দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়োজিত সরকারি পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি এক নজিরবিহীন সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। অর্থ সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ক্রয় প্রক্রিয়ার স্থবিরতার কারণে সরকারিভাবে বিতরণ করা জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ দেশজুড়ে গড়ে প্রায় ৭৮ শতাংশ কমে গেছে। বিগত প্রায় দেড় বছর ধরে চলা এই চরম ঘাটতির ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপরিকল্পিত গর্ভধারণের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকার পর দেশের প্রজনন হার বা জন্মহার পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অতি সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর মজুত এখন প্রায় শূন্য। সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানে দেখা গেছে:
দেশের ৩৭৮টি উপজেলায় কোনো কনডম নেই।
৩৬৭টি উপজেলায় মুখে খাওয়ার ওরাল পিলের মজুত সম্পূর্ণ শেষ।
জরুরি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি (ECP) নেই ৪১৮টি উপজেলায়।
দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষাদানকারী ইমপ্লান্ট ৩১১টি এবং ১০ বছর মেয়াদি আইইউডি (IUD) ৩৯৭টি উপজেলায় মজুতশূন্য।
সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা ইনজেক্টেবল জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর, যার মজুত শেষ হয়ে গেছে ৪৭৭টি উপজেলায়।
শুধু জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীই নয়, গ্রামীণ মায়েদের প্রসবকালীন সুরক্ষায় ও মাতৃস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি ওষুধ যেমন—মিসোপ্রোস্টল, অক্সিটোসিন, আয়রন-ফলিক এসিড এবং ম্যাগনেসিয়াম সালফেটের মতো জীবনরক্ষাকারী ওষুধও অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকে এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের সক্ষম দম্পতিদের প্রায় ৩৭ শতাংশ বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে সরকারি খাত থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী পেয়ে থাকেন। এনজিওগুলো দেয় ৩ শতাংশ এবং বাকি ৬০ শতাংশ মানুষ বেসরকারি বাজার থেকে তা সংগ্রহ করেন। সরকারি খাতে সরবরাহ কমে যাওয়ার চিত্রটি অত্যন্ত ভয়াবহ।
২০২২ সালের তুলনায় বর্তমানে ইনজেক্টেবলের সরবরাহ ১১ লাখ ৪০ হাজার থেকে কমে মাত্র ৫ লাখে (৫৬ শতাংশ হ্রাস) নেমে এসেছে। সাধারণ ওরাল পিলের সরবরাহ ৮৮ লাখ ৯০ হাজার থেকে কমে হয়েছে ১৮ লাখ ৯০ হাজার (৭৯ শতাংশ হ্রাস)। সবচেয়ে বড় ধস নেমেছে দীর্ঘমেয়াদি ও জনপ্রিয় ‘আপন’ ব্র্যান্ডের পিলের ক্ষেত্রে, যার সরবরাহ ২৩ লাখ ৪ হাজার পিস থেকে ৯৮ শতাংশ কমে এখন মাত্র ৪৩ হাজার ৭৬৮ পিসে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ইমপ্লান্টের সরবরাহ ৯৭ শতাংশ এবং আইইউডি-এর সরবরাহ ৬৩ শতাংশ কমে গেছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এই সংকটের সূত্রপাত মূলত ২০২৩ সালে, যখন বড় ধরনের ক্রয়ের সরকারি অনুমোদন পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জুনে ‘স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি’ (HPNSPI)-এর অধীনে থাকা অপারেশন প্ল্যান (OP) বা ওপি ব্যবস্থাটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে সংকট চূড়ান্ত রূপ নেয়।
ওপি ব্যবস্থা বন্ধ হওয়ার পর ২০২৫ সালে নতুন প্রকল্প অনুমোদন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং অর্থ ছাড়ে ব্যাপক প্রশাসনিক বিলম্ব হয়। এর ফলে সরকারি সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট বা কেনাকাটার চেইনটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি ক্রয়চক্র সম্পন্ন করতে যেখানে কমপক্ষে ১২০ দিন সময় লাগে, সেখানে সময়মতো প্রক্রিয়া শুরু না হওয়ায় মাঠপর্যায়ে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
সরবরাহের এই ঘাটতি সরাসরি আঘাত হেনেছে দেশের প্রজনন হারে। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮১ সালে দেশে মোট প্রজনন হার (TFR) ছিল ৫.০৭, যা দীর্ঘ রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টায় ২০২২ সালে ২.৩-এ নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও ইউনিসেফের যৌথ ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) ২০২৫’ এর তথ্য বলছে, প্রজনন হার এখন আবার বেড়ে ২.৪-এ উন্নীত হয়েছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন সতর্ক করে বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীর ক্ষেত্রে অন্তত ছয় মাসের ‘বাফার স্টক’ বা জরুরি মজুত থাকার কথা, যা এখন শূন্য। সরবরাহ ব্যবস্থায় মাত্র এক মাসের বিঘ্নও দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনে। জন্মনিয়ন্ত্রণ খাতে ১ ডলারের সরবরাহ ব্যাহত হলে ভবিষ্যৎ সামাজিক ও চিকিৎসাগত ব্যয় মিলিয়ে প্রায় ১৪ ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, এই সংকটের কারণে দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারি কেন্দ্রে সামগ্রী না পেয়ে তারা বাজার থেকে বাড়তি টাকা দিয়ে তা কিনতে বাধ্য হচ্ছে, আর যারা কিনতে পারছে না তারা ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণের শিকার হচ্ছে। এর ফলে সমাজে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর তুলনায় নির্ভরশীল জনসংখ্যা বেড়ে গিয়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
চলমান এই তীব্র সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী কেনাকাটার জন্য বিশেষ খাত হিসেবে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। এই অর্থ দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে কনডম, পিল, ইনজেকশন, ইমপ্লান্ট ও আইইউডিসহ প্রয়োজনীয় সব উপকরণ কেনা হবে বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের পরিচালক (উপকরণ ও সরবরাহ) মো. আবদুর রাজ্জাক।
সরকার আশা করছে, এই বিপুল অর্থায়নে নতুন সরবরাহ চেইন চালু হলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে মাঠপর্যায়ের ঘাটতি কেটে যাবে। তবে বিশেষজ্ঞরা তাগিদ দিয়েছেন যে, শুধু বাজেট বরাদ্দ করলেই হবে না; আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে সময়মতো আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজার থেকে পণ্য কেনা, পর্যাপ্ত আপদকালীন মজুত গড়ে তোলা এবং একটি টেকসই ও গতিশীল সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।