আমাদের দেশে কোনো পরিবারে যখন ক্যানসারের উপস্থিতি শনাক্ত হয়, তখন প্রতিক্রিয়াটি প্রায়শই অত্যন্ত দিশেহারা ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ওঠে| শরীরে কোনো অস্বাভাবিক পিণ্ড, দীর্ঘস্থায়ী ঘা, অপ্রত্যাশিত রক্তপাত কিংবা একটানা কাশিতে ক্লান্ত হয়ে একপর্যায়ে বায়োপসি করানো হয়| রিপোর্ট ইতিবাচক আসার পর পরিবারগুলো জমিজমা বিক্রি করে কিংবা সঞ্চয় ভেঙে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক খোঁজা, অস্ত্রোপচার, ব্যয়বহুল কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির পেছনে ছুটতে শুরু করে| কিন্তু ততক্ষণে রোগটি তার নিজস্ব গতিতে বহু দূর এগিয়ে গেছে এবং আমরা আসলে ক্যানসারের শর্তেই অসম যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে বাধ্য হই| ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে প্রায় ৪২ দশমিক ২ শতাংশ রোগী তৃতীয় ধাপে এবং আরও ১৮ শতাংশ রোগী চূড়ান্ত চতুর্থ ধাপে পৌঁছে প্রথমবার চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন| লক্ষণ চিনে সময়মতো হাসপাতালে না আসা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বিশেষায়িত কেন্দ্রে পাঠাতে দেরি হওয়া এবং সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয়ের সুযোগ না থাকাই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ|
এই বাস্তবতা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—ক্যানসার নিয়ন্ত্রণের লড়াই কি কেবল হাসপাতালে শয্যা বাড়ানো এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, পরিচিত ঝুঁকিগুলো এড়িয়ে এবং সুনির্দিষ্ট প্রতিরোধমূলক কৌশল গ্রহণ করে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ ক্যানসার সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা সম্ভব| তামাক নিয়ন্ত্রণ, ক্যানসার সৃষ্টিকারী ক্ষতিকর ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী টিকাদান এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ কমিয়ে আনা ক্যানসার নিয়ন্ত্রণের ঠিক ততটাই অবিচ্ছেদ্য অংশ, যতটা জরুরি অস্ত্রোপচার বা রেডিওথেরাপির মতো চিকিৎসা| অথচ আমাদের জাতীয় আলোচনা এখনো কেবল চিকিৎসার খরচের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে| কেবল টিউমার দৃশ্যমান হওয়ার পর তা অপসারণের দক্ষতা বাড়িয়ে কোনো দেশ ক্যানসারের মহাবিপর্যয় সামাল দিতে পারে না; এর জন্য জানা প্রয়োজন কেন এই মারণব্যাধি তৈরি হচ্ছে এবং প্রতিরোধের মাধ্যমে প্রক্রিয়ার শুরুতেই কীভাবে রাশ টানা যায়|
খাদ্য নিরাপত্তার মতো জাতীয় সংকটও এই ক্যানসার প্রতিরোধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত| প্রতিনিয়ত রাসায়নিক ও ক্ষতিকর জীবাণু দ্বারা বিষাক্ত হওয়া খাদ্য ক্যানসারসহ দুই শতাধিক দুরারোগ্য ব্যাধির অন্যতম উৎস| উদাহরণস্বরূপ অ্যাফলাটক্সিনের কথা বলা যেতে পারে, যা উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ছত্রাক থেকে খাদ্যে সংক্রমিত হয়| দীর্ঘকাল এই বিষাক্ত উপাদানের সংস্পর্শে থাকা এবং হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের সহাবস্থান লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়| দেশের খাদ্যে এমন কার্সিনোজেন বা ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদানের উপস্থিতি গবেষকদের নজরে এলেও তা প্রতিরোধে কার্যকর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নেই| ক্রেতারা কখনোই বাজারে আণবিক গবেষণাগার বহন করে নিয়ে যান না| ফলে খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ বা পরিবহনের সময় যদি বিষাক্ত উপাদান খাবারে ঢোকে, তবে তা গোড়াতেই নির্মূল করার দায়িত্ব সরকারের খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর| সাধারণ মানুষকে কেবল সচেতনভাবে নিরাপদ খাদ্য খেতে বলার নীতি দিয়ে রাষ্ট্র তার মৌলিক দায়িত্ব এড়াতে পারে না|
একইভাবে হেপাটাইটিস বি এবং হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস বা এইচপিভি প্রতিরোধের কার্যকর টিকাদান এবং নারীদের নিয়মিত জরায়ুমুখ ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে রোগটি প্রাথমিক টিউমারে রূপ নেওয়ার বহু আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব| তবে এই সমন্বিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সফল করতে হলে সবার আগে যে জিনিসটি প্রয়োজন, তা হলো একটি কার্যকর ‘জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যানসার রেজিস্ট্রি’ বা পিবিসিআর| আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশে আনুমানিক ১ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা গেছে ১ লাখ ১৬ হাজারের বেশি রোগী| অথচ এই বিশাল সংকট মোকাবিলায় আমাদের কোনো কেন্দ্রীয় ও সামগ্রিক জাতীয় ক্যানসার নিবন্ধন ব্যবস্থা নেই| জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল যে তালিকা রাখে, তা মূলত কেবল তাদের নিজস্ব হাসপাতালে আসা রোগীদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি| অথচ একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় পরিসংখ্যান থাকলে বোঝা যেত কেন নির্দিষ্ট কোনো পেশাজীবী গোষ্ঠী বা ভৌগোলিক অঞ্চলে কোনো বিশেষ ক্যানসারের প্রকোপ বাড়ছে কিংবা কেন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই রোগ আগের চেয়ে বেশি ছড়াচ্ছে|
কেবল টিউমার কেটে ফেলে বা আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যা গুনে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না| মানবদেহে অস্ত্রোপচারের পর অপসারণ করা প্রতিটি টিউমারের ভেতরেই রোগের জৈবিক ইতিহাস লুকিয়ে থাকে| রোগীর জীবনযাত্রার ইতিহাস, তার পেশাগত ঝুঁকি, তামাক বা আর্সেনিকের সংস্পর্শ এবং দেওয়া চিকিৎসার কার্যকারিতা যদি সেই টিউমার টিস্যুর সঙ্গে সংযুক্ত করে বিজ্ঞানভিত্তিক ‘টিউমার বায়োব্যাংক’ গড়ে তোলা না যায়, তবে আমরা ক্যানসার নিয়ে জানার বদলে কেবল রোগীর চিকিৎসা করেই যাব| সব রোগীকে রাতারাতি সর্বাধুনিক জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের আওতায় আনার প্রয়োজন নেই, তবে নির্দিষ্ট কিছু প্রধান সরকারি হাসপাতালে ক্যানসারের সঠিক তথ্য সংরক্ষণ, বায়োব্যাংক প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলো-আপের একটি টেকসই ব্যবস্থা এখনই চালু করা সম্ভব|
ক্যানসার ব্যবস্থাপনায় প্রতিরোধ, প্রাথমিক শনাক্তকরণ, সঠিক তথ্য লিপিবদ্ধকরণ, গবেষণা ও সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে পুনরায় প্রতিরোধকে জোরদার করার চক্রটিই রাষ্ট্রকে গড়ে তুলতে হবে| আমাদের অবশ্যই অভিজ্ঞ অনকোলজিস্ট, ক্যানসার বিশেষায়িত হাসপাতাল ও আধুনিক ওষুধের প্রয়োজন রয়েছে| কিন্তু মনে রাখতে হবে, চিকিৎসা হলো আত্মরক্ষার একেবারে শেষ ধাপ| একটি পরিণত স্বাস্থ্যব্যবস্থা কেবল হাসপাতালে আসা রোগীর টিউমার অপসারণের কথা ভাবে না; বরং তা অনুসন্ধান করে কেন এই টিউমারটি তৈরি হলো এবং সেই গবেষণালব্ধ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের পরবর্তী মানুষটিকে কীভাবে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করা যায়| ক্যানসার প্রতিরোধে সক্রিয় পদক্ষেপ না নিয়ে আমরা যদি কেবল রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর অপেক্ষায় বসে থাকি, তবে রোগ প্রতিরোধের যে মূল্যবান বছরগুলো আমরা হারিয়ে ফেলছি, তার কোনো বিকল্প আর তৈরি করা সম্ভব হবে না|