রাজধানীর বুকে এক দীর্ঘস্থায়ী অপরাধের আখড়ায় পরিণত হয়েছে মোহাম্মদপুর এলাকা। দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা চিরুনি অভিযান, ব্লক রেইড, সেনাবাহিনীর বিশেষ টহল এবং কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি চালানোর পরও এই জনপদের অপরাধচিত্র বদলাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান সব তৎপরতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দুই দিন পর পরই ঘুরেফিরে এই এলাকাটি নৃশংসতা, রক্তপাত ও নির্মমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসছে। কখনো মাদক বিক্রির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে গোলাগুলি, কখনো অস্ত্রের মহড়া, আবার কখনো রুদ্ধশ্বাস ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা এখানে নিত্যদিনের চিত্র। শত শত অপরাধীকে গ্রেপ্তারের পরও পরিস্থিতির কোনো টেকসই উন্নতি না হওয়ায় সাধারণ নাগরিকদের মনে এখন স্থায়ী আতঙ্কের জন্ম নিয়েছে। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দাদের মতে, পুরো এলাকাটি এখন চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরের মতো অপরাধের এক অভয়ারণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে; যার একমাত্র তফাত হলো সলিমপুর মূল শহরের বাইরে, আর মোহাম্মদপুর খোদ মেগাসিটির ভেতরে অবস্থিত।
স্থানীয়রা বলছেন, মোহাম্মদপুর এলাকায় রিকশা, ফুটপাত, ফুট ওভারব্রিজ তো বটেই, এমনকি নিজের বাসার প্রধান ফটকের সামনে থেকেও ছিনতাই বা কোপের শিকার হওয়া এখন ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে রাত ৮টার পর এবং ভোরবেলা এই এলাকার সড়কগুলোতে চলাচল করা চরম ঝুঁকিপূর্ণ। চাপাতি ও ধারালো অস্ত্রধারী কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ওত পেতে থাকে সাধারণ পথচারীদের পথ আগলে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার জন্য। এই ভয়ের কারণে সচেতন বাসিন্দারা এখন সন্ধ্যার পর পরই ঘরের ভেতরে চলে আসার চেষ্টা করেন। এখানে বাস করে ছিনতাই বা চাঁদাবাজির মুখোমুখি না হওয়াটা এক অলৌকিক সৌভাগ্যের বিষয়। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানুষকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করা এবং আধিপত্য বজায় রাখতে দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়া দেওয়া এখানে রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। অপরাধের এমন তীব্রতার মাঝেও সাধারণ মানুষ একটি স্বাধীন ও নিরাপদ মোহাম্মদপুরের স্বপ্ন দেখছেন এবং প্রায়ই বিভিন্ন সচেতন নাগরিক সংগঠনের ব্যানারে মানববন্ধনের মাধ্যমে নিজেদের সুরক্ষার দাবি তুলছেন।
এই অপরাধের বিস্তার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসহায়ত্বের পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও গভীর কারণ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। জুলাই আন্দোলনের সময় থানা থেকে বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র লুট হয়েছিল, যার একটি বড় অংশ মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের হাতে চলে গেছে। এই অবৈধ মারণাস্ত্রের সরবরাহ অপরাধীদের আগের চেয়ে অনেক বেশি বেপরোয়া ও দুঃসাহসী করে তুলেছে। এর পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসনের ভেতরের এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক স্থবিরতা বা মনোবলের ঘাটতি, বিশ্বস্ত সোর্সের অভাব এবং অপরাধীদের মাথার ওপর স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের অদৃশ্য ছত্রছায়া থাকার কারণে এলাকাটি বিশেষ অপরাধী চক্রের জন্য একটি অত্যন্ত নিরাপদ চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া ভয়ংকর সন্ত্রাসীরাও রাজনৈতিক বা অদৃশ্য তদবিরের জোরে মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে জামিনে বের হয়ে আবারও একই এলাকায় বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় এবং পুলিশের ওপর সরাসরি হামলা করতেও দ্বিধাবোধ করে না।
মোহাম্মদপুরের অপরাধের এই ভয়াল রূপকে টিকিয়ে রাখছে মূলত সেখানে সক্রিয় থাকা ২৭টিরও বেশি দুর্ধর্ষ গ্যাং বা কিশোর অপরাধী দল। পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই গ্রুপগুলোতে সরাসরি দুই শতাধিক নিয়মিত সদস্য রয়েছে এবং এর বাইরে কোনো নির্দিষ্ট দলের স্থায়ী সদস্য না হয়েও আরও শতাধিক ভাসমান কিশোর ও যুবক অস্ত্র হাতে নিয়মিত ছিনতাই করে বেড়াচ্ছে। এই অঞ্চলের আতঙ্ক হিসেবে পরিচিত কুখ্যাত দলগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—আকবর গ্রুপ, পাটালি গ্রুপ, কবজি কাটা গ্রুপ, লও ঠেলা গ্রুপ, ভইরা দে গ্রুপ, ফরহাদ গ্রুপ, টক্কর ল গ্রুপ এবং ডায়মন্ড গ্রুপ। এই সন্ত্রাসী দলগুলো পুরো মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকাকে নিজেদের মধ্যে ছোট ছোট জোনে ভাগ করে অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করছে।
ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোহাম্মদপুরের বসিলা, ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যান, সাতমসজিদ হাউজিং, লাউতলা, নবীনগর হাউজিং, তুরাগ হাউজিং, কাটাসুর, গ্রিন হাউজিং, বসিলা গার্ডেন সিটি, একতা হাউজিং, চাঁন মিয়া হাউজিং, মোহাম্মদীয়া হাউজিং লিমিটেড ও সোসাইটি, নবোদয় হাউজিং, বোটঘাট, সাদেক খান রোড, ক্যানসার গলি, রায়েরবাজার, পুলপাড় বটতলা এবং শেরেবাংলা রোডে সবচেয়ে বেশি ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। অপরাধের এই বিস্তৃতির মুখে সম্প্রতি বসিলা এলাকায় একটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করেছে ডিএমপি। এই ক্যাম্প চালুর পর থেকে ঢাকা উদ্যান ও নবীনগর হাউজিং সংলগ্ন এলাকাগুলোতে নিয়মিত চেকপোস্ট ও বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ডিএমপির নিয়মিত টহল পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, ডিবি পুলিশ এবং কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটও এখানে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে, কিন্তু তবুও অপরাধের চাকা থামাচ্ছে না।
একের পর এক আলোচিত ও নৃশংস রক্তক্ষয়ী অপরাধের ঘটনা মোহাম্মদপুরের বাতাসকে প্রতিনিয়ত ভারী করে তুলছে। অতি সম্প্রতি সাতমসজিদ রোডে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি নেতা মো. নুরুল ইসলামকে নিজ বাসার সামনে দুটি মোটরসাইকেলে আসা হেলমেট পরিহিত ছয় যুবক কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করে পালিয়ে যায়। এর মাত্র কয়েকদিন আগে মোহাম্মদপুরে বিশেষ অভিযান পরিচালনার সময় আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম এবং এসআই তরুণ অপরাধীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন, যারা মূলত কুখ্যাত ‘কবজি কাটা আনোয়ার গ্রুপ’-এর সক্রিয় সদস্য। একই দিন সকালে আদাবরের ৭ নম্বর সড়কে এক বিকাশ ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে তাঁর কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা ও মোবাইল ফোন লুটে নেয় এই একই গ্রুপের সদস্যরা। এ ছাড়া নূরজাহান রোডে বাসার ফটকের সামনে দুই নারীর পথরোধ করে চাপাতির ভয় দেখিয়ে লাগেজ ও মূল্যবান গহনা ছিনতাই এবং ৪০ ফুট সড়কে এক দম্পতিকে জিম্মি করে সবকিছু লুটে নেওয়ার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে এই জনপদের অপরাধের শিকড় কতটা গভীরে চলে গেছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান কিছুটা ভিন্ন দাবি করেছেন। তাঁর মতে, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ঘটে যাওয়া দুটি বহুল আলোচিত খুনের ঘটনার পর গত দুই মাসে মোহাম্মদপুরে আর কোনো বড় হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। তবে জেনেভা ক্যাম্পসহ পুরো এলাকাটি ঐতিহ্যগতভাবেই একটি সংবেদনশীল ‘ক্রাইম জোন’ হওয়ায় ছোট-বড় বিচ্ছিন্ন অপরাধ লেগেই থাকে। পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী অপরাধ বর্তমানে তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং কোনো সমাজের বুক থেকে অপরাধকে শতভাগ বা সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব নয়। বারবার অপরাধে জড়ানো ব্যক্তিদের প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট জানান, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা জামিনে বেরিয়ে আবারও অপরাধ করলে পুলিশ তাদের পুনরায় গ্রেপ্তার করছে, যার কারণে অনেকের নামেই ১০ থেকে ১৫টি পর্যন্ত মামলা রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পুলিশের বিশেষ টহল জোরদার রয়েছে এবং অপরাধী যে-ই হোক না কেন, কাউকেই কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না বলে পুলিশের পক্ষ থেকে কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন