• মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ০৪:২৪ অপরাহ্ন
Headline
রাতের ভ্রমণে ১০টি সতর্কতা মালয়েশিয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মির্জা আব্বাসকে দেখতে গেলেন গোলাম পরওয়ার দিল্লি ফেরালেই আইনি সুরক্ষা, তবে শাস্তি আদালতের হাতে: হাসিনার পরিণতি নিয়ে সরকারের স্পষ্ট বার্তা কোরবানির ঈদ নিয়ে ভিন্ন ভাবনায় পরীমনি পেলের রাজকীয় রেকর্ডে নেইমারের ছোঁয়া: ১০ নম্বর জার্সিতে সেলেসাওদের শেষ মহাকাব্যের অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব ফুটপাত পথচারীর, নাকি হকারের? জায়গা বরাদ্দ নীতিমালার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের কড়া রুল আগ্রাসনের কড়া জবাব: সীমান্তে প্রতিরোধের নতুন সমীকরণে বাংলাদেশ কওমি রাজনীতিতে ক্ষমতার নতুন মেরুকরণ: জামায়াত-হেফাজত স্নায়ুযুদ্ধে ভাঙনের মুখে ইসলামী ঐক্য ‘ভূমি সেবা জনগণের প্রতি করুণা নয়’: হয়রানিমুক্ত আধুনিক ব্যবস্থাপনার কড়া বার্তা প্রধানমন্ত্রীর ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নতুন রূপরেখা

কওমি রাজনীতিতে ক্ষমতার নতুন মেরুকরণ: জামায়াত-হেফাজত স্নায়ুযুদ্ধে ভাঙনের মুখে ইসলামী ঐক্য

Reporter Name / ২ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতির মাঠে শুরু হয়েছে এক অভূতপূর্ব ও তুমুল ঝড়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণকে পেছনে ফেলে এবার একেবারে মুখোমুখি অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দেশের সবচেয়ে বড় অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম এবং দেশের অন্যতম বৃহৎ ও সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দৈনিক সমকালের এক চাঞ্চল্যকর ও গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ছাড়তে খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলামসহ অন্তত চারটি সমমনা ধর্মভিত্তিক দলকে তীব্র চাপ প্রয়োগ করছে হেফাজত। হেফাজতের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে এই দলগুলোকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে—হয় তাদের জামায়াত জোট ছাড়তে হবে, নতুবা হেফাজত থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার এই চরম আলটিমেটাম দেশের ইসলামি রাজনীতিতে এক বিশাল মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু ঠিক নির্বাচনের পরপরই কেন এই প্রচণ্ড চাপ? জামায়াত জোটের শরিক দলগুলোই বা কেন হেফাজতের এই নির্দেশ মানতে নারাজ? আর এর পেছনে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির কোনো প্রচ্ছন্ন ভূমিকা আছে কি না, তা নিয়ে সারা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে বিস্তর বিশ্লেষণ।

এই চরম বিরোধের সূত্রপাত কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এর শেকড় লুকিয়ে আছে নির্বাচনের ঠিক আগের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দীর্ঘদিনের আদর্শিক দ্বন্দ্বের মধ্যে। কওমি আলেমদের সাথে জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক বিরোধ বহু পুরোনো। নির্বাচনের আগে এই বিরোধ প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন হেফাজতের আমির শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী এবং মহাসচিব সাজিদুর রহমান। তারা জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদীর মতবাদকে সরাসরি ‘ভ্রান্ত আকিদা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কওমি আলেমদের দেওবন্দি দর্শনের সাথে মওদুদীর দর্শনের এই সংঘাতকে কেন্দ্র করে নির্বাচনের আগে হেফাজতের পক্ষ থেকে কড়া ফতোয়া দেওয়া হয়েছিল যে, জামায়াতকে ভোট দেওয়া হারাম। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠের হিসাব-নিকাশ আর কিতাবের ফতোয়া যে সব সময় এক পথে হাঁটে না, তা নির্বাচনের পর থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করে।

রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যায়, হেফাজতের সাথে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত চারটি দল—বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন এবং নেজামে ইসলাম পার্টি—নির্বাচনের মাঠে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রধান শরিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকসহ এই চারটি দলের শীর্ষ নেতারা আবার হেফাজতে ইসলামেরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপদে আসীন। আর ঠিক এখানেই বেঁধেছে মূল আদর্শিক ও রাজনৈতিক জট। একদিকে তারা হেফাজতের নেতা হিসেবে জামায়াতকে ভ্রান্ত বলছেন, অন্যদিকে নিজেদের রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে সেই জামায়াতের সাথেই জোট করে ক্ষমতার রাজনীতিতে ভাগ বসাচ্ছেন। এই দ্বিমুখী নীতি থেকে বের করে আনার জন্য গত ২৮শে এপ্রিল হেফাজতের আমির একটি বিশেষ কমিটিও গঠন করে দিয়েছেন, যাদের মূল কাজ হলো এই চারটি দলকে যেকোনো মূল্যে জামায়াত জোট থেকে বের করে আনা।

এই চরম উত্তেজনার মাঝেই গত রোববার চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজত আমিরের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার ও জরুরি বৈঠক করেন মাওলানা মামুনুল হক। বৈঠক শেষে তিনি গণমাধ্যমের সামনে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান এবং জোটের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। মাওলানা মামুনুল হক অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তার অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, “জামায়াতের সঙ্গে আমাদের আকিদাগত পার্থক্য আগের মতোই আছে এবং সেই জায়গায় আমরা বিন্দুমাত্র ছাড় দিইনি। তবে ১১ দলীয় ঐক্য কোনো আদর্শিক জোট নয়। এটি মূলত জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম মাত্র।” তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, কওমি ধারার রাজনৈতিক নেতারা এখন ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কের চেয়ে দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া ক্ষমতার নতুন বলয়ে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতেই বেশি আগ্রহী।

তবে হেফাজতের এই আলটিমেটামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী পাল্টা যুক্তি এসেছে খোদ এই চার দলের ভেতর থেকেই। তারা হেফাজতের বিশেষ কমিটিকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, জোট ছাড়ার এই চাপ সম্পূর্ণ একপেশে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাদের যুক্তিটি অত্যন্ত ধারালো—একই হেফাজতের প্রথম সারির নেতারা যখন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ব্যানারে বিএনপির সঙ্গে জোট করে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে জাতীয় নির্বাচন করতে পারেন, কিংবা ইসলামী ঐক্যজোট যখন বিএনপির সঙ্গে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, তখন হেফাজত তাদের ওপর কেন কোনো চাপ প্রয়োগ করছে না? জমিয়ত যদি বিএনপির জোটে থেকে হেফাজতে থাকতে পারে, তবে তারা কেন জামায়াত জোটে থেকে হেফাজতে থাকতে পারবেন না? এই দলগুলোর নেতাদের সুস্পষ্ট অভিযোগ, হেফাজতে ইসলাম একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হওয়ার কথা থাকলেও, তারা মূলত রাজনৈতিকভাবে বিএনপির দিকেই বেশি ঝুঁকে পড়েছে এবং বিএনপির এজেন্ডা বাস্তবায়নেই পরোক্ষভাবে কাজ করছে।

এদিকে জামায়াত এবং হেফাজতের এই চরম টানাপোড়েনের মাঝে ঘি ঢেলে পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। নির্বাচনের আগে সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর ঐক্যের ডাক দিয়ে জামায়াতের সঙ্গে তারা যুগপৎ আন্দোলন করলেও, শেষ মুহূর্তে আসন বণ্টন নিয়ে চরম ঝামেলার কারণে সেই জোট ভেঙে যায়। এরপর থেকেই চরমোনাই পীর পুনরায় জামায়াতের কড়া সমালোচনা শুরু করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চরমোনাই পীর এখন হেফাজতের সুরেই সুর মিলিয়ে জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করার চেষ্টা করছেন, যাতে ইসলামি রাজনীতির মাঠে জামায়াতের ভোটব্যাংকে ভাগ বসানো যায়।

তবে হেফাজতের এই প্রকাশ্য বহিষ্কারের গুঞ্জন, আলটিমেটাম এবং চরমোনাই পীরের লাগাতার সমালোচনা সত্ত্বেও জামায়াত জোট কিন্তু একচুলও পিছু হটছে না। বরং তারা আগামী দিনের জন্য আরও সুসংগঠিত হচ্ছে। জোটবদ্ধ থাকার বিষয়ে খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ডাক্তার আহমদ আবদুল কাদের সমকালকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে নিশ্চিত করে বলেন, “হেফাজতের চাপের মুখে আমাদের কোনো দলই জোট ছাড়ছে না। আমরা আমাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে অটল রয়েছি।” একই সুরে সুর মিলিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে বলেন, “আমাদের এই জোট কোনো সাময়িক বিষয় নয়। সংবিধান সংস্কারের দাবিতে জুলাই মাস পর্যন্ত সংসদের বাইরে আমাদের আন্দোলন ও কর্মসূচি যৌথভাবেই চলবে এবং এই ঐক্য আরও সুদৃঢ় হবে।”

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াতকে কেন্দ্র করে হেফাজতের এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল সংগঠনটির মাঠপর্যায়ের শক্তিকে অনেকটাই দুর্বল করে দিচ্ছে। একটি সময় ছিল যখন হেফাজতের ডাকে লাখো কওমি জনতা রাস্তায় নেমে আসত। কিন্তু সেই জৌলুস এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে, যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে এবারের ঐতিহাসিক ৫ই মে শাপলা চত্বর দিবসে। অতীতের বছরগুলোর মতো এবার আর হেফাজত একক ব্যানারে বড় কোনো কর্মসূচি মাঠে নামাতে পারেনি। উল্টো সংগঠনটির ভেতরে যে স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়েছে, তা রাজপথেই উন্মোচিত হয়েছে। ঢাকার লালবাগে ইসলামী ঐক্যজোটের নেতারা হেফাজতের ব্যানার এড়িয়ে সম্পূর্ণ আলাদা কর্মসূচি পালন করেছেন। আর সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা মাওলানা মামুনুল হক হেফাজতের ব্যানার বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন নাম ‘শাপলা স্মৃতি সংসদ’-এর ব্যানারে প্রোগ্রাম করতে বাধ্য হয়েছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মামুনুল হকের সেই প্রোগ্রামে জামায়াত জোটে থাকা হেফাজত নেতারাই প্রধানত অংশ নিয়েছেন।

এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে, জামায়াতকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে আমিরের দেওয়া ফতোয়া বা জোট ছাড়ার আলটিমেটাম হেফাজতের মাঠপর্যায়ের কওমি কর্মীরাও আর পুরোপুরি মেনে নিতে পারছেন না। আদর্শ বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতার এই দ্বন্দ্বে হেফাজতে ইসলাম এখন নিজের অস্তিত্বের সংকটেই নিমজ্জিত। সমকালের এই চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট প্রমাণ করে যে, ত্রয়োদশ নির্বাচনের পর বাংলাদেশের ইসলামপন্থী রাজনীতিতে এখন ক্ষমতার এক নতুন এবং জটিল মেরুকরণ চলছে। একদিকে বিএনপির দিকে দৃশ্যত ঝুঁকে থাকা হেফাজতের আদর্শিক চাপ, অন্যদিকে জুলাই বিপ্লবের ফসল ধরে রেখে রাজনীতিতে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করতে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান। কওমি আলেমদের এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে কোন খাদের কিনারায় নিয়ে দাঁড় করায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category