• বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:০২ অপরাহ্ন

উৎপাদন সক্ষমতার পরও অর্থ সংকটে বিদ্যুৎ খাত: লাগামহীন লোডশেডিংয়ে নাকাল গ্রাহক

Reporter Name / ২ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

কাগজে-কলমে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এখন ২৮ হাজার ৭৯৩ মেগাওয়াট। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ গড় চাহিদা মাত্র ১৭ হাজার মেগাওয়াট। সাধারণ অংকের সরল হিসাবে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১১ হাজার ৭৯৩ মেগাওয়াট বেশি থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই বিপুল উদ্বৃত্ত সক্ষমতার পরও দেশজুড়ে কেন গ্রাহকদের তীব্র লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা পোহাতে হচ্ছে, সেই প্রশ্ন এখন সচেতন মহলে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ তথ্য ও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই সংকটের নেপথ্যে কোনো কারিগরি ত্রুটি নয়, বরং কাজ করছে চরম অর্থ সংকট। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) একদিকে বেসরকারি ও সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর মাসের পর মাস বকেয়া বিল পরিশোধ করছে না, অন্যদিকে কেন্দ্রগুলো চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি বা তেল কেনার টাকাও দিচ্ছে না। ফলে টাকার অভাবে ঘুরছে না দেশের বহু বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাকা, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে।

বিগত জুন মাস থেকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করলেও তা উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল না। দাম বাড়ানোর সময় কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, গ্রাহক পর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধির পরও সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে হলে সরকারকে অন্তত ৪০ হাজার কোটি টাকা বার্ষিক ভর্তুকি দিতে হবে। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ ভর্তুকির অর্থ সঠিক সময়ে সংস্থান করতে পিডিবি চরম হিমশিম খাচ্ছে। পিডিবির শীর্ষ কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সরকার নির্ধারিত সময়ে ভর্তুকির টাকা ছাড় না করায় তারা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিল সময়মতো পরিশোধ করতে পারছেন না, যার ফলে এই সামগ্রিক অচলাবস্থার তৈরি হয়েছে এবং এতে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো দায় নেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের (আইপিপি) অন্তত ৬ মাসের এবং সরকারি খাতের কোম্পানিগুলোর প্রায় ১৮ মাসের বিল বকেয়া রেখে দিয়েছে পিডিবি। এই বকেয়া আদায়ের জন্য উৎপাদনকারীরা কখনো অনুরোধ, আবার কখনো বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের হুমকি দিয়ে সামান্য কিছু টাকা আদায় করছেন। এদিকে বিদ্যুতের এই চরম সংকটের কারণে দেশজুড়ে জনমনে ক্ষোভের আগুন তীব্র হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবিতে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষ শুধু রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শনই করছে না, বরং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো উগ্র ঘটনাও ঘটাচ্ছে। এমনকি বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালীন সময়ে খেলা দেখার মুহূর্তে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পল্লী বিদ্যুতের স্থানীয় কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে গ্রাহকদের হুমকি দেওয়ার ঘটনা থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়িয়েছে। বিগত কয়েক বছরের ইতিহাসে বিদ্যুতের দাবিতে এভাবে মানুষকে ব্যাপক আকারে সহিংস আন্দোলনে নামতে দেখা যায়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইতিমধ্যে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের সাথে বিশেষ বৈঠক করেছে সরকার এবং বিদ্যুৎ নিয়ে যেকোনো ধরণের নৈরাজ্য সৃষ্টির অপচেষ্টাকারীদের কঠোরভাবে চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেসব অপ্রীতিকর ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য জেলা প্রশাসকদের সাথে আলোচনা করে স্থানীয়ভাবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে।

বর্তমানে দেশে সব মিলিয়ে ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রয়েছে। তবে ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের (এনএলডিসি) সর্বশেষ দৈনিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ১৪৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ৬৬টি কেন্দ্রের পাশে স্পষ্টভাবে ‘ফুয়েল শর্টেজ’ বা জ্বালানি সংকট শব্দটি লেখা রয়েছে। প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট যে, কেবল ফার্নেস অয়েল বা তরল জ্বালানিই নয়, দেশের বড় বড় কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্যাস ও কয়লারও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যার কারণে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না এবং বাধ্য হয়েই পিডিবিকে লোডশেডিংয়ের পথ বেছে নিতে হচ্ছে। সরকারি একটি বিদ্যুৎ কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামগ্রিক অর্থ ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ বছর থেকেই এই বকেয়া বিলের পাহাড় জমতে শুরু করে, যা পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও বহাল ছিল। বর্তমানে কোনো উৎপাদনকারী কোম্পানির পাওনা ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলে তাকে মাত্র ১০ কোটি টাকা দিয়ে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কোনো সমাধান আনছে না।

ঐ কর্মকর্তা আরও জানান যে, সরকার যদি মনে করে এই বিপুল বকেয়া তারা আগামী পাঁচ বা ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধ করবে, তবে চলতি মাসের বিলের সাথে অন্তত একটি করে বকেয়া বিলের টাকা ছাড় করতে হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সরকার এখন চলতি মাসের বিলের টাকাই নিয়মিত দিতে পারছে না এবং তেল আমদানির ডলারের সংস্থান করছে না। ফলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তেল কিনে কেন্দ্র চালাতে আর আগ্রহী হচ্ছেন না, কারণ পিডিবি ঋণের সুদের টাকা দেয় না।

বিদ্যুৎ বিতরণের ক্ষেত্রে সরকারের একটি অঘোষিত ও বৈষম্যমূলক বণ্টননীতিও এই ক্ষোভকে আরও উসকে দিচ্ছে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে সবার আগে রাজধানী ঢাকার শতভাগ চাহিদা মেটানোর অঘোষিত চেষ্টা করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলা সদর এবং ইউনিয়নগুলোতে বিদ্যুৎ বণ্টন করা হয়, আর সবশেষে চিন্তা করা হয় গ্রামীণ অঞ্চলের কথা। কাগজে-কলমে দাম সমান হলেও এই বণ্টন বৈষম্যের কারণে ঢাকা শহরে যখন এক মিনিটের জন্যও লোডশেডিং হয় না, তখন গ্রামের মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্ধকারে কাটাতে হয়। অথচ আরইবির তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫৮ শতাংশই ব্যবহার ও ভ্যাট-রাজস্ব আদায় হয় গ্রামীণ অঞ্চল বা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর মাধ্যমে। আরইবির হিসাব বলছে, তীব্র গরমের সময় পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় গড়ে এক-তৃতীয়াংশ বা ২৩ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়, যা জুনের শেষ দিকে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল।

বিদ্যুৎ খাতের এই মারাত্মক পরিস্থিতি থেকে সহসা কোনো উন্নতির আশা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। গত ফেব্রুয়ারি মাসে পিডিবির মোট বকেয়ার পরিমাণ ছিল ৪৫ হাজার কোটি টাকা, যা প্রায় সাড়ে চার মাসের মোট বিদ্যুৎ বিলের সমান। এ বিষয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ সরাসরি জানিয়েছেন যে, বাজারে এত বিপুল পরিমাণ আর্থিক বকেয়া জমিয়ে রেখে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা অত্যন্ত কঠিন। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সময় পিডিবি নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিদ্যুতের রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি যৌক্তিক পর্যায়ে না আনলে এবং জ্বালানি আমদানির অর্থ নিশ্চিত না করলে এই গভীর সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category