• মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ০৪:৪২ অপরাহ্ন

কুড়িগ্রামে দুধকুমারের বাঁধ ভেঙে পানিবন্দি হাজারো মানুষ

Reporter Name / ২ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬

টানা ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। বিশেষ করে জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া দুধকুমার নদের পানি অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় দেখা দিয়েছে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। পানির তীব্র চাপে উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের মুড়িয়ারহাট এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে হু হু করে বন্যার পানি প্রবেশ করছে। এতে ওই ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রামের হাজারো মানুষ আকস্মিকভাবে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পানিবন্দি এসব মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ ও হাহাকার।

স্থানীয়দের অভিযোগ ও সরেজমিন পরিস্থিতি থেকে জানা যায়, গত কয়েকদিনের অবিরাম বর্ষণ ও উজানের ঢলে দুধকুমার নদে পানি বাড়তে শুরু করে। পানির প্রবল চাপে মুড়িয়ারহাট এলাকার বেড়িবাঁধে ফাটল ও ধস দেখা দেয়। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, বাঁধে ধস দেখা দেওয়ার পর সময়মতো সংস্কারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যার ফলশ্রুতিতে রোববার বিকেলে পানির তোড়ে বাঁধের একটি বড় অংশ সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। বাঁধ ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই নদীর তীব্র স্রোত সরাসরি লোকালয়ে আঘাত হানে। চোখের পলকে তলিয়ে যেতে থাকে মানুষের বসতভিটা, রাস্তাঘাট ও ফসলের মাঠ।

বাঁধ ভেঙে ইতোমধ্যে নাগেশ্বরী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের মিয়াপাড়া, মালিয়াানি, সেনপাড়া, তেলিয়ানীপাড়া, পাটেশ্বরী, বোয়ালের ডারা, ধনিটারী এবং বড়মানী গ্রামের পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। শুধু গ্রামই নয়, বন্যার এই পানি আঘাত হেনেছে নাগেশ্বরী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাঞ্জুয়ারভিটা এবং ফকিরটারী এলাকাতেও। বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবদুল মান্নান জানান, মিয়াপাড়া ও মুড়িয়ারহাট এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি নিচু স্থানে বাঁধ উপচে পানি লোকালয়ে ঢুকছে। এর ফলে ইউনিয়নের ৪, ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ২০টি গ্রামের সাধারণ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

বন্যার এই ভয়াবহতা শুধু মানুষের ঘরবাড়িতেই সীমাবদ্ধ নেই, আঘাত হেনেছে কৃষকের স্বপ্নের ফসলেও। কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, পানি বৃদ্ধির কারণে জেলার সদর, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী এবং রৌমারী—এই চার উপজেলার নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার অন্তত ২০৪ হেক্টর জমির ফসল বর্তমানে পানির নিচে অবস্থান করছে। তলিয়ে যাওয়া ফসলের মধ্যে রয়েছে কৃষকের অতি যত্নে তৈরি করা আমন ধানের বীজতলা, পাট এবং বিভিন্ন ধরনের গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি। কৃষকরা আশঙ্কা করছেন, পানি দীর্ঘস্থায়ী হলে এসব ফসল সম্পূর্ণ পচে গিয়ে তাদের বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।

সোমবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দেওয়া সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, জেলার সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে দুধকুমার নদের পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক। পাটেশ্বরী পয়েন্টে দুধকুমারের পানি বিপৎসীমার ২১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে, তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার মাত্র ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে বইছে। এছাড়া ধরলা নদীর পানি কুড়িগ্রাম পয়েন্টে বিপৎসীমার ৪৮ সেন্টিমিটার নিচে, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে ৮৫ সেন্টিমিটার ও চিলমারী পয়েন্টে ৬৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে উজান থেকে ঢল নামা অব্যাহত থাকলে এসব নদীর পানিও দ্রুত বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে তীব্র আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ শুরু করেছে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে নদ-নদীর পানি অস্বাভাবিক বেড়েছে। বিশেষ করে বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের একটি নিচু সড়ক তলিয়ে যাওয়ার কারণে সেখান দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং নতুন করে লোকালয়ে পানি ঢোকা ঠেকাতে দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম খোদাদাদ হোসেন জানিয়েছেন, বাঁধ ভাঙার খবর পাওয়ামাত্রই পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে এবং জরুরি মেরামতের জন্য তাদের একটি বিশেষ দল ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিকভাবে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত রয়েছে।

বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ জানিয়েছেন, আকস্মিক ঢলে প্লাবিত এলাকার পানিবন্দি মানুষের জন্য জরুরি ত্রাণ সহায়তা হিসেবে নগদ দুই লাখ টাকা এবং ১১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়াও, নদীর তীরবর্তী এলাকার ভাঙন প্রতিরোধে আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে জেলার প্রতিটি উপজেলার জন্য এক হাজার করে জিও ব্যাগ মজুত রাখা হয়েছে, যাতে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যায়।

নদীভাঙন ও বন্যা কুড়িগ্রামের মানুষের নিত্যসঙ্গী হলেও, বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশের এই আকস্মিক ঘটনা সাধারণ মানুষের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের মাঝে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। দ্রুততম সময়ে বাঁধ সংস্কার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোই এখন প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তথ্যসূত্র: বাংলানিউজ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category