• সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৪৩ অপরাহ্ন
Headline
প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানেই উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই জীবিকা: প্রতিমন্ত্রী জুলাইয়ে রেকর্ড বৃষ্টির পর আগস্টে তাপপ্রবাহ ও বন্যার ঝুঁকি খেলাধুলার মাধ্যমে মাদক-অপরাধ থেকে দূরে থাকবে তরুণরা: ত্রাণমন্ত্রী ওজন কমাতে কোন ব্যায়ামে মিলবে বেশি উপকার রোহিঙ্গাদের জন্য আরও ২৫.২৫ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশকে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেলারে নজর কাড়লেন ‘বিপ্লবী‘ জিৎ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইনস্টিটিউটের উদ্বোধন করলেন সেনাপ্রধান ইসরায়েলকে নাৎসিদের সঙ্গে তুলনা করা অপরাধ নয়: জার্মান আদালত তিস্তা ও অর্থনৈতিক করিডর উদ্যোগ বাস্তবায়নে আশাবাদী চীন

প্রযুক্তির মোড়কে আধুনিক টোল কাউন্টার: কার স্বার্থে জিম্মি সাধারণ মানুষ?

Reporter Name / ১ Time View
Update : সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬

হাজার টাকায় ১৮ টাকা ৫০ পয়সার হিসাবটা খালি চোখে অত্যন্ত সামান্য বা অনুল্লেখযোগ্য মনে হতে পারে। তবে এই খুচরো সার্ভিস চার্জের ওপর ভর করেই বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের প্রায় ২০০ কোটি (২ বিলিয়ন) ডলার মূল্যের সুবিশাল এমএফএস প্রতিষ্ঠান বিকাশ। একজন প্রবাসী কর্মী যখন হাড়ভাঙা খাটুনি করে দেশে তাঁর স্বজনদের জন্য এক লাখ টাকা পাঠান, তখন কেবল ক্যাশ আউট ফি হিসেবেই তাঁদের পকেট থেকে খসে যায় প্রায় ১ হাজার ৮৫০ টাকা। যেখানে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে একই ধরনের ডিজিটাল পেমেন্ট ও লেনদেনের সেবামূল্য শূন্যের কোঠায়, সেখানে প্রশ্ন ওঠে—আমাদের দেশে প্রযুক্তির ছোঁয়া কি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচ কমাল, নাকি কোনো নির্দিষ্ট কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য একচেটিয়া উপার্জনের টোল প্লাজা তৈরি করল?

বিষয়টি গভীরভাবে বুঝতে হলে শুরুতেই একটি সাধারণ ভুল ধারণা দূর করা প্রয়োজন; কারণ বিকাশ কোনো পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক নয়। বিষয়টিকে উদাহরণ দিয়ে বোঝা যায়—আপনি কোনো দোকানে অর্থ জমা রাখলেন আর তার বিনিময়ে আপনার কার্ড বা ফোনে একটি সংখ্যা লিখে দেওয়া হলো। আপনার সেই মূল টাকাটি জমা থাকল দোকানদারের সিন্দুক বা ভল্টে, আর আপনার কাছে রইল কেবল একটি ডিজিটাইজড হিসাবের নিশ্চয়তা। আইনি পরিভাষায় এমএফএস গ্রাহকের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক ঠিক এমনটাই। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক নীতিমালায় এটি মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএস নামে নিবন্ধিত। এই ব্যবস্থা পরিচালনার একটি প্রধান আইনি শর্ত হলো—সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম ৫১ শতাংশ মালিকানা থাকতে হবে দেশের স্বীকৃত কোনো ব্যাংকের হাতে। বিকাশের ক্ষেত্রে সেই অভিভাবক ব্যাংক হিসেবে কাজ করছে ব্র্যাক ব্যাংক।

সাধারণ চোখে ব্যাংকের সম্পৃক্ততা দেখে অর্থ নিরাপদ মনে হতে পারে, কিন্তু আইনের সূক্ষ্ম প্রয়োগে এখানে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে রাখা সাধারণ গ্রাহকের টাকা আইনের পরিভাষায় ‘আমানত’ হিসেবে গণ্য হয়, যার ওপর বাৎসরিক সুদ বা মুনাফা পাওয়াটা আমানতকারীর আইনি অধিকার। কিন্তু বিকাশ বা এমএফএস ওয়ালেটে রাখা অর্থকে বলা হয় ‘ই-মানি’ (e-money), যা প্রযুক্তিগতভাবে কোনো আমানত নয়; বরং কোম্পানির খাতায় লেখা একটি ডিজিটাল দেনামাত্র। এই আইনি পার্থক্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মূল অর্থনৈতিক মুনাফার কৌশল। প্রায় সাড়ে আট কোটি গ্রাহকের ছোট ছোট ডিজিটাল ব্যালেন্স একত্র হয়ে যে কোটি কোটি টাকার বিশাল তহবিল গঠন করে, তা বাণিজ্যিক ব্যাংকেই রাখা হয়। তবে সেই পুঞ্জীভূত অর্থের ওপর অর্জিত সমুদয় সুদ বা মুনাফা জমা হয় কোম্পানির অ্যাকাউন্টে, সেবাভোগী সাধারণ গ্রাহক তার কোনো অংশ পান না।

অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ক্যাশ আউটের ব্যয়ভারের দিকে তাকালে বৈষম্যের চিত্রটি স্পষ্ট ফুটে ওঠে। আন্তর্জাতিক স্বচ্ছতা বিষয়ক সংস্থা ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল’-এর তথ্য ইঙ্গিত করে যে ২৫ হাজার টাকা ক্যাশ আউট করতে গিয়ে বাংলাদেশে যে পরিমাণ মাশুল গুনতে হয়, তা পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশি এবং মিয়ানমারের তুলনায় দ্বিগুণ। অন্যদিকে ভারতে সরকারি নীতির কারণে এই সেবামূল্য পুরোপুরি বিনামূল্যে নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশে নগদভিত্তিক লেনদেনের সংস্কৃতি আজও প্রবল থাকায় অনলাইন শপিং থেকে শুরু করে মুদি দোকান—সর্বত্রই ক্যাশ অন ডেলিভারি প্রাধান্য পায়। ফলে ডিজিটাল ওয়ালেটে টাকা ঢোকার পর তা তুলে নেওয়া ছাড়া গ্রাহকের সামনে আর কোনো বিকল্প পথ থাকে না। আর টাকা তুলতে গেলেই মাশুল কাটার এই চক্রে আটকে পড়তে হয় দেশের কোটি কোটি নাগরিককে।

এমএফএস খাতে আন্তঃলেনদেন বা একটি ওয়ালেট থেকে অন্য ওয়ালেটে সরাসরি টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রেও বছরের পর বছর কৃত্রিম দেয়াল তুলে রাখা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জাতীয় পেমেন্ট সুইচের মাধ্যমে ব্যাংক ও ওয়ালেটগুলোর মধ্যে সমন্বিত নেটওয়ার্ক চালুর চেষ্টা করলেও শেষ মুহূর্তে বাজার ব্যবস্থার শীর্ষ দুই প্রতিষ্ঠান বিকাশ ও নগদকে মঞ্চ থেকে পিছিয়ে যেতে দেখা গেছে। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। বর্তমানে সব ব্যাংক ও এমএফএস সেবাগুলোকে একক চ্যানেলে নিয়ে আসার জন্য ২০২৭ সালের জুলাই মাসকে নতুন লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে তত দিন পর্যন্ত এই সেবামূল্যের টোল প্লাজাটি একপ্রকার একচেটিয়াভাবেই চালু থাকছে।

প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক খতিয়ান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালে বিকাশের বাৎসরিক আয় প্রথমবারের মতো ৫ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করে এবং নিট মুনাফা দাঁড়ায় ৩১৫ কোটি টাকায়। তবে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি দেখা যায় ২০২৫ সালে, যখন প্রথম নয় মাসেই প্রতিষ্ঠানের মুনাফা দাঁড়ায় ৫০৫ কোটি টাকা, যা আগের পুরো বছরের চেয়েও ১৩১ শতাংশ বেশি। প্রশ্ন ওঠে, গ্রাহকের পকেট কেটে আসা এই বিপুল লভ্যাংশ শেষ পর্যন্ত কার পকেটে জমা হয়? ব্র্যাক ব্যাংকের ৫১ শতাংশ শেয়ারের বাইরে অবশিষ্ট মালিকানার বড় অংশজুড়ে রয়েছে বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ—যুক্তরাষ্ট্রের মানি ইন মোশন (১৭.৫%), আলিবাবার সহযোগী আলিপে সিঙ্গাপুর (১৫%), বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আইএফসি (১০%+) এবং জাপানের সফটব্যাংক (১২.৫%)।

ভাড়ার এই ফাঁদ এড়াতে ভারত মূলত একটি ত্রি-স্তরীয় বিপ্লব ঘটিয়েছিল। প্রথমত, ‘জনধন’ যোজনার মাধ্যমে ৫৩ কোটি মানুষকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মূলধারার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের আওতায় আনা হয়। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকগুলোর নিজস্ব অলাভজনক সংস্থা ‘এনপিসিআই’-এর মাধ্যমে ইউপায় (UPI) নামক এক উন্মুক্ত পেমেন্ট অবকাঠামো তৈরি করা হয়, যেখানে গুগল পে বা ফোনপে-এর মতো বেসরকারি অ্যাপগুলো কেবল মাধ্যম হিসেবে কাজ করে; কোনো গ্রাহকের অর্থ তাদের কাছে আটকে থাকে না। তৃতীয়ত, সরকার আইনি নির্দেশের মাধ্যমে এই প্ল্যাটফর্মে যেকোনো ধরণের লেনদেন সম্পূর্ণ ফি-মুক্ত ঘোষণা করে। যার সরাসরি ফলস্বরূপ ২০২৪ সালে ইউপিআই-এর মাধ্যমে প্রায় ১৭২ বিলিয়ন লেনদেন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।

প্রযুক্তি ও দ্রুততার বিচারে বাংলাদেশে বিকাশ নিঃসন্দেহে এক বিপ্লব ঘটিয়েছে। একসময় যে টাকা পৌঁছাতে মানি অর্ডারের পেছনে দিন পেরিয়ে যেত কিংবা হুন্ডির মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথ ধরতে হতো, তা এখন এক মিনিটে সম্ভব হচ্ছে। দেশের সাড়ে আট কোটি গ্রাহকের এক বিশাল অংশ এমন সাধারণ মানুষ, যাদের কখনো ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ হয়নি। সমস্যাটা বিকাশের উপস্থিতি নিয়ে নয়, সমস্যা হলো বাজারে কোনো শক্তিশালী বিনামূল্যের সরকারি বিকল্প বা সুস্থ প্রতিযোগিতা না থাকা। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় সাধারণ মানুষকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাড়তি চার্জ মেনে নিতে হচ্ছে।

সম্প্রতি হাইকোর্ট এই বিষয়ের ওপর একটি রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন—বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো এমএফএস সেবাদাতাদের অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ কেন বেআইনি ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না এবং একটি পৃথক মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস আইন প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হবে না কেন? হাইকোর্ট থেকে অর্থ সচিব ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চার সপ্তাহের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে এক প্রবাসী শ্রমিকের রক্ত পানি করা আয় থেকে কেটে নেওয়া অতিরিক্ত সেবামূল্যের বিষয়টি এখন উচ্চ আদালতের বিচারাধীন। প্রযুক্তি বদলেছে, অ্যাপ এসেছে, শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের উপার্জিত অর্থ হাতবদল হওয়ার সাথে সাথে মাশুল কাটার এই পুরোনো রীতি এখনো অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category