তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সুযোগ নিয়ে দেশে আশঙ্কাজনক হারে বিস্তার লাভ করেছে অনলাইন জুয়া বা ডিজিটাল বেটিংয়ের অবৈধ নেটওয়ার্ক। একটি ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন বন্ধ করার সাথে সাথেই চক্রগুলো নতুন ডোমেইন বা নামে ডজন ডজন প্ল্যাটফর্ম চালু করে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখছে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি নতুন জুয়ার সাইট তৈরি হচ্ছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সক্রিয় রয়েছে অন্তত ৫৮৬টি জুয়ার ওয়েবসাইট। এসব পোর্টালে অবৈধ লেনদেনের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ৩ হাজার ৮৬৪টি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট এবং ১৯৮টি সাধারণ ব্যাংক হিসাব। এর মাধ্যমে দৈনিক গড়ে ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার বিপুল অঙ্কের অবৈধ লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে, যার সিংহভাগই ক্রিপ্টো ওয়ালেট ও ডিজিটাল হুন্ডির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চক্রের কাছে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
পুলিশ ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের তদন্তে দেখা গেছে, এই প্ল্যাটফর্মগুলোর নেপথ্য নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেটগুলো মূলত দেশের বাইরে অবস্থান করছে। রাশিয়া, চীন, ভিয়েতনাম, হংকং এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে এসব সাইটের মূল সার্ভার পরিচালিত হয়। বিদেশি এই চক্রগুলো বাংলাদেশে এজেন্ট ও সাব-এজেন্টের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে আকর্ষণ করে বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। এরপর সেই অর্থ স্থানীয় মুদ্রায় জমা রেখে ডিজিটাল হুন্ডি বা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে বিদেশে পাচার করা হয় এবং যেসব দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি বৈধ, সেখানে তা ডলারে রূপান্তর করে মূল হোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। সম্প্রতি সিআইডি ও গোয়েন্দা পুলিশের পৃথক অভিযানে দেশি-বিদেশি একাধিক সক্রিয় চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা পাচারের সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ মিলেছে।
অনলাইন জুয়ার পুরো লেনদেন প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুকৌশলে সম্পন্ন হয়। একজন ব্যবহারকারী একটি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে মোবাইল নম্বর দিয়ে হিসাব খোলার পর নির্দিষ্ট এজেন্ট বা ব্যক্তিগত ওয়ালেটে অর্থ পাঠান। এই কাজে ব্যবহার করা এমএফএস হিসাবগুলোর মাধ্যমে দৈনিক ৩০ হাজার থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত আদান-প্রদান করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে অসদুপায় অবলম্বন করে বা কমিশন দিয়ে এমএফএস এজেন্টের নম্বর ভাড়া নিয়ে জুয়ার টাকা সংগ্রহ করা হয়। সম্প্রতি কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে গ্রেফতার হওয়া এক এজেন্টের মাধ্যমে দেখা গেছে, বৈধ ব্যবসার আড়ালে তিনি একাই অন্তত ১০ থেকে ১১টি জুয়ার প্ল্যাটফর্মের অর্থ পরিচালনা করতেন। এসব অনিয়ম ঠেকাতে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউর সহযোগিতায় এরই মধ্যে অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল হুন্ডির সাথে যুক্ত প্রায় ৫৫ হাজার মোবাইল ওয়ালেটের লেনদেন স্থগিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার ১০৯টি জুয়ার পোর্টাল এবং সাড়ে চার শতাধিক মোবাইল অ্যাপ বন্ধ বা ব্লক করেছে। তবে কেবল ওয়েবসাইট বা অ্যাপ বন্ধ করে এই সমস্যার টেকসই সমাধান আসছে না। কারণ ব্যবহারকারীদের সাথে চক্রের যে পেমেন্ট চ্যানেল ও যোগাযোগের নেটওয়ার্ক রয়েছে, তা সচল থাকে। একটি সাইট বন্ধ হলেই সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীদের মোবাইল নম্বরে নতুন ওয়েবসাইটের লিংক পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং সেখানে পূর্বের ব্যালেন্স অক্ষুণ্ণ রেখেই পুনরায় খেলা চালু করার সুযোগ থাকে।
প্রযুক্তি ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ডিজিটাল চক্রকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে হলে কেবল ওয়েবসাইটের প্রবেশাধিকার বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। জুয়ার প্ল্যাটফর্ম, অ্যাপ, ব্যবহারকারী, তৃণমূল পর্যায়ের এজেন্ট, মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব এবং চূড়ান্ত অর্থ পাচারের পুরো আর্থিক শৃঙ্খলকে সমন্বিত ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনতে হবে। বিটিআরসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এবং সাইবার পুলিশের মধ্যে সার্বক্ষণিক রিয়েল-টাইম তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমেই কেবল অবৈধ লেনদেনের চ্যানেলগুলো পুরোপুরি অচল করা সম্ভব। অন্যথায় প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে জাতীয় অর্থনীতির এই নীরব রক্তক্ষরণ বন্ধ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।