দেশের ৫৪টি জেলার ভূগর্ভস্থ পানিতে সহনশীল মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে বিষাক্ত আর্সেনিক ও অতিরিক্ত আয়রনের (লোহা) উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার সাম্প্রতিক জরিপে এই ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে এই দূষিত পানি পানের ফলে দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী ক্যানসার, লিভার সিরোসিস, কিডনি বিকল এবং চর্মরোগসহ নানা ধরনের মারাত্মক ও জটিল ক্রনিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক চরম বিপর্যয় সংকেত।
গবেষকদের মতে, দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৪টি জেলারই অগভীর ও গভীর নলকূপের পানিতে আর্সেনিক এবং আয়রনের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বাংলাদেশ নির্ধারিত মানদণ্ডের চেয়ে অনেক উপরে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল, মধ্যাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোর ভূগর্ভস্থ পানিতে এই খনিজগুলোর আধিক্য সবচেয়ে বেশি।
আর্সেনিকের থাবা: চাঁদপুর, মুন্সীগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, নোয়াখালী, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া ও যশোরসহ বেশ কিছু জেলায় আর্সেনিকের উপস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক স্তরে রয়েছে। অনেক এলাকায় নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা প্রতি লিটারে ০.০৫ মিলিগ্রামের (বাংলাদেশের মানদণ্ড) চেয়ে কয়েক গুণ বেশি পাওয়া গেছে।
আয়রনের আধিক্য: দেশের উত্তরাঞ্চল ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের জেলাগুলোতে (যেমন- জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর) পানিতে আয়রনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। অতিরিক্ত আয়রনের কারণে পানি লালচে বা ঘোলাটে হয়ে যায় এবং এতে তীব্র ধাতব গন্ধ থাকে।
চিকিৎসকদের মতে, আর্সেনিকযুক্ত পানিকে মূলত ‘ধীরগতির বিষ’ (Slow Poison) বলা হয়। এই পানি দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে মানবদেহে যে সব জটিল রোগ বাসা বাঁধছে, তার মধ্যে অন্যতম:
১. ত্বকের ক্যানসার ও আর্সেনিকোসিস: আর্সেনিকযুক্ত পানি পানের প্রথম লক্ষণ প্রকাশ পায় ত্বকে। হাত ও পায়ে কালো দাগ, চামড়া শক্ত হয়ে যাওয়া বা ক্ষত (কেরাটোসিস) তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে মেলানোমা বা ত্বকের ক্যানসারে রূপ নেয়।
2. অভ্যন্তরীণ অঙ্গের ক্ষতি: এটি মানবদেহের ভেতরে প্রবেশ করে ফুসফুস, মূত্রথলি (ব্লাডার) மற்றும் কিডনির ক্যানসার তৈরি করে।
৩. লিভার ও কিডনি বিকল: পানিতে থাকা অতিরিক্ত আয়রন এবং আর্সেনিক শরীর সহজে নিষ্কাশন করতে পারে না। ফলে এগুলো লিভারে জমা হয়ে লিভার সিরোসিস এবং কিডনি বিকল (Kidney Failure) হওয়ার হার বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
৪. পেটের পীড়া ও চুল পড়া: অতিরিক্ত আয়রনযুক্ত পানি ব্যবহারের ফলে প্রতিনিয়ত বদহজম, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা এবং চুল পড়ে যাওয়ার মতো সমস্যায় ভুগছেন কোটি কোটি মানুষ।
এই ৫৪টি জেলার সিংহভাগ গ্রামীণ মানুষ জেনেই হোক বা না জেনেই হোক, প্রতিদিন এই বিষাক্ত পানি পান এবং রান্নার কাজে ব্যবহার করছেন। বিকল্প নিরাপদ পানির উৎস যেমন- গভীর নলকূপ স্থাপন, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং (বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ) বা আর্সেনিক রিমুভাল ফিল্টারের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিপর্যয় থেকে বাঁচতে হলে অবিলম্বে আক্রান্ত এলাকার সব নলকূপের পানি পরীক্ষা করে ‘লাল’ বা ‘সবুজ’ রঙে চিহ্নিত করার পুরোনো কার্যক্রমটি নতুন করে জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মাটির উপরের পানি (নদী, পুকুর বা জলাশয়) পরিশোধন করে সরবরাহ করার দিকে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই রোগব্যাধির প্রকোপ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর এক বিশাল আর্থিক ও মানবিক চাপ সৃষ্টি করবে।