• বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১২ অপরাহ্ন
Headline
দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে সরকার: ৩ মাস বিশেষ সহায়তার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর সয়াবিনের বাজারে ফের আগুন: বোতল ও খোলা তেল লিটারে বাড়ল ৪ টাকা প্লাবনের পদধ্বনি: বিপৎসীমা ছাড়াল ৪ নদী, ৫ জেলায় অকাল বন্যার শঙ্কা চেতনা বিক্রির পণ্য নয়: সংসদে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ সম্বোধনের প্রস্তাব শামা ওবায়েদের ‘জুলাই থেকেই বিনামূল্যে ড্রেস ও ব্যাগ পাবে শিক্ষার্থীরা’: শিক্ষামন্ত্রী সংসদের আঙিনায় নারীরা: বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ৪৯, আটকে আছে একটির ভাগ্য শঙ্কামুক্ত মির্জা আব্বাস: শিগগিরই ফিরছেন চেনা রাজনৈতিক আঙিনায় খন্দকার মোশাররফের ১০৫ হিসাব অবরুদ্ধ কিউই বধের পুরস্কার: র‍্যাংকিংয়ে টাইগারদের বিশাল উল্লম্ফন প্রার্থনা করি যাতে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক ঠিক না হয়: আসামের মুখ্যমন্ত্রী

খন্দকার মোশাররফের ১০৫ হিসাব অবরুদ্ধ

Reporter Name / ২ Time View
Update : বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে দুর্নীতি ও অনিয়মের অনেক চাঞ্চল্যকর অধ্যায় একে একে উন্মোচিত হচ্ছে। একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এখন আইনের কাঠগড়ায়। ক্ষমতার অপব্যবহার করে কীভাবে পাহাড়সম অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছিল, তার এক বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ব্যাপক অনুসন্ধান এবং আইনি পদক্ষেপের ধারাবাহিকতায় এই সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে এবার এক কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে রাষ্ট্র। ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নামে থাকা অন্তত ১০৫টি বিভিন্ন ধরনের আর্থিক হিসাব সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ বা ফ্রিজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সাথে তার সমস্ত আয়কর নথিও জব্দ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এই আদেশের ফলে তিনি বা তার কোনো প্রতিনিধি এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আর স্থানান্তর বা উত্তোলন করতে পারবেন না।

আদালত এবং দুর্নীতি দমন কমিশন সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার ঢাকার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মো. আলমগীর এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি নির্দেশটি প্রদান করেন। দুদক সাবেক এই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও অভিযোগের ভিত্তিতে আদালতে পৃথক দুটি আবেদন দায়ের করেছিল। সেই আবেদনগুলোর ওপর দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত এই রায় দেন। বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালীন দুদকের পক্ষ থেকে আদালতের কাছে জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয় যে, খন্দকার মোশাররফ হোসেন তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ে থাকার সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এই অর্থ যেন কোনোভাবেই দেশ থেকে পাচার হয়ে যেতে না পারে বা অন্য কোনো নামে হস্তান্তর করা না যায়, সেই সতর্কতা থেকেই জরুরি ভিত্তিতে হিসাবগুলো অবরুদ্ধ করা প্রয়োজন বলে আদালত মনে করেছেন।

আদালতের নির্দেশনায় অবরুদ্ধ করা হিসাবগুলোর একটি বিশদ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে। তথ্য অনুযায়ী, এই ১০৫টি হিসাবের মধ্যে রয়েছে দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য ব্যাংকে থাকা ৫টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। এর বাইরে রয়েছে অত্যন্ত মূল্যবান ১৩টি ওয়েজ আর্নারস বন্ড। তবে সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের জায়গা হলো স্থায়ী আমানত বা এফডিআরের সংখ্যা। খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নামে মোট ৮৭টি এফডিআর বা ফিক্সড ডিপোজিট রিসিট পাওয়া গেছে, যেখানে জনগণের বিপুল পরিমাণ অর্থ গচ্ছিত রাখা হয়েছিল। একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে কীভাবে এতগুলো এফডিআর এবং বন্ডের মালিক হওয়া সম্ভব, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মহলে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম হয়েছে।

আর্থিক হিসাবগুলো অবরুদ্ধ করার পাশাপাশি দুদকের আরেকটি বড় আইনি বিজয় হলো সাবেক এই মন্ত্রীর আয়কর সংক্রান্ত সমস্ত নথি জব্দের নির্দেশ লাভ করা। আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, খন্দকার মোশাররফ হোসেনের করদাতা হওয়ার শুরু থেকে শুরু করে সর্বশেষ ২০২৪-২৫ করবর্ষ পর্যন্ত যতগুলো আয়কর নথি বা রিটার্ন জমা দেওয়া হয়েছে, তার সবগুলোর মূল কপি ও প্রাসঙ্গিক রেকর্ড জব্দ করতে হবে। আয়কর নথির স্থায়ী এবং বিবিধ উভয় অংশই এই জব্দের আওতায় পড়বে। আইনি বিশ্লেষকদের মতে, আয়কর নথি জব্দের বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত কালো টাকা অনেক সময় চাতুর্যের সাথে আয়কর নথিতে বৈধ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। এখন আয়কর নথির সাথে তার ব্যাংক হিসাবগুলোর লেনদেন মিলিয়ে দেখলেই অবৈধ সম্পদের আসল পাহাড়টি খুব সহজেই আইনি কাঠামোর সামনে উন্মোচিত হবে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রাথমিক অনুসন্ধানে সাবেক এই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে যে পরিসংখ্যানগুলো উঠে এসেছে, তা রীতিমতো শিহরণ জাগানোর মতো। দুদকের জমা দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, খন্দকার মোশাররফ হোসেন ঘুষ, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের মাধ্যমে তার জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে প্রায় ৩৫ কোটি ১৮ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। এটি কেবল তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের একটি খণ্ডিত চিত্র মাত্র। এর চেয়েও ভয়াবহ তথ্য লুকিয়ে আছে তার লেনদেনের রেকর্ডে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তার বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৯৯ কোটি ২১ লাখ টাকার সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক এবং সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। দেশীয় মুদ্রার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রাতেও তার বিপুল লেনদেনের খোঁজ মিলেছে। শুধু তার একটি হিসাবেই ১১ লাখ ৩৩ হাজার ৮১৬ মার্কিন ডলারের সন্দেহজনক লেনদেন হয়েছে, যার কোনো বৈধ উৎস বা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা তিনি বা তার প্রতিনিধিরা দিতে পারেননি।

এই পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগের ভিত্তিতেই দুর্নীতি দমন কমিশন গত ২০২৫ সালের ২ জুন তার বিরুদ্ধে একটি আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করে। মামলাটি দায়ের করার পর থেকেই তদন্ত কর্মকর্তারা অর্থের উৎস এবং গন্তব্য খুঁজতে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন। তদন্তের এক পর্যায়ে যখন দেখা যায় যে অভিযুক্ত ব্যক্তি যেকোনো মুহূর্তে তার এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ সরিয়ে ফেলতে পারেন, তখনই তদন্তের স্বার্থে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ সুরক্ষার লক্ষ্যে দুদক দ্রুত এই হিসাবগুলো অবরুদ্ধ করার আবেদন নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়। আদালতও নথিপত্র এবং প্রমাণাদির গুরুত্ব অনুধাবন করে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত এই অবরুদ্ধের আদেশ জারি করেন।

খন্দকার মোশাররফ হোসেনের এই পতনের গল্পটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বড় শিক্ষণীয় অধ্যায়। একসময় তিনি বাংলাদেশ সরকারের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাজেট-সমৃদ্ধ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথমত তিনি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন, যে খাতের সাথে দেশের রেমিট্যান্স এবং লাখ লাখ প্রবাসীর ভাগ্য জড়িত। পরবর্তীতে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়ের মতো রাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন বাজেট পাওয়া মন্ত্রণালয়ের পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এই মন্ত্রণালয়গুলোর অধীনে দেশব্যাপী হাজার হাজার কোটি টাকার রাস্তাঘাট, সেতু ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ হয়ে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, এসব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় তিনি এবং তার পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সিন্ডিকেট তৈরি করে টেন্ডার বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য এবং মেগা প্রকল্প থেকে বিপুল পরিমাণ কমিশন হাতিয়ে নিয়েছেন।

জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতিতেও খন্দকার মোশাররফ হোসেন একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে তার ইশারা ছাড়া একসময় গাছের পাতাও নড়ত না বলে জনশ্রুতি রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের সাথে তার পারিবারিক আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল, যা তাকে রাজনীতির মাঠে আক্ষরিক অর্থেই ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে গিয়েছিল। এই ক্ষমতার দাপটে ফরিদপুরে তার ভাই খন্দকার মোহতেশাম হোসেন বাবর এবং তাদের ঘনিষ্ঠ দুই সহযোগী সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও ইমতিয়াজ হাসান রুবেল এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। এই বরকত-রুবেল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার অর্থ পাচারের মামলা দেশব্যাপী আলোড়ন তুলেছিল। যদিও মোশাররফ হোসেন নিজে সেই সময় ওই সিন্ডিকেট থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিক মহলে এটা ওপেন সিক্রেট ছিল যে তার সরাসরি প্রশ্রয় ছাড়া ওই মাত্রার দুর্নীতি ও অর্থ পাচার কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।

কালের পরিক্রমায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বিগত সরকারের পতনের পর থেকে খন্দকার মোশাররফ হোসেনের রাজনৈতিক সাম্রাজ্য বালুর প্রাসাদের মতো ধসে পড়তে শুরু করে। ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে তিনি জনসমক্ষ থেকে সম্পূর্ণ অন্তরালে চলে যান। দেশজুড়ে যখন দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্র সোচ্চার হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার মতো প্রভাবশালী মন্ত্রীর অতীত কর্মকাণ্ড তদন্তের আওতায় চলে আসে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ১০৫টি ব্যাংক হিসাব এবং এফডিআর ফ্রিজ করার এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, বর্তমানে দুর্নীতি দমনে রাষ্ট্র কতটা কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ এবং জনগণের ট্যাক্সের টাকা যারা নিজেদের পকেট ভারী করতে ব্যবহার করেছেন, তাদের জন্য এই ঘটনা একটি বড় সতর্কবার্তা। ক্ষমতার চেয়ারে বসে কেউ যখন নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করেন, তখন তারা ভুলে যান যে সময়ের চাকা একসময় ঘুরবেই। খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই ঘটেছে। একসময় যারা তার নির্দেশে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার টেন্ডার পাস করে দিতেন, আজ সেই রাষ্ট্রই তার সমস্ত ব্যাংক হিসাব তালাবদ্ধ করে দিয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের এই পদক্ষেপকে দেশের সাধারণ মানুষ এবং সুশীল সমাজ ব্যাপকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। তবে একই সাথে সবার প্রত্যাশা, এই তদন্ত কেবল হিসাব অবরুদ্ধ করার মাঝেই যেন সীমাবদ্ধ না থাকে। এই অবৈধ অর্থের প্রকৃত উৎস কোথায়, বিদেশে তিনি আরও কোনো অর্থ পাচার করেছেন কি না এবং এই দুর্নীতির সাথে আর কারা কারা জড়িত ছিল, তা অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে খুঁজে বের করা প্রয়োজন। এই ১০৫টি হিসাব হয়তো হিমশৈলের চূড়া মাত্র। সুষ্ঠু আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনা সম্ভব হলেই কেবল সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের প্রকৃত স্বাদ পাবে। পাশাপাশি, ক্ষমতার অপব্যবহার করে এমন পাহাড়সম সম্পদ গড়ার এই প্রবণতা রোধে রাষ্ট্রকে তার প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি এবং জবাবদিহিতার জায়গাগুলো আরও সুদৃঢ় করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো মন্ত্রী বা জনপ্রতিনিধি জনগণের আমানত নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলার দুঃসাহস দেখাতে না পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category