• সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৬ অপরাহ্ন

জাতীয় অধ্যাপক নিয়োগে চাই শতভাগ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা

Reporter Name / ২ Time View
Update : সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬

যেকোনো জাতির বৌদ্ধিক বিকাশ ও মননশীলতার চূড়ান্ত পরিচায়ক হলো সেই দেশের শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের প্রতি রাষ্ট্রের মূল্যায়ন। স্বাধীন বাংলাদেশে জ্ঞান-বিজ্ঞান, গবেষণা ও শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৫ সালে ‘জাতীয় অধ্যাপক’ পদের সূচনা হয়েছিল। সে বছর অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন, অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের মতো প্রথিতযশা ব্যক্তিদের এই বিরল সম্মানে ভূষিত করে রাষ্ট্র তার নিজেরই মর্যাদা বৃদ্ধি করেছিল। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো, এমন একটি সর্বোচ্চ সম্মানজনক পদের জন্য দীর্ঘ ৪২ বছর কোনো সুনির্দিষ্ট ও যুগোপযোগী নীতিমালা ছিল না। অবশেষে ১৯৮১ সালের পুরোনো সিদ্ধান্তমালার খোলস ছেড়ে ২০২৩ সালে ‘বাংলাদেশ জাতীয় অধ্যাপক নিয়োগ নীতিমালা-২০২৩’ প্রণয়ন করা হয়েছে। দেরিতে হলেও রাষ্ট্রের এই কাঠামোগত উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই।

নতুন এই নীতিমালার ফলে জাতীয় অধ্যাপক নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অস্পষ্টতা দূর হয়েছে। এখন স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এটি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ অধ্যাপনা বা প্রশাসনিক পদ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের দেওয়া সর্বোচ্চ একাডেমিক মর্যাদা। এই পদের মূল লক্ষ্য হলো—জ্ঞানের সাধনায় জীবন পার করা কোনো গুণী মানুষের অভিজ্ঞতা যেন অবসরের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে না যায়, বরং তিনি যেন স্বাধীনভাবে তার গবেষণা ও জ্ঞানচর্চা চালিয়ে যেতে পারেন। নীতিমালায় সর্বোচ্চ চারজনকে একযোগে এই পদে বহাল রাখার বিধান এবং ৭৫ বছরের বয়সসীমা নির্ধারণের বিষয়টি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে বয়সসীমা শিথিলের যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তার যেন কোনো অপব্যবহার না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

আমরা মনে করি, কেবল একটি চমৎকার নীতিমালা প্রণয়নই শেষ কথা নয়, এর সফল ও নিরপেক্ষ বাস্তবায়নই হলো আসল চ্যালেঞ্জ। অতীতে আমরা দেখেছি, দেশের শিক্ষাঙ্গন ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সময় মেধার চেয়ে দলীয় আনুগত্য ও রাজনৈতিক পরিচয় বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। জাতীয় অধ্যাপক পদের মতো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননার ক্ষেত্রে এমনটি ঘটলে তা হবে জাতির জন্য চরম দুর্ভাগ্যজনক। শিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত চার সদস্যের মনোনয়ন কমিটিকে সব ধরনের রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠভাবে যোগ্য ব্যক্তি বাছাই করতে হবে। এখানে দলমত নির্বিশেষে কেবল প্রকৃত জ্ঞানতাপস ও গবেষকদেরই মূল্যায়ন করতে হবে।

পাশাপাশি, জাতীয় অধ্যাপকদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান যেন কেবল লাইব্রেরির তাকে বা নথিপত্রে বন্দি না থাকে, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও রাষ্ট্রকে নিতে হবে। ইউজিসির মাধ্যমে সচিব মর্যাদার যে আর্থিক সম্মানী তাদের দেওয়া হয়, তা যেন জাতির বৃহত্তর স্বার্থে কাজে লাগে। তাদের মূল্যবান গবেষণার ফলাফলগুলো রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তার একটি সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা থাকা জরুরি।

পরিশেষে, জাতীয় অধ্যাপক পদটি হলো জাতির মেধা ও মননের এক সর্বোচ্চ প্রতীক। একজন মানুষের সারাজীবনের মেধা, প্রজ্ঞা ও গবেষণাকে যখন রাষ্ট্র স্বীকৃতি দেয়, তখন ভবিষ্যৎ প্রজন্মও জ্ঞানচর্চায় অনুপ্রাণিত হয়। তাই এই পবিত্র পদটিকে সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। মেধার প্রকৃত মূল্যায়নের মাধ্যমেই দেশ একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category