পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গত দেড় দশক ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে রাখা দল অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) এমন নজিরবিহীন ও চরম পরিণতি ঘটবে, তা হয়তো কয়েক সপ্তাহ আগেও দলটির কট্টর সমর্থকরাও কল্পনা করতে পারেননি। টানা ১৫ বছর ধরে রাজত্ব করার পর সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে দলটি কেবল খণ্ড-বিখণ্ডই হয়নি, বরং সাংগঠনিকভাবে কার্যত তিন টুকরো হয়ে গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সর্বভারতীয় এই দলটির এমন আকস্মিক পতনকে ‘ইমপ্লোশন’ বা ভেতরে ভেতরে সৃষ্টি হওয়া তীব্র অসন্তোষ থেকে চৌচির হয়ে যাওয়া বলে বর্ণনা করছেন।
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো শক্তিশালী ও সুপ্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাসীন দলের এত দ্রুত এবং নাটকীয় বিভাজন সত্যিই বিরল। ঠিক কী কারণে মমতার এমন সাম্রাজ্য ধসে পড়ল? এর নেপথ্যের গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণ বিশ্লেষণ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মূলত তিনটি প্রধান কারণ বা নিয়ামক চিহ্নিত করেছেন।
১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ভেঙে যখন মমতা ব্যানার্জী তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেছিলেন, তখন থেকেই দলটির নিজস্ব কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শন, সামাজিক দর্শন বা কাঠামোগত মতাদর্শের অভাব ছিল। দলটির একমাত্র এবং প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল দীর্ঘ ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট (সিপিআইএম) সরকারকে বাংলা থেকে হঠিয়ে ক্ষমতায় আসা। ২০১১ সালে সেই লক্ষ্য পূরণের পর মমতার রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়ায় ‘পপুলিজম’ বা জনমোহিনী বিভিন্ন প্রকল্প ও নীতি।
কিন্তু ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) যেমন একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শিক ভিত (হিন্দুত্ববাদ) রয়েছে কিংবা জাতীয় কংগ্রেসের যেমন দীর্ঘদিনের ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থী ভাবধারা রয়েছে—তৃণমূলের তেমন কোনো আদর্শিক চাদর ছিল না। ফলে এবারের নির্বাচনে পরাজয়ের গ্লানি সামনে আসতেই ক্ষমতার মোহে থাকা নেতাদের সামনে আঁকড়ে ধরার মতো কোনো আদর্শ অবশিষ্ট ছিল না। পর্যবেক্ষকদের মতে, মমতা ব্যানার্জী দলটিকে স্রেফ ‘নির্বাচন-কেন্দ্রিক’ মেকানিজমে আটকে রেখেছিলেন, কোনো স্থায়ী আদর্শিক বুনিয়াদ দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। যার অনিবার্য পরিণতিতে, ক্ষমতা হারানোর সাথে সাথেই নেতৃত্বের একটি বড় অংশ নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং আখের গোছাতে অতি দ্রুত দলত্যাগের পথ বেছে নিয়েছেন।
তৃণমূলের এই অভূতপূর্ব অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়কে কাজে লাগাতে দিল্লির বিজেপি নেতৃত্ব কোনো ভুল বা কসুর করেনি। গেরুয়া শিবিরের শীর্ষ নেতৃত্ব খুব ভালো করেই জানে যে, প্রশাসক বা মুখ্যমন্ত্রী মমতার চেয়ে রাজপথের ‘বিরোধী নেত্রী’ মমতা ব্যানার্জী অনেক বেশি ক্ষুরধার ও বিপজ্জনক। তাই পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক পরিসরটি যেন কোনোভাবেই আবারও মমতাকেন্দ্রিক না হয়ে ওঠে, সেজন্য বিজেপি পর্দার আড়াল থেকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে একটি ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ বিরোধী দল তৈরির ছক কষেছে।
বিজেপির এই বহুমাত্রিক কৌশলের মূলত দুটি সফল দিক ছিল:
রাজ্য স্তরে চাল: পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়কদের ঋতব্রত ব্যানার্জীর নেতৃত্বে আলাদা একটি শক্তিশালী ব্লক গঠন করতে নেপথ্য থেকে মদত দিয়েছে বিজেপি, যারা বর্তমানে বিধানসভায় সরকারের চরম সমালোচনায় মুখর।
কেন্দ্রীয় স্তরে চাল: লোকসভার তৃণমূল এমপি-দের একটি বড় অংশকে ভেঙে ‘এনসিপিআই’-এর ব্যানারে সরাসরি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন এনডিএ (NDA) জোটে টেনে আনা হয়েছে, যাতে দিল্লির লোকসভায় মোদী সরকারের শক্তি সহজেই ৩০০-র কোটা পার হয়ে যায়।
সবচেয়ে চতুরতার বিষয় হলো—বিজেপি কৌশলে এই দুই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাউকেই সরাসরি নিজেদের দলে (বিজেপিতে) যোগ দেওয়ায়নি। এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছে দলবদলের তীব্র নেতিবাচক বার্তাও গেল না, অথচ তৃণমূলের অন্দরে সৃষ্টি হলো এক চরম মানসিক ও সাংগঠনিক অস্থিরতা।
তৃণমূলের এই ঐতিহাসিক ভাঙনের পেছনে দলটির অন্দরে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত কারণ হলো মমতার ভাইপো এবং দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জীর একনায়কতান্ত্রিক নেতৃত্ব। দলের ভেতর তাঁকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সুপ্ত ক্ষোভই মূলত এই চূড়ান্ত বিভাজনের পথ প্রশস্ত করেছে। তৃণমূলের প্রবীণ ও দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাদের মূল অভিযোগ—অভিষেক দল পরিচালনায় এক ধরনের ‘কর্পোরেট কায়দা’ এবং নিজস্ব একচেটিয়া একটি ঘনিষ্ঠ তরুণ বলয় তৈরি করেছিলেন, যা দলের নিচুতলার সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের কয়েক যোজন দূরত্ব তৈরি করে।
বিশেষ করে ‘আই-প্যাক’ (I-PAC)-এর মতো পেশাদার নির্বাচনী পরামর্শক সংস্থাকে দলের মূল নীতি নির্ধারণ এবং প্রার্থী বাছাইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসায় মমতার পুরোনো ও বিশ্বস্ত সহযোদ্ধাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের আগুন দানা বাঁধে। এর পাশাপাশি, অভিষেকের বিরুদ্ধে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলোর তোলা একাধিক আর্থিক কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতির অভিযোগ তাঁর ভাবমূর্তিকে সাধারণ মানুষের কাছে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফলে ক্ষুব্ধ ও বিদ্রোহী নেতারা এখন অভিষেক ব্যানার্জীর এই বিতর্কিত নেতৃত্বকে সামনে রেখেই নিজেদের দলবদলের প্রকাশ্য সাফাই গাইছেন, যা তৃণমূলের মূল সাংগঠনিক মেরুদণ্ডকে ভেঙে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান অনুঘটক বা ক্যাটালিস্ট হিসেবে কাজ করেছে।
তৃণমূল কংগ্রেস এখন মূলত তিনটি স্পষ্ট ধারায় বা খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়েছে:
প্রথম খণ্ড: ঋতব্রত ব্যানার্জীর নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী, যারা নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করছে।
দ্বিতীয় খণ্ড: এনডিএ-র দিকে ঝুঁকে পড়া দিল্লির বিদ্রোহী লোকসভা এমপি-দের গোষ্ঠী।
তৃতীয় খণ্ড: মমতা ব্যানার্জী এবং অভিষেক ব্যানার্জীর অনুগতদের নিয়ে গঠিত অবশিষ্ট অংশ, যাকে রাজনৈতিক মহল ‘কালীঘাট তৃণমূল’ বলে অ্যাখ্যা দিচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের মতো একটি রাজনৈতিকভাবে সচেতন রাজ্যে এত বড় এবং সুপ্রতিষ্ঠিত একটি একক আঞ্চলিক শক্তির এত দ্রুত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়া আধুনিক ভারতের সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাসে সত্যিই এক নজিরবিহীন অধ্যায়।