• বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৪ অপরাহ্ন
Headline
লাইসেন্সপ্রাপ্ত মানি চেঞ্জারদের বৈদেশিক মুদ্রা জমায় নতুন সুবিধা রফতানি ও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক ধারা, রিজার্ভ ৩৬.২৫ বিলিয়ন ডলার সিটি গ্রুপকে ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ দিতে আইন শিথিল করল বাংলাদেশ ব্যাংক সিঙ্গাপুরে প্রশিক্ষণে যাচ্ছেন সচিব, অতিরিক্ত সচিবসহ ৩৫ সরকারি কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে চীনা মন্ত্রীর সাক্ষাৎ, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদারের আহ্বান ঋণ সহায়তার বাইরে কোরিয়ার সঙ্গে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব চায় বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর সৌরবিদ্যুৎ পরিকল্পনা ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্পপর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে : মাহদী আমিন আর্টিলারি রেজিমেন্টের অধিনায়ক সম্মেলন ও পুনর্মিলনীতে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা আরও গভীর করতে চীনের অঙ্গীকার: লিউ মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে কাজ করবে সংসদীয় ককাস

ছায়াযুদ্ধে অশান্ত পাবর্ত্য চট্টগ্রাম: পাহাড়ে ৩ গোষ্ঠীর অস্ত্রের শাসন

Reporter Name / ৩ Time View
Update : বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় দীর্ঘকাল ধরে চলা শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির প্রায় তিন দশক অতিক্রান্ত হলেও পাহাড়ি অঞ্চলের মাটি এখনও অস্ত্রের ঝনঝনানি ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রক্তাক্ত হয়ে আছে। সরকারি উদ্যোগ আর নানামুখী প্রচেষ্টার পরেও রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জুড়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বেপরোয়া তৎপরতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরম বিপন্ন করে তুলেছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং পাহাড়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের লড়াই পাহাড়ি জনপদকে প্রতিনিয়ত এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

অনুসন্ধান ও গোয়েন্দা তথ্যে প্রকাশ পেয়েছে যে পাহাড়ে মূলত তিনটি প্রধান সশস্ত্র গোষ্ঠী তাদের অপরাধের জাল বিস্তার করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। জনসংহতি সমিতি বা জেএসএস সন্তু গ্রুপ, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ এবং কেএনএফ বা কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের অস্ত্রের ঝনঝনানিতে পুরো অঞ্চল একপ্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছে। পাহাড়ের অন্তত একচল্লিশটি ভিন্ন খাত থেকে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিয়মিতভাবে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করছে। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, পরিবহন চালক থেকে শুরু করে সাধারণ কলা চাষী কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—কেউই এই নির্মম চাঁদাবাজির হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না।

চাঁদাবাজির এই বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য কেবল স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর পরিধি ছাড়িয়ে গেছে হাজার কোটি টাকার অংক। বিভিন্ন সূত্রের হিসাব অনুযায়ী একা জেএসএস সন্তু গ্রুপ বার্ষিক প্রায় তিন শ কোটি, ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ প্রায় দুই শ আশি কোটি এবং কেএনএফ শতকোটিরও বেশি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে। পাহাড়ের অর্থনীতির টুঁটি চেপে ধরে গড়ে ওঠা এই চাঁদাবাজির মোট পরিমাণ বছরান্তে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এই বিশাল অর্থের একটি বড় অংশ আবার অস্ত্র কেনা এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম টিকিয়ে রাখার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জোরালো অভিযোগ রয়েছে।

সাম্প্রতিক এক বছরের অপরাধ ও সংঘাতের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে পাহাড়ের এই ভয়াবহ চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত বারো মাসের ব্যবধানে পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে অন্তত ছিয়ানব্বইটি বড় ধরনের বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে। এসব রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের বলি হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন বাহান্ন জন মানুষ এবং অপহরণ করা হয়েছে শতাধিক ব্যক্তিকে। এছাড়া বলপ্রয়োগ করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য করা এবং নারী ও শিশুদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটে চলেছে।

পাহাড়ের বর্তমান এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পেছনে ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকারের সঙ্গে জেএসএসের স্বাক্ষরিত ওই চুক্তিতে মোট বাহাত্তরটি ধারা থাকলেও তার মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষ করে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, পাহাড়ি জেলা পরিষদগুলোর পূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর এবং অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া দীর্ঘকাল ধরে ঝুলে রয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের সুদীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরেও এই মৌলিক বিষয়গুলোর সুরাহা না হওয়ায় পাহাড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে।

চুক্তির অন্যতম জটিল দিক হলো ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ভূমি জরিপ কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি। বিগত কয়েক দশক ধরে পাহাড়ে ভূমি জরিপ শুরু করার চেষ্টা করা হলেও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহলের বাধার মুখে তা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। জরিপ কাজ শুরুর চেষ্টা করা হলেই সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অপহরণ করার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এর ফলে প্রকৃত জমির মালিকদের শনাক্ত করা এবং পাহাড়ের দীর্ঘদিনের জমি সংক্রান্ত জটিলতাগুলোর স্থায়ী সমাধান করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে আরও উসকে দিচ্ছে।

ভূমিহীন পাহাড়ি ও ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালি পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং শরণার্থী প্রত্যাবাসনের কাজটিও নানা জটিলতায় থমকে আছে। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন ও গঠিত টাস্কফোর্সের কার্যক্রমে বিভিন্ন মহলের বৈপরীত্যমূলক অবস্থানের কারণে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে না। চাকমা সার্কেল চিফসহ নির্দিষ্ট কিছু নেতার আপত্তির কারণে পাহাড়ি ও ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালিদের সমমর্যাদায় পুনর্বাসন করার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। এই বহুমুখী বিরোধের সুযোগ নিয়ে পাহাড়ে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের প্রভাব আরও বেশি শক্তিশালী করার সুযোগ পাচ্ছে।

কেবল চাঁদাবাজি ও অপহরণ নয়, পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে আন্তঃসীমান্ত চোরাচালানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত ঘেঁষা দুর্গম পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে অস্ত্র, মাদক, বার্মিজ সিগারেট, অবৈধ প্রসাধনী ও অ্যালকোহল চোরাচালান করা হচ্ছে। অপরাধ জগতের এই অবৈধ লেনদেন থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ দিয়ে পাহাড়ি দলগুলো আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করছে। এমনকি ইউপিডিএফ কর্তৃক কেএনএফকে অস্ত্র ক্রয়ের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ সহায়তার তথ্যও গোয়েন্দা নথিতে উঠে এসেছে, যা পাহাড়ের নিরাপত্তাকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্তরায় হিসেবে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী নেতা ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির ভূমিকা নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নানামুখী কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা রয়েছে। শান্তিচুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে পাহাড়ি এলাকায় তাদের ঐতিহ্যগত ক্ষমতা ও প্রভাব কমে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় কিছু স্বার্থান্বেষী মহল কৃত্রিমভাবে জটিলতা জিইয়ে রাখছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া বিদেশি অনুদান ও এনজিওর অর্থে পরিচালিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের আড়ালে পাহাড়ে অস্থিতিশীলতা টিকিয়ে রাখার সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত কাজ করছে বলে অনেকে মনে করেন।

পাহাড়ের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিয়মিতভাবে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে আসছে। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান এবং পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।

স্থানীয় প্রশাসন, সুশীল সমাজ এবং জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে পাহাড়ি অঞ্চলে শান্তি কমিটি গঠন করে আলোচনার মাধ্যমে সকল সংকটের দ্রুত নিরসন করার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

আঞ্চলিক এই অস্থিরতা দূর করতে অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধি এবং যুবসমাজকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য নানামুখী উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

পাহাড়ের এই সার্বিক আইনশৃঙ্খলার অবনতি রোধে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও অপরাধীদের দৌরাত্ম্য পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে সাজেকসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী তৎপরতা দমনে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং চাঁদাবাজি নির্মূল করতে না পারলে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি স্থাপন করা কখনোই সম্ভব হবে না। দলমত নির্বিশেষে সকলের সম্মিলিত সহযোগিতা এবং কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমেই কেবল পাহাড়ি জনপদে আইনের শাসন ও প্রকৃত শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category