বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘কোনো আক্কেলজ্ঞান নেই’—একবার ইসরায়েলের সুপরিচিত সাংবাদিক বারাক রাভিদকে এই মন্তব্য করেছিলেন খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি বলছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী আসলে খুব ভালো করেই জানেন তিনি কী করছেন। গত রোববার (১৪ জুন) লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় আকস্মিক বিমান হামলা চালিয়ে নেতানিয়াহু মূলত ‘এক ঢিলে দুই পাখি’ মারার এক বিপজ্জনক ভূ-রাজনৈতিক জুয়া খেলেছেন। তাঁর এই একক সামরিক আঘাতের লক্ষ্য ছিল দুটি ঐতিহাসিক শান্তিপ্রক্রিয়াকে একযোগে ধূলিসাৎ করে দেওয়া। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত হওয়া ‘ইসলামাবাদ মেমোর্যান্ডম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (ইসলামাবাদ এমওইউ)’ নামক প্রাথমিক শান্তিচুক্তি এবং দ্বিতীয়ত, সেই চুক্তির আলোকেই ইসরায়েল-লেবাননের মধ্যে যে একটি ভঙ্গুর শান্তি প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছিল, সেটি। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রখ্যাত বিশ্লেষক ত্রিতা পার্সির এক বিশেষ নিবন্ধে নেতানিয়াহুর এই সুদূরপ্রসারী কৌশলের আদ্যোপান্ত উঠে এসেছে।
এই হামলার পেছনে নেতানিয়াহুর আরও একটা বড় দীর্ঘমেয়াদি রণকৌশল রয়েছে। ইরান সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন একটি ‘প্রতিরোধ সমীকরণ’ (Deterrence Equation) তৈরি করতে চাইছিল। সেই নতুন বিন্যাস অনুসারে নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল—লেবাননের যেকোনো জায়গায় ইসরায়েল যদি বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তবে ইরান তার মিত্রদের ওপর না ছেড়ে সরাসরি নিজের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলের ভেতরে পাল্টা আঘাত করবে। নেতানিয়াহু মূলত শুরুতেই আঘাত হেনে ইরানের তৈরি করা এই নতুন মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক সমীকরণকে ভেঙে দিতে চেয়েছেন।
গত সপ্তাহে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যে নজিরবিহীন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বিনিময় হয়েছে, তা কেবলই সাময়িক প্রতিশোধের খেলা ছিল না। এর পেছনে ছিল গভীর ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন নিষেধাজ্ঞা ও বারণ অমান্য করে ইসরায়েল যখন বৈরুতের দাহিয়েহতে বিধ্বংসী হামলা চালায়, তখন ইরানও ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরাসরি ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডের ভেতরে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। এরপর ইসরায়েল আবার পাল্টা হামলা করে এবং ইরানও তার জবাব দেয়। এই ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল কিছুটা পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং সাময়িকভাবে দক্ষিণ লেবাননে তাদের হামলা সীমিত রাখে।
এই ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক মহলে একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ইরান এখন লেবাননের সার্বভৌমত্বে ইসরায়েলের অবাধ ও একচেটিয়া বিমান হামলার স্বাধীনতায় সম্পূর্ণ লাগাম টানতে চায়। গত কয়েক দশকে এই প্রথম মধ্যপ্রাচ্যের কোনো বড় আঞ্চলিক শক্তি ইসরায়েলের সীমান্তবহির্ভূত সামরিক অভিযানের ওপর এমন সরাসরি সামরিক চাপ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
নেতানিয়াহু এই হামলার পর নিজের অফিশিয়াল ‘এক্স’ (টুইটার) অ্যাকাউন্টে হামলার ভিডিও পোস্ট করে রীতিমতো বড়াই করেছেন। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে, তার ঠিক পরদিনই শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি সই হওয়ার কথা চূড়ান্ত ছিল। ঠিক তার আগের মুহূর্তে বৈরুতে এই বিধ্বংসী হামলা চালিয়ে তিনি মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক শান্তি পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে একটি বড় ধাক্কা দিয়েছেন।
ওয়াশিংটনের একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে বলেছেন, “এটি ট্রাম্পের মার্কিন-ইরান শান্তি চুক্তিকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার জন্য ইসরায়েলের একটি স্পষ্ট ও পরিকল্পিত চেষ্টা। তারা যেকোনো উপায়ে মধ্যপ্রাচ্যে আবার যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধের মধ্যে টেনে নামাতে চায়, যাতে ওয়াশিংটনের কাঁধে ভর করে তারা তেহরানকে মোকাবিলা করতে পারে।”
ইসরায়েলের এই একতরফা আগ্রাসনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও চরম ক্ষুব্ধ হয়েছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, হিজবুল্লাহর ছোটখাটো হামলার জবাবে ইসরায়েলের এত বড় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। সেখানে কেউ হতাহতও হয়নি, অথচ এই অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনার কারণে পুরো শান্তি প্রক্রিয়াটি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
এর ফলে ওয়াশিংটন এখন উভয়সংকটে তথা দুই দিক থেকেই চরম কূটনৈতিক চাপে পড়েছে। একদিকে চুক্তি রক্ষার্থে ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে—যদি শান্তি বজায় রাখতে হয় তবে আগে ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণ করো; অন্যদিকে ইসরায়েল ইচ্ছেমতো উত্তেজনা তৈরি করে প্রতিবারই যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে টেনে নিয়ে আসছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যদি এখন স্পষ্ট ও কঠোর ভাষায় তেল আবিবকে জানিয়ে দেন যে, ইসরায়েলের এমন কোনো অযৌক্তিক বা উসকানিমূলক হামলায় যুক্তরাষ্ট্র আর সামরিক অংশীদার হবে না কিংবা তাদের রক্ষা করতে আসবে না, তাহলেই কেবল পরিস্থিতির মোড় ঘুরতে পারে। তা না হলে, ইরান কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের দ্বিপাক্ষিক চুক্তিকে ইসরায়েল-লেবানন সংঘাত থেকে আলাদা করে দেখবে না। নেতানিয়াহুর এই একটিমাত্র আত্মঘাতী বিমান হামলা শুধু বৈরুতকে রক্তাক্ত করেনি, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শান্তি ও স্থিতিশীলতাকেই এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।