• মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ০১:৩৯ পূর্বাহ্ন

ওবামা আমলের চেয়েও সুবিধাজনক অবস্থানে নতুন ইরান চুক্তি

Reporter Name / ৩ Time View
Update : রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর আকস্মিক বিমান হামলার মাধ্যমে যে বিধ্বংসী ইরান যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, তার অবসান ঘটাতে অবশেষে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে ১৪ দফার একটি খসড়া চুক্তি প্রকাশ করার পর থেকেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক নতুন আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা এখন এই চুক্তির চুলচেরা বিশ্লেষণে ব্যস্ত। বিশেষ করে, তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—তা নিয়ে নানামুখী সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। অনেকেই এই নতুন সমঝোতাকে ওবামা প্রশাসনের আমলে হওয়া ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তির (জেসিপিওএ) সাথে তুলনা করছেন, যা ২০১৮ সালে ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে একতরফাভাবে বাতিল করেছিলেন। তবে তথ্যচিত্র ও চুক্তির শর্তাবলি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এবারের চুক্তিটি ওবামার আমলের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং এর মাধ্যমে ট্রাম্পের ওপর একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছে ইরান।

প্রতিরক্ষা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের দিক থেকে ওবামা আমলের পরমাণু চুক্তির মূল লক্ষ্যই ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেওয়া। সে সময় তেহরানের পারমাণবিক উপাদানের মজুত সর্বোচ্চ ৩০০ কেজিতে সীমিত রাখা হয়েছিল এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশের ওপরে নেওয়ার ওপর দীর্ঘ ১৫ বছরের কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) ইরানের যেকোনো পরমাণু কেন্দ্রে সার্বক্ষণিক নজরদারির একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। তবে ২০১৮ সালে ট্রাম্প সেই চুক্তি বাতিল করার পর ইরান অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পুনরায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে। মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়ামের এক বিশাল মজুত ছিল, যা দিয়ে যেকোনো মুহূর্তে সামরিক গ্রেডের ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, এবারের নতুন চুক্তিতে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়নের কোনো সুনির্দিষ্ট ও কড়া রূপরেখা নেই। চুক্তিতে কেবল বলা হয়েছে, দুই পক্ষ ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম নিষ্ক্রিয় করার বিষয়ে আলোচনা করবে। ট্রাম্প মুখে ইরানের পারমাণবিক উপাদান ধ্বংসের দাবি করলেও চুক্তির মূল দলিলে তার কোনো উল্লেখ নেই। সবচেয়ে বড় চমক হলো, এই চুক্তিতে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করা হয়েছে, অথচ এই ক্ষেপণাস্ত্রের অজুহাতেই ২০১৮ সালে ওবামার চুক্তি বাতিল করেছিলেন ট্রাম্প।

অর্থনৈতিক ও আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে ওবামা আমলের চুক্তিটি ছিল অত্যন্ত কঠোর। সে সময় ওয়াশিংটন তেহরানকে সরাসরি কোনো তহবিল বা অর্থ দেয়নি, বরং তাদের আটকে থাকা নিজস্ব সেন্ট্রাল ব্যাংকের ৫০ বিলিয়ন ডলার ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালের পর ট্রাম্পের আরোপ করা একের পর এক কঠোর অর্থনৈতিক ও তেল নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান চরম সংকটে পড়েছিল, যা চলতি বছরের শুরুতে দেশটিতে তীব্র সরকারবিরোধী বিক্ষোভের জন্ম দেয়। তবে এবারের নতুন চুক্তিতে ট্রাম্প প্রশাসন এক সপ্তাহের মাথায় ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে তুলে নেওয়ার অভূতপূর্ব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চুক্তি সইয়ের সাথে সাথেই কোনো পূর্বশর্ত ছাড়াই ইরানের তেল রপ্তানি, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সেবা ও পরিবহনের ওপর তাৎক্ষণিক ছাড় দেওয়া হয়েছে, যা তেহরানকে যুদ্ধ শুরুর আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা মিলে কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল আন্তর্জাতিক তহবিল গঠন করতে সম্মত হয়েছে, যা ইরানের জন্য এক বিরাট অর্থনৈতিক লটারি জেতার সামিল।

জাহাজ চলাচল ও জলপথের ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণেও এসেছে এক আমূল পরিবর্তন। ওবামা আমলের চুক্তিতে হরমুজ প্রণালির কোনো উল্লেখই ছিল না এবং সে সময় এই রুট দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৯৪টি বাণিজ্যিক জাহাজ কোনো বাধা ছাড়াই পার হতো। তবে ২০২৬ সালের যুদ্ধ শুরুর পর মার্কিন নৌ অবরোধ এবং বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানি ড্রোন হামলার কারণে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল দৈনিক মাত্র ৬টিতে নেমে এসেছিল। নতুন চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের ওপর থেকে তাদের সমস্ত নৌ অবরোধ সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য থাকবে। এর বিনিময়ে ইরান আগামী ৬০ দিনের জন্য কোনো রকম টোল বা শুল্ক ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদ পারাপারের সাময়িক সুযোগ দেবে। তবে এর পর কী হবে, তা নির্ধারণের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ইরান ও ওমানকে। এর মধ্যেই গত ২১ মে ইরান একতরফাভাবে এই জলপথ নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেট অথরিটি’ গঠন করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ৬০ দিন পর তারা এই আন্তর্জাতিক জলপথ ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন বাণিজ্যিক ফি বা চার্জ আদায় করবে। নতুন চুক্তিতে ইরানের এই ফি আদায়ের সার্বভৌম অধিকারকে বন্ধ করার কোনো ব্যবস্থাপনাই রাখা হয়নি, যা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবকে আকাশচুম্বী করে তুলবে। ওবামার চুক্তিটি ছিল দীর্ঘ দুই বছরের আলোচনার পর একটি পূর্ণাঙ্গ দলিল, আর ট্রাম্পের বর্তমান চুক্তিটি মূলত ৬০ দিনের একটি প্রাথমিক রূপরেখা মাত্র, যার ছত্রে ছত্রে ট্রাম্পের পিছু হটে যাওয়া এবং ইরানের একচ্ছত্র কূটনৈতিক বিজয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category