রধানের এত বড় কঠোর বার্তা ও নির্দেশনার পরেও যখন কর্মকর্তারা সড়কবাতির মতো একটি সাধারণ নাগরিক প্রযুক্তি দেখার জন্য ফ্রান্সের মতো ব্যয়বহুল দেশে যাওয়ার ফাইল রেডি করতে পারেন, তখন বুঝতে হবে আমাদের সামগ্রিক প্রশাসনিক জবাবদিহিতার জায়গায় এক বিশাল গলদ রয়ে গেছে।

জনগণের কষ্টার্জিত ট্যাক্সের টাকা এভাবে অর্থহীন ও বিলাসী উদ্দেশ্যে অপচয় করার অধিকার কোনো সরকারি কর্মকর্তার নেই। যতক্ষণ না পর্যন্ত সরকারি এই সমস্ত বিদেশ সফরের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট, কঠোর ও জবাবদিহিতামূলক জাতীয় নীতিমালা তৈরি হচ্ছে, ততক্ষণ এই অপচয় রোধ করা সম্ভব নয়। এই নীতিমালায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে লেখা থাকতে হবে যে ঠিক কী অপরিহার্য কারণে কোনো কর্মকর্তা বিদেশে যাচ্ছেন, সেই প্রযুক্তি বা জ্ঞান কেন দেশে বসেই অর্জন করা সম্ভব নয় এবং বিদেশ থেকে ফিরে এসে তিনি দেশের মূল অর্থনীতি বা সেবায় কী ধরনের সুনির্দিষ্ট অবদান রাখছেন। এই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে কাগজ-কলমে হুঁশিয়ারি দিয়ে আমলাদের এই গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক বিদেশ ভ্রমণ বিলাস কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না।

 

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category