উন্নয়ন ও অগ্রগতির নানা সূচকে বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে গেলেও দেশের কন্যাশিশুদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে এখনও রয়ে গেছে এক অন্ধকার ও করুণ বাস্তবতা। আধুনিক সমাজে যেখানে শিক্ষার আলো এবং সমান সুযোগের মাধ্যমে প্রতিটি কন্যাশিশুর আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার কথা, সেখানে দেশের প্রায় অর্ধেক নারী এখনও তাঁদের শৈশব ও কৈশোর হারিয়ে ফেলছেন বাল্যবিবাহের নির্মম যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক তহবিল ইউনিসেফের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে অপ্রাপ্তবয়সে বিয়ের এই ভয়ংকর ও উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাটির আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রতি দুইজন তরুণী ও নারীর মধ্যে একজনের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে আঠারো বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই। কৈশোরের চঞ্চল দিনগুলোতে যখন তাঁদের বইখাতা নিয়ে বিদ্যালয়ে থাকার কথা, তখন বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হওয়ায় তাঁদের শিক্ষা, স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ এবং সুস্থ জীবনের সার্বিক সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথ সহায়তায় পরিচালিত সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে বা এমআইসিএস ২০২৫’-এর বিস্তারিত পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় এই সংকটের গভীরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাতীয় পর্যায়ের এই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে কুড়ি থেকে চব্বিশ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশেরই আনুষ্ঠানিক বিয়ে হয়ে গেছে আঠারো বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। এর চেয়েও আরও বেশি আতঙ্কজনক ও হৃদয়বিদারক তথ্য হলো, একই বয়সী তরুণীদের মধ্যে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়ে গেছে মাত্র পনেরো বছর বয়স পেরোনোর আগেই। অর্থাৎ শারীরিক ও মানসিকভাবে পূর্ণাঙ্গ বিকাশ লাভ করার বহু আগেই হাজার হাজার কিশোরীকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে দাম্পত্য জীবনের জটিল দায়িত্ব এবং গর্ভধারণের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে কঠোর আইন ও সচেতনতামূলক নানা প্রচারণার পরও তৃণমূল সমাজে বাল্যবিবাহের বিস্তার এখনও কতটা শক্ত শিকড় গেড়ে বসে রয়েছে।
বাল্যবিবাহের এমন করুণ বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি বাংলাদেশে তিন দিনের এক নিবিড় ও তাৎপর্যপূর্ণ সরকারি সফর সম্পন্ন করেছেন ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল। সফরকালে তিনি দেশের শিশু ও কিশোরীদের বাস্তব পরিস্থিতি নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেন এবং তাদের সার্বিক সুরক্ষায় তিনটি অত্যন্ত জরুরি ও সুনির্দিষ্ট অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। তাঁর প্রস্তাবিত এই পদক্ষেপগুলোর প্রথমটি হলো, সমাজ থেকে বাল্যবিবাহের অভিশাপ চিরতরে দূর করে প্রতিটি মেয়েকে যেকোনো মূল্যে বিদ্যালয়ে ধরে রাখা এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন নিরবচ্ছিন্ন রাখা। দ্বিতীয়টি হলো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের গুণগত মান বাড়াতে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ ব্যয় করার যে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অঙ্গীকার রয়েছে, তা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা। আর তৃতীয় অগ্রাধিকারটি হলো, কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য উপযুক্ত ও মানসম্মত শিক্ষার সার্বিক সুযোগ অবারিত করা।
তিন দিনের এই মাঠপর্যায়ের সফরে ক্যাথরিন রাসেল সরাসরি প্রান্তিক শিশুদের জীবনসংগ্রামের মুখোমুখি হন। তিনি রাজধানী ঢাকার অন্যতম বৃহৎ বস্তি কড়াইলে সরেজমিনে যান এবং সেখানকার নিম্নবিত্ত পরিবারের কিশোরী ও অভিভাবকদের সঙ্গে বসে কথা বলে তাদের দৈনন্দিন বঞ্চনার কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প এবং পার্শ্ববর্তী স্থানীয় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন এলাকায় যান। সেখানে শিশুদের অধিকার রক্ষা ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে স্থানীয় সম্প্রদায়ের অগ্রণী ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি। বিশেষ করে ঢাকার কড়াইল বস্তিতে সফরকালে বাল্যবিবাহের হাত থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা পাওয়া চৌদ্দ বছর বয়সী এক অদম্য কিশোরী বুশরার সঙ্গে সাক্ষাতের আবেগঘন অভিজ্ঞতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন ক্যাথরিন রাসেল।
বুশরার সাহসিকতা ও তাকে রক্ষার গল্পটি তুলে ধরে ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক জানান যে অভাব আর সামাজিক চাপে বুশরার শৈশব যখন অকালে বিয়ের ঝুঁকিতে পড়েছিল, তখন ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত স্থানীয় শিশু সুরক্ষা কেন্দ্রের নেতৃবৃন্দ অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা বুশরার বাবার সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করে তাঁকে বাল্যবিবাহের কুফল ও আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে সচেতন করেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই বিয়ে বন্ধ করতে সক্ষম হন। ফলে বুশরার শিক্ষাজীবন রক্ষা পায়। ক্যাথরিন রাসেলের মতে, বুশরার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে তৃণমূল পর্যায়ে কমিউনিটি বা সামাজিক নেতৃত্বকে সম্পৃক্ত করা গেলে বাল্যবিবাহ কার্যকরভাবে প্রতিহত করা সম্ভব। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে যদি দেশের প্রতিটি কন্যাশিশুকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখা যায় এবং তাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়, তবে তারা কেবল নিজেদের জীবনকেই বদলে দেবে না, বরং পরিবার, সমাজ এবং সামগ্রিকভাবে পুরো বাংলাদেশের জন্য এক আলোকিত ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে নেতৃত্ব দেবে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বাল্যবিবাহ একটি মেয়ের জীবনের সবচেয়ে বড় মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন। ইউনিসেফের পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে অপ্রাপ্তবয়সে বিয়ের সরাসরি প্রথম আঘাতটি আসে কিশোরীদের শিক্ষার ওপর। একবার বিয়ের পিঁড়িতে বসলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। এর পরপরই তৈরি হয় অল্প বয়সে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপরিকল্পিত গর্ভধারণের মারাত্মক ঝুঁকি। চিকিৎসকদের মতে, শারীরিকভাবে অপরিণত অবস্থায় গর্ভধারণের ফলে প্রসবকালীন জটিলতা, রক্তক্ষরণ এবং মাতৃমৃত্যুর আশঙ্কা বহুলাংশে বেড়ে যায়। এছাড়া অল্প বয়সে জন্ম দেওয়া শিশুরা প্রায়শই কম ওজন নিয়ে জন্মায় এবং অপুষ্টি ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়। সাংসারিক জীবনের চাপে তাদের নিজস্ব মেধা বিকাশ ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সকল সম্ভাবনা রুদ্ধ হয়ে পড়ে, যা তাদের আজীবন পরনির্ভরশীলতার শৃঙ্খলে বন্দি করে রাখে।
ঢাকা সফরকালে ক্যাথরিন রাসেল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গেও এক উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে তিনি দেশের শিশু সুরক্ষা, নারী শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতের টেকসই উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপ ও অঙ্গীকারের ভূয়সী প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন যে শিশুদের উন্নয়ন কেবল মুখের কথায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, বরং জাতীয় বাজেটের বরাদ্দের মাধ্যমেই রাষ্ট্রের প্রকৃত অগ্রাধিকার প্রকাশিত হয়। রাসেল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে বলেন যে একটি দেশের জাতীয় বাজেটই হলো তার ভবিষ্যৎ রূপরেখার আসল দর্পণ। শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষায় অর্থ বরাদ্দ দেওয়াকে কোনো অনুদান বা খরচ হিসেবে দেখা উচিত নয়; এটি মূলত বাংলাদেশের আগামী দিনের ভিত্তি বিনির্মাণে সবচেয়ে লাভজনক দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ। তাই বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ দ্রুত জাতীয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার কার্যকর রূপরেখা বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।
অন্যদিকে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মানবিক আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উদারতা ও ঐতিহাসিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক। তবে তিনি অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে নিজ দেশে ভয়াবহ সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে রোহিঙ্গা শিশুরা ইতিমধ্যেই তাদের জীবনের সোনালী শৈশব হারিয়ে ফেলেছে। এমন পরিস্থিতিতে শরণার্থী শিবিরের নতুন প্রজন্ম যদি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত হয়, তবে তাদের ভবিষ্যৎ চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে এবং এটি গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই কোনো অবস্থাতেই যেন রোহিঙ্গা শিশু এবং তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় উদার জনগোষ্ঠীর সন্তানেরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা বাড়ানোর জোর তাগিদ দেন তিনি।
সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের শতকরা প্রায় অর্ধেক নারীর বাল্যবিবাহ হয়ে যাওয়ার এই তথ্য কেবল একটি সাধারণ পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট ও সতর্কসংকেত। কন্যাশিশুদের সুরক্ষায় শুধু আইনের কঠোর প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; এর সাথে প্রয়োজন দারিদ্র্য দূরীকরণ, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, বিদ্যালয়গুলোতে মেয়েদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি এবং উপবৃত্তি ও পুষ্টি সহায়তার মতো কার্যকর প্রণোদনা। পরিবার ও সমাজে যতক্ষণ পর্যন্ত মেয়েদের বোঝাস্বরূপ মনে করার সনাতন মানসিকতা দূর না হবে এবং প্রতিটি কন্যাকে রাষ্ট্রের অমূল্য মানবসম্পদ হিসেবে বিবেচনা না করা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। ইউনিসেফের এই সময়োপযোগী বার্তা গ্রহণ করে প্রতিটি মেয়েশিশুর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে সরকার ও সমাজকে আজ একযোগে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
তথ্যসূত্র: বনিক বার্তা