• মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০২:৪৬ অপরাহ্ন
Headline
বডিশেমিংয়ের উত্তর তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ হিসেবেই ভারত থেকে ফিরেছি: প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা দিনে ১০ খুন: জনমনে বাড়ছে আতঙ্ক ও উদ্বেগ নৌকাযোগে নারীকে পুশইনের চেষ্টা, রোকনপুর সীমান্তে বিএসএফের অপচেষ্টা রুখল বিজিবি সীমান্তে ‘অস্বাভাবিক জনসংখ্যাগত পরিবর্তন’ খতিয়ে দেখতে দিল্লির উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন ৫৪ জেলার পানিতে বিষাক্ত আর্সেনিক ও আয়রন, বাড়ছে ক্যানসারের ঝুঁকি আদ-দ্বীনের অন্য শাখা চলতে বাধা নেই: স্বাস্থ্যমন্ত্রী দুবাইয়ে ধৃত বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ৩৩ মামলা, প্রত্যর্পণে নথিপত্র অনুবাদ হচ্ছে আরবিতে রামিসা হত্যা মামলা: আসামিদের পক্ষে ‘স্টেট ডিফেন্স’ নিয়োগের নির্দেশ হাইকোর্টের গ্যালারিতে ট্রুডো ও কেটি পেরি, নতুন করে বিশ্বমিডিয়ায় সম্পর্কের গুঞ্জন

ইরান-মার্কিন চুক্তিতে বেকায়দায় নেতানিয়াহু, সিদ্ধান্তে বড় ধাক্কা

Reporter Name / ৪ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁর সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে এবং সেদিন থেকেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।

তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই আকস্মিক চুক্তি এবং যুদ্ধবিরতির ঘোষণা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য একটি চরম ‘রাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই চুক্তি নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের তিনটি মূল স্তম্ভকে একযোগে গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং ইসরায়েলকে এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

মার্কিন মিত্রের হাতেই প্রকাশ্যে অপমানিত ‘মিস্টার সিকিউরিটি’

দীর্ঘদিন ধরে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেকে ওয়াশিংটনের ‘রাজনৈতিক অভিভাবক’ এবং মার্কিন নীতিনির্ধারকদের ওপর একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারকারী নেতা হিসেবে ইসরায়েলের জনগণের কাছে জাহির করে আসছিলেন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তাঁর সেই প্রভাব সম্পূর্ণ ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেল আবিবকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে এবং নেতানিয়াহুর তীব্র আপত্তি অগ্রাহ্য করে ইরানের সাথে এই শান্তি চুক্তি সম্পন্ন করেছেন, যা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর জন্য এক বড় ধরণের প্রকাশ্য অপমান।

নেতানিয়াহু সবসময় ইরানকে মোকাবেলার বিষয়টিকে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনার কেন্দ্রে রেখেছিলেন। কিন্তু শত সংঘাত ও হামলার পরও যুদ্ধের আগের চেয়ে ইরান এখন আঞ্চলিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে আরও শক্তিশালী অবস্থানে চলে গেছে। তার ওপর, লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান সম্পূর্ণ বন্ধ করার জন্য ওয়াশিংটন ও তেহরানের যে যৌথ চাপ তৈরি হয়েছে—তা ইসরায়েলের ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ হিসেবে পরিচিত নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে, ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে এই ধরণের চুক্তি তাঁর নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়াকে অসম্ভব করে তুলেছে।

সামনে কেবল দুটি পথ: সংঘাত নাকি আত্মসমর্পণ

বর্তমান পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর সামনে কোনো সম্মানজনক বিকল্প নেই। ইসরায়েলের সংসদ নেসেটে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ বলেছেন, “নেতানিয়াহুর সামনে এখন কেবল দুটি পথ খোলা রয়েছে—হয় আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি ও মারাত্মক সামরিক-কূটনৈতিক সংঘাতে জড়ানো, অথবা ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে ইসরায়েলি জাতীয় স্বার্থকে পুরোপুরি জলাঞ্জলি দেওয়া।”

সম্প্রতি বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলার কড়া সমালোচনা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, “রবিবার বৈরুতে হামলার নির্দেশ দিয়ে নেতানিয়াহু কোনো বিচারবুদ্ধির পরিচয় দেননি।” ট্রাম্পের এই কড়া ও চড়াসূরের বক্তব্যকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং গণমাধ্যম ভাষ্যকাররা লুফে নিয়েছেন। আগামী অক্টোবর মাসের মধ্যেই ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে বিরোধী দলগুলো এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

কট্টরপন্থী মন্ত্রীদের বিদ্রোহ ও নেতানিয়াহুর নীরবতা

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির আওতায় ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান’ স্থায়ীভাবে বন্ধ থাকবে। তেহরানের এই শর্ত মেনে নেওয়ায় নেতানিয়াহুর নিজস্ব দল লিকুদ পার্টি এবং তাঁর জোট সরকারের কট্টরপন্থী শরিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে। ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির সামাজিক মাধ্যমে সরাসরি ট্রাম্পের চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে লিখেছেন, “ট্রাম্পের এই চুক্তি আমাদের মানতে বাধ্য করে না। আমরা সে চুক্তির অংশীদার নই, যা আমাদের দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।”

ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা এবং ইরান বিশেষজ্ঞ সিমা শাইন আমেরিকার এই কৌশল নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “আমেরিকানরা কেন ইরানের এই শর্ত গ্রহণ করল তা বোঝা কঠিন। লেবাননে কী ঘটবে তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা ইরানকে দিয়ে আসলে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে হিজবুল্লাহকে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে প্রধান শক্তি হিসেবে টিকে থাকার চিরস্থায়ী সুযোগ করে দিল।” এই সব অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ট্রাম্পের চুক্তি নিয়ে নেতানিয়াহু নিজে এখন সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করছেন। নিজেকে সবসময় ‘বিজেতা’ হিসেবে দাবি করতে অভ্যস্ত নেতানিয়াহুর এই রহস্যজনক নীরবতাই প্রমাণ করে যে, তিনি বর্তমানে কতটা দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া পরিস্থিতিতে আছেন।

যুদ্ধকৌশলের চরম ব্যর্থতা এবং ক্লান্ত সামরিক বাহিনী

২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরের পর থেকে নেতানিয়াহুর মূল নিরাপত্তা কৌশল ছিল—ঝুঁকিগুলোকে কেবল ঠেকিয়ে না রেখে আক্রমণাত্মক অভিযানের মাধ্যমে শত্রুদের আগেভাগেই নিশ্চিহ্ন করা। কিন্তু ইসরায়েলি বিমান বাহিনী ও সেনাবাহিনী গাজার একের পর এক শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা এবং ৭৩ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা সত্ত্বেও, প্রতিরোধ যোদ্ধা হামাস এখনো গাজার অর্ধেক অঞ্চল সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং সেখানে পুনরায় নিজেদের সামরিক শক্তি সংগঠিত করছে। অন্যদিকে আট মাস আগের যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত মূল শান্তি পরিকল্পনা এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যেই ঝুলে আছে।

নেতানিয়াহুর এই আগ্রাসী ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধনীতি ইসরায়েলি বাহিনীকে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার বিশাল এলাকা দখলে আটকে ফেলেছে। এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ইসরায়েলের উন্নত সামরিক সম্পদ ও তাদের প্রধান চালিকাশক্তি রিজার্ভ বাহিনীকে চরম ক্লান্তি ও অবসাদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইরান ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে একের পর এক যুদ্ধ করেও ইসরায়েল তাদের প্রধান শত্রুদের নির্মূল করতে পারেনি, উল্টো তেহরানের ক্ষমতা এখন এমন সব কট্টরপন্থী নেতাদের হাতে গেছে যারা মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক শক্তিকে আর বিন্দুমাত্র ভয় পায় না।

ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ-এর সিনিয়র ইরান গবেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, “ইসরায়েলের এই কৌশলগত ব্যর্থতা তেহরান বিষয়ক নীতি পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে। এখন ইসরায়েলকে আরও বাস্তবসম্মত ও সংযত অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে।” তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে নেতানিয়াহু যেভাবে হোয়াইট হাউসকে এড়িয়ে মার্কিন কংগ্রেস ও সে দেশের জনমতকে খেপিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করতেন, বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে সেই সুযোগ বা পথ সম্পূর্ণ বন্ধ।” ফলে, প্রধান শত্রুকে ধ্বংস করার যুদ্ধনীতি আজ নেতানিয়াহুকে তাঁর নিজের পরম মিত্রের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি ডেকে আনতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category