• সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:১৭ পূর্বাহ্ন
Headline
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে একসঙ্গে কাজ করতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর রূপরেখা ও নীতিমালা অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে : ধর্ম প্রতিমন্ত্রী নানা সংকটেও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে কাজ করছে সরকার স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই : রাশেদ খাঁন দক্ষ জনশক্তি গড়তে কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই: শিক্ষামন্ত্রী শুমারির মাধ্যমে দেশের সব নৌযানের তথ্য সংগ্রহ করা হবে: প্রতিমন্ত্রী গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ঢেলে সাজাতে আসছে হেলথ হাব: স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত আইজিপি হলেন পুলিশের ৫ কর্মকর্তা গুম-খুন-নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারের জন্য হচ্ছে নতুন অধিদপ্তর সততা ও মেধার ভিত্তিতে পদোন্নতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

ঈদে মিলাদুন্নবী নিয়ে বিত’র্ক কেন?

Reporter Name / ৪ Time View
Update : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬

প্রতি বছর পবিত্র রবিউল আউয়াল মাসের বারোতম দিনে বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের নানা প্রান্তে এক চেনা আবহ তৈরি হয়, যেখানে উৎসবমুখর পরিবেশে লাখো মানুষের আনন্দমিছিল, জাঁকজমকপূর্ণ জুলুস, ঘরে ঘরে মিলাদ মাহফিল এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে নানা মতের তীব্র যুক্তি-তর্ক দেখা যায়। একদিকে বিশাল আকotরের জনসমাগম ও নবীপ্রেমের জোয়ারে চারপাশ মুখরিত থাকে, অন্যদিকে অপর একটি পক্ষ একে সম্পূর্ণ সুন্নাহর পরিপন্থী ও শরিয়তে নিষিদ্ধ নতুন প্রথা বলে জোরালো দাবি তোলে। আপাতদৃষ্টিতে দুই পক্ষই একই মহামানব শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার দাবিদার হলেও তাদের মধ্যকার এই মতপার্থক্য এবং তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব বেশ পুরোনো। জন্মদিনের এই পবিত্র আনন্দ প্রকাশ এবং এর শরিয়তসম্মত রূপরেখা নিয়ে চলা এই দীর্ঘদিনের বিতর্কের গভীরে রয়েছে ইতিহাস, হাদিসের ব্যাখ্যা এবং যুগপৎ নানা সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসন।
ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের মূল ধারণার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মহানবীর জন্মদিনে আনন্দ প্রকাশের বিষয়টি, যেখানে ‘মিলাদ’ শব্দটির অর্থ জন্মকাল বা সময় এবং ‘ঈদ’ শব্দটির তাৎপর্য উৎসব বা আনন্দ। প্রবক্তার পক্ষে অবস্থানকারী সুফি ও বেরলোভী ঘরানার গবেষক ও আলেমরা মনে করেন যে, নবীজির গুণকীর্তন, সাহাবিদের শান অনুযায়ী প্রশংসাসূচক কবিতা পাঠ কিংবা তাঁর আগমনকে কেন্দ্র করে আনন্দ করা কখনোই শরিয়তে নিষিদ্ধ নয়। তাদের প্রধান যুক্তি হিসেবে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের উল্লেখ করা হয়, যেখানে মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমতপ্রাপ্তির পর শুকরিয়া আদায় বা আনন্দ প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নবীজির নিজের জীবনের একটি ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয় যে, তিনি প্রতি সোমবার নিয়মিত রোজা রাখতেন এবং এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন যে এই দিনেই তিনি জন্মলাভ করেছিলেন এবং তাঁর ওপর ঐশী বাণী বা ওহী নাজিল হয়েছিল। এই হাদিসটিকে সামনে রেখে প্রবক্তারা দাবি করেন যে, স্বয়ং নবীজি নিজের জন্মবারটিকে বিশেষ গুরুত্ব ও স্মরণের মাধ্যমে অতিবাহিত করেছেন, ফলে উম্মতের পক্ষ থেকেও এই দিনে বিশেষ সম্মান বা আনন্দ প্রকাশ করা কোনো গর্হিত কাজ হতে পারে না।
তবে এই উৎসবমুখর আয়োজনের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিবর্তন, যা নবী যুগের বহু শতাব্দী পর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। প্রবক্তাদের বয়ানে উঠে আসে যে রাসূলের জীবদ্দশায় কিংবা খিলাফত রাশেদা তথা সাহাবি ও তাবেঈনদের স্বর্ণযুগে এই ধরনের নির্দিষ্ট কোনো বার্ষিক উৎসব বা ঘটা করে জন্মদিনের অনুষ্ঠান পালনের কোনো প্রথা বা অস্তিত্ব ছিল না। প্রথম বড় পরিসরে এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এর প্রচলন শুরু হয় হিজরি ষষ্ঠ শতাব্দীর গোড়ার দিকে, যখন ইরাকের ইরবিলের তৎকালীন শাসক বাদশাহ মোজাফ্ফার উদ্দিন কোকবুড়ি জাঁকজমকপূর্ণভাবে এই দিনটি উদযাপন শুরু করেন এবং পরবর্তীতে মিশরের ফাতেমী রাজবংশসহ বিভিন্ন মুসলিম অঞ্চলে তা ক্রমান্বয়ে বিস্তার লাভ করে। এই ঐতিহাসিক পটভূমির কারণেই এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিরোধীরা। তাদের মতে, সাহাবিরা যারা নবীর জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তারা যদি এই দিনটি উদযাপন করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ বা সুন্নাত মনে করতেন, তবে আবু বকর, ওমর, ওসমান কিংবা আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুমের খিলাফতকালে অন্তত একবারের জন্য হলেও এর কোনো না কোনো দৃষ্টান্ত পাওয়া যেত।
ঈদের দিন নির্ধারণ ও শরিয়তের মৌলিক কাঠামোর বিষয়টি সামনে এনে দেওবন্দী, আহলে হাদিস ও সালাফি ঘরানার আলেমরা তাদের বিরোধিতার পক্ষে প্রধান কয়েকটি শক্ত দলিল উপস্থাপন করেন। তাদের মূল বক্তব্য হলো ইসলামে নির্ধারিত উৎসব বা ঈদ কেবল দুটি—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা, যা মদিনায় হিজরতের পর স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। এর বাইরে তৃতীয় কোনো দিবস বা রাতকে শরিয়তে বিশেষ উৎসবের অংশ হিসেবে যুক্ত করা দ্বীনের মধ্যে নতুন সংযোজন বা বিদআত বলে বিবেচিত হতে পারে। এছাড়া ইসলামে প্রত্যেক নতুন আবিষ্কার বা প্রথাকে ভ্রষ্টতা হিসেবে চিহ্নিত করার যে হাদিস রয়েছে, তার আলোকে তারা মনে করেন যে ইবাদত ও শরিয়তের পরিধিতে ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রীয় অনুকরণে কোনো উৎসব যোগ করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে খ্রিস্টানদের ক্রিসমাস বা অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবের আদলে নবীর জন্মদিনকে ঘেরা বা জাঁকজমকপূর্ণ করার প্রবণতা অনেক সময় বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণ হয়ে দাঁড়ায় বলে তাদের শঙ্কা রয়েছে।
বিরোধিতা ও সমর্থনের এই দুই মেরুর মাঝেও রয়েছে তাত্ত্বিক মধ্যপন্থা এবং নানাবিধ শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা। যারা এই অনুষ্ঠানের পক্ষে অবস্থান নেন, তারা বিদআতকে ভালো এবং মন্দ—এই দুই ভাগে বিভক্ত করার পক্ষে ইমাম শাফেয়ী ও বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতীর মতো মনীষীদের মতবাদ তুলে ধরেন, যারা মনে করতেন যে এমন কোনো নতুন প্রথা যদি মানুষকে দ্বীনের কাছাকাছি টানে এবং নবীর সিরাত চর্চায় উদ্বুদ্ধ করে, তবে তা উত্তম বিদআত হিসেবে গণ্য হতে পারে। এমনকি প্রখ্যাত ফকিহ ও কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহমাতুল্লাহি আলাইহিও মন্তব্য করেছেন যে, কেউ যদি নিখাদ নবীপ্রেম এবং সওয়াবের নিয়তে জন্মদিনের এই আলোচনায় শরিক হয়, তবে তার নিয়তের বরকতে সে পুরস্কৃত হতে পারে, যদিও পদ্ধতিগতভাবে তা সুন্নাহর সরাসরি অন্তর্ভুক্ত নয়। এই আলোচনার ইতিবাচক দিক হলো, দিনের এই বিশেষ উসিলায় হাজার হাজার তরুণ ও সাধারণ মানুষ নবীর পবিত্র জীবনী, আদর্শ এবং সাহসিকতা সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়, যা আধুনিক যুগে নৈতিক অবক্ষয় রোধে বড় ভূমিকা রাখে।
উভয় পক্ষের এই তাত্ত্বিক সংঘাতের মাঝে একটি মৌলিক সত্য হলো যে, দুই দলের কেউই রাসূলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ বা তাঁর সিরাত নিয়ে আলোচনার বিপক্ষে নয়। বিরোধিতাকারীরা যেমন জাঁকজমকপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা ও নির্দিষ্ট তারিখকে উৎসবের রূপ দেওয়ার বিপক্ষে, তেমনি তারাও সারা বছরব্যাপী নিয়মিত সিরাত মাহফিল, দরুদ পাঠ এবং নবীজির সুন্নাত পালনের পক্ষে শতভাগ একমত। পক্ষান্তরে, সমর্থকেরাও স্বীকার করেন যে এই দিনটি কোনো ফরজ ইবাদত নয়, বরং এটি কেবল ভালোবাসার একটি বহিঃপ্রকাশ মাত্র। দুই পক্ষেরই মূল লক্ষ্য হলো নবীর আদর্শকে সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া এবং তাঁর প্রতি অগাধ ভক্তি বজায় রাখা, কেবল প্রকাশের ধরণ ও শরিয়তের কাঠামোগত ব্যাখ্যার পার্থক্যের কারণে এই আপাত দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তাই আলেম সমাজ ও গবেষকরা বারবার তাগিদ দিয়েছেন যে, এই শাখাগত বা গৌণ বিষয় নিয়ে যেন মুসলিম সমাজে বিভেদ তৈরি না হয় এবং একে অপরকে কাফের বা দ্বীনবিমুখ বলে ফতোয়া দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বিরত থেকে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখাটাই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
তথ্যসূদ্র: দ্যা প্রেস


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category