ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে অনুষ্ঠিত জি৭ সম্মেলনের নৈশভোজের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন আকস্মিকভাবে ইরানের সঙ্গে একটি ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক সইয়ের ঘোষণা দিলেন, তখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তেহরানের এক নজিরবিহীন কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিজয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আগ্রাসনের মুখে টানা তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর, এই চুক্তি বিশ্বরাজনীতিতে এক সম্পূর্ণ নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। ইরানের রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম, দেশের শীর্ষ কূটনীতিক এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি এ চুক্তিকে কোনো সাধারণ আপস হিসেবে দেখছেন না; বরং তাঁরা এটিকে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক প্রতিরোধের একটি বড় জয় হিসেবে মূল্যায়ন করছেন। তিন মাসের তীব্র লড়াই শেষে অর্জিত ঐতিহাসিক এই ঘটনাটি স্মরণীয় করে রাখতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এক বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক নতুন রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের ‘হাউস অব কমন্স লাইব্রেরি রিসার্চ ব্রিফিং’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে একযোগে বিমান ও বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করার মাধ্যমে এই যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। ওয়াশিংটন এই বিশেষ অভিযানের নাম দিয়েছিল ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ বা মহাকাব্যিক তাণ্ডব, যার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের বর্তমান ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করা এবং তাদের প্রতিরক্ষামূলক পারমাণবিক ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস করা। যুদ্ধের এই প্রাথমিক ধাক্কা তেহরানের জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল, কারণ প্রথম দফার বিমান হামলাতেই ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন এবং এর পাশাপাশি নিহত হন দেশটির শীর্ষ can-পযায়ের আরও কয়েকজন বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা। তবে এই চরম ও নজিরবিহীন সংকটের মুহূর্তেও ইরানি শাসনব্যবস্থা বিন্দুমাত্র ভেঙে পড়েনি, বরং খামেনির ছেলে মোজতবা আলী খামেনিকে দ্রুত নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিযুক্ত করে ইরানিরা জাতি হিসেবে এক অভূতপূর্ব ও দৃঢ় জাতীয় ঐক্য প্রদর্শন করে, যা পশ্চিমাদের সব হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দেয়।
মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের জবাবে ইরান যে পাল্টা সামরিক আঘাত গড়ে তোলে, তা মূলত পশ্চিমাদের যুদ্ধক্ষেত্রের সব রণকৌশলকে অকার্যকর করে দিয়েছিল। ইরান সফলভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং আন্তর্জাতিক এই জলপথটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। বিশ্বের মোট উৎপাদিত ও পরিবাহিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ যে প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করত, তা আচমকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের শত শত বিশাল জাহাজ সাগরে আটকে পড়ে এবং এক ধাক্কায় বিশ্ব অর্থনীতিতে তীব্র সংকট তৈরি হয়। ওয়াশিংটন তখন খুব দ্রুত বুঝতে পারে যে কেবল অত্যাধুনিক সামরিক শক্তি বা আকাশপথের আধিপত্য দিয়ে ইরানকে দমন করা অসম্ভব। পরবর্তীতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হওয়ার পর দুই পক্ষের মধ্যে নিবিড় আলোচনা শুরু হয় এবং ইরান অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নিজেদের শর্তে অটল থেকে দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে এই সমঝোতা চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ‘স্টিমসন সেন্টার’ তাদের জুনের মূল্যায়নে জানিয়েছে, এ চুক্তির ফলে মার্কিন ব্যাংকে অন্যায়ভাবে আটকে থাকা ইরানের ২৫ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের জব্দকৃত তহবিল অবিলম্বে অবমুক্ত করতে সম্মত হয়েছে ওয়াশিংটন, যা দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য এক বিশাল বড় শক্তি হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে যুদ্ধোত্তর দেশ পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র থেকে আরও ৩০০ বিলিয়ন বা ৩০ হাজার কোটি ডলার পাওয়ার একটি পারস্পরিক সম্মত পথ তৈরি করেছে তেহরান। এছাড়া, চুক্তির অনুলিপি অনুযায়ী ইরান এখন থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তেল বিক্রি করে সরাসরি রাজস্ব আদায় করতে পারবে এবং সেই অর্থ ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করবে, যা অর্থনৈতিক দিক থেকে ইরানের এক বিশাল সার্বভৌম বিজয়।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রেও ইরান তার মূল নীতি ও অধিকার ধরে রাখতে পুরোপুরি সফল হয়েছে। বিখ্যাত মার্কিন সাময়িকী নিউজউইক একটি আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সংস্থার বরাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য দিয়ে জানিয়েছে যে, গত তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি শত চেষ্টা এবং উপর্যুপরি বিমান হামলার পরও ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক বোমা তৈরির মূল সক্ষমতা সম্পূর্ণ অক্ষত ও নিরাপদ রয়েছে। মাটির নিচের সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে থাকা ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের শক্তিশালী মজুত ধ্বংস করা বা দেশ থেকে বাইরে সরিয়ে নেওয়ার মতো কোনো অপমানজনক শর্ত এ পর্যন্ত তেহরানের ওপর চাপাতে পারেনি মার্কিন-ইসরায়েলি জোট। অর্থাৎ, বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ও ধ্বংসযজ্ঞের চেষ্টা করেও তারা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার মূল ভিত্তি স্পর্শ করতে পারেনি, যা ওয়াশিংটনকে চরম এক নীতিগত পরাজয়ের স্বাদ দিয়েছে।
সমঝোতা চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর তেহরানের রাস্তাঘাটে বড় বড় প্রচারপত্র ও বিলবোর্ড টানিয়ে একে পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক সফল প্রতিরক্ষামূলক জয় হিসেবে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যটি এসেছে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদির কাছ থেকে, যিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া জোরাল প্রতিরোধ ও পাল্টা সামরিক জবাবই মূলত মার্কিন প্রশাসনকে আলোচনার টেবিলে আসতে এবং তেহরানের দাবিগুলো মেনে নিতে বাধ্য করেছে। একই সুর শোনা গেছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সমান্তরাল বিবৃতিতে, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে ইরানি জাতি শুধু সাম্প্রতিক চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধেই নয়, বরং কৌশলগত নানা ক্ষেত্রে এমন গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সমীকরণ চিরতরে বদলে দিয়েছে। এছাড়া চুক্তির আওতায় লেবাননসহ সব যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা অবিলম্বে বন্ধের যে ঘোষণা এসেছে, তা মূলত ইরানের একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম সিদ্ধান্তের জয় হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
স্বভাবতই, পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের জনগণের ক্ষোভ ও আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের ইমেজ রক্ষা করতে দাবি করছে যে, তারা ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার চুক্তিতে আবদ্ধ করেছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় মুহূর্ত হিসেবে দাবি করলেও পশ্চিমা বিশ্লেষকেরাও এখন পর্দার আড়ালের সত্যটি স্বীকার করছেন। পশ্চিমা প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ লিসা দফতরি গভীর হতাশার সঙ্গে মার্কিন গণমাধ্যমে স্বীকার করেছেন যে, ইরান প্রকৃতপক্ষে এই চুক্তিকে একটি ‘কৌশলগত বিরতি’ হিসেবে ব্যবহার করছে এবং তারা তাদের কোনো মৌলিক সক্ষমতাই আন্তর্জাতিক চাপে ত্যাগ করেনি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে যে, প্রচণ্ড অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ক্রমাগত বোমাবর্ষণের মুখেও ইরানের সমাজ ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যেভাবে অভ্যন্তরীণভাবে ঐক্যবদ্ধ থেকেছে, তা পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের বাধ্য করেছে যুদ্ধ থামিয়ে নিজেদের অহংকার বিসর্জন দিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে।
সামগ্রিকভাবে, এই তিন মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও পরবর্তী চুক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক মস্ত বড় আন্তর্জাতিক ও কৌশলগত শিক্ষা। এটি বিশ্ববাসীর সামনে প্রমাণ করেছে যে, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সামরিক জোট, বিপুল মারণাস্ত্র বা তীব্র নিষেধাজ্ঞা দিয়ে একটি আত্মবিশ্বাসী দেশের জাতীয় সংহতি ও প্রতিরোধ ক্ষমতাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভূরাজনীতিতে অন্ধ বলপ্রয়োগের একটি সুনির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা হরমুজ প্রণালি বন্ধের মাধ্যমে ইরান বিশ্ব অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে খুব ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরানকে বাদ দিয়ে বা বলপ্রয়োগ করে কোনো সমীকরণ মেলানো যে অসম্ভব—এটিই এখন ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের জন্য সবচেয়ে বড় বাস্তব শিক্ষা। দৃঢ়তা, সঠিক কৌশল ও ঐক্যবদ্ধ জাতিতে ভর করে একটি দেশ যেকোনো পরাশক্তির চাপ মোকাবিলা করেও তার সার্বভৌম অধিকার ও আত্মসম্মান আদায় করে নিতে সক্ষম, মধ্যপ্রাচ্যের বুকে দাঁড়িয়ে ঠিক এই সত্যটিই আরও একবার প্রমাণ করে দিল তেহরান।
{তথ্যসূত্র: বিবিসি, ফক্স নিউজ, আল–জাজিরা, এবিসি নিউজ, আউটলুক ইন্ডিয়া, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস ও অ্যাক্সিওস}