চব্বিশের ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। রাজপথের উত্তাল আন্দোলন পরিচালনা করতে গিয়ে সেই সময় গড়ে উঠেছিল এক বিশেষ নেতৃত্বের বলয়, যাদের সাধারণ পরিচয় হয়ে উঠেছিল ‘সমন্বয়ক’ ও ‘সহসমন্বয়ক’। স্বৈরাচারী সরকারের পতন ও সফল আন্দোলন শেষের দুই বছর অতিক্রম করার পর, সেই আন্দোলনের রূপকারদের এক বিশাল অংশ সরাসরি জাতীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এসব সমন্বয়কদের হাত ধরেই জন্ম নিয়েছে নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)। স্বাভাবিকভাবেই জুলাইয়ের মূল নেতৃত্বের বড় একটি অংশ এখন এই এনসিপিতে নিজেদের অবস্থান সুসংগঠিত করেছেন। তবে এর বাইরেও কয়েকজন ভিন্ন দল বা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যোগ দিয়েছেন, আর একটি বড় অংশ আপাতত দলীয় ও আনুষ্ঠানিক রাজনীতি থেকে দূরে অবস্থান করছেন।
আন্দোলনের সময়কালে ঘোষিত মূল তালিকার ৫০ জন কেন্দ্রীয় সমন্বয়কের বর্তমান রাজনৈতিক পরিচয় ও অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁদের ৫২ শতাংশ বা ২৬ জন সদস্য এখন এনসিপি এবং এর বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনে সক্রিয় দায়িত্ব পালন করছেন। উল্টোদিকে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন মাত্র ১ জন, যা মোট সংখ্যার ২ শতাংশ। অন্যান্য নানা রাজনৈতিক দল, বিকল্প প্ল্যাটফর্ম বা ছাত্রসংগঠনে যুক্ত আছেন ১০ জন বা ২০ শতাংশ সমন্বয়ক। অন্যদিকে কোনো রাজনৈতিক দলে না গিয়ে বা আপাতত দলীয় চর্চা থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাজনীতির বাইরে রয়েছেন ১৩ জন সমন্বয়ক, যা মোট হিসাবের প্রায় ২৬ শতাংশ। মূল আন্দোলনের রাজনৈতিক সুবিধা ও উত্তরাধিকার যে মূলত এনসিপির চারপাশেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে, এই হিসাব থেকেই তা পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
জুলাই অভ্যুত্থানের প্রধানতম মুখ নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, মাহিন সরকার, আব্দুল হান্নান মাসউদ, নুসরাত তাবাসসুমসহ শীর্ষ তরুণ নেতারা এনসিপির মূল রাজনীতিতে মূলধারার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একই সাথে এনসিপির ছাত্রসংগঠন ‘জাতীয় ছাত্রশক্তি’র হাল ধরেছেন আবু বাকের মজুমদার ও রাফিয়া রেহনুমা হৃদির মতো পরিচিত মুখগুলো। পাশাপাশি যুব সংগঠন ‘জাতীয় যুবশক্তি’র মাধ্যমে মাঠে আছেন রিফাত রশিদ ও তরিকুল ইসলাম। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও বর্তমানে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব মাহিন সরকার বিষয়টিকে অত্যন্ত স্বাভাবিক দাবি করে জানান যে গণ-আন্দোলনে নানা মত ও পথ থেকে মানুষ যুক্ত হয়েছিল, ফলে সফলতার পর যে যার চিন্তাধারা অনুযায়ী কেউ রাজনীতি করবে আর কেউ করবে না—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক সৌন্দর্য।
তবে এনসিপির বিশাল বলয়ের বাইরেও অন্য দলগুলোতে কিছু সমন্বয়ক নিজেদের রাজনৈতিক পথ খুঁজে নিয়েছেন। ৫০ সমন্বয়কের মধ্যে একমাত্র জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) ভিপি আবদুর রশিদ জিতু আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এছাড়া ‘গণবিপ্লবী উদ্যোগ’ নামের প্ল্যাটফর্মে আরিফ সোহেল ও আবদুল্লাহ সালেহীন অয়ন, মাহফুজ আলমের ‘অলটারনেটিভস’ ও ‘জাতীয় ছাত্রসভা’র ধারায় আনিকা তাহসিনা ও রেজোয়ান রিফাত এবং ‘ছাত্র অধিকার পরিষদ’, ‘সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট’ ও ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন’-এর মতো নানা ভিন্ন ধারার রাজনৈতিক মঞ্চে ১০ জন সমন্বয়ক নতুন যাত্রা শুরু করেছেন। এই বৈচিত্র্য প্রমাণ করে যে জুলাই আন্দোলনে নীতিগত চিন্তার ভিন্নতা শুরু থেকেই বিদ্যমান ছিল।
সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, আন্দোলনের সুপরিচিত কিছু মুখ এই মুহূর্তে পুরোপুরি আনুষ্ঠানিক রাজনীতির বাইরে অলস বা অপেক্ষমাণ সময় কাটাচ্ছেন। আন্দোলনের ৯ দফার ঐতিহাসিক ঘোষক আব্দুল কাদের এবং অন্যতম মূল সমন্বয়ক উমামা ফাতেমার মতো আলোচিত ব্যক্তিবর্গ বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত নন। উমামা ফাতেমা জানান, আন্দোলনের পরপরই তাড়াহুড়ো করে রাজনীতিকে জীবিকা বা ক্যারিয়ার বানানোর ইচ্ছা তাঁর ছিল না, বরং পড়াশোনা ও চিন্তাভাবনাকে গুছিয়ে নিয়ে তিনি ভবিষ্যতের পথ ঠিক করবেন। অন্যদিকে আব্দুল কাদের প্রকাশ করেন যে বিদ্যমান প্রথাগত রাজনৈতিক সংস্কৃতির সাথে তিনি নিজেকে কোনোভাবেই মানিয়ে নিতে পারছেন না, তাই আপাতত ক্যারিয়ার ও পরিবারকে প্রাধান্য দিয়ে রাজনীতির চর্চা থেকে স্বেচ্ছায় বিরতি নিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদদের মতে, একটি রাজপথের গণ-অভ্যুত্থান থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার এই যাত্রাটি মোটেই সহজ নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ উল্লেখ করেন যে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সবাই কেবল দল গঠন বা ক্ষমতার রাজনীতিতে আসার লক্ষ্য নিয়ে রাজপথে নামেননি। অনেকের লক্ষ্য ছিল স্রেফ একনায়কত্ব উৎখাত করে একটি নতুন ব্যবস্থার সূচনা করা। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, রাষ্ট্রকাজে পরিবর্তন আনার প্রধান মাধ্যমই যেহেতু রাজনীতি, তাই আন্দোলনের পর তাদের রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিক। যে ১৩ জন সমন্বয়ক এখন অপেক্ষার পথ বেছে নিয়েছেন, তারা নতুন কোনো রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করবেন নাকি বিদ্যমান ব্যবস্থায় যুক্ত হবেন—সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা