• সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২১ অপরাহ্ন

ট্রাইব্যুনালের দুই বছর: কাগজে-কলমেই আটকে ২৩ জনের ফাঁসি

Reporter Name / ২ Time View
Update : সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম। ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাত ধরে এই ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠিত হওয়ার পর দেখতে দেখতে প্রায় দুই বছর অতিবাহিত হয়ে গেছে। এই দীর্ঘ চব্বিশ মাসের বিচারিক প্রক্রিয়ায় ট্রাইব্যুনাল থেকে এখন পর্যন্ত মোট সাতটি চাঞ্চল্যকর মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়ার চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী আসামিদের ভাগ্যে জুটেছে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কিংবা বিভিন্ন মেয়াদের সশ্রম কারাদণ্ড। তবে এতগুলো রায়ের পরও একটি চরম হতাশার জায়গা তৈরি হয়েছে জনমনে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত বর্বরোচিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোতে যাদের সর্বোচ্চ সাজা হয়েছে, তাদের কারোরই মৃত্যুদণ্ড এখন পর্যন্ত কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতায় কোনো কোনো রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করা হয়েছে। আবার কিছু মামলা সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ঝুলে রয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের খাতাটি সাজার পরিসংখ্যানে বেশ ভারী হলেও, চূড়ান্তভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘরটি এখনও সম্পূর্ণ শূন্য রয়ে গেছে। ফাঁসির রায় কার্যকর না হওয়ার এই বিষয়টি নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে, সুশীল সমাজে এবং বিশেষ করে শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, বিচারিক রায় কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে তা ভুক্তভোগীদের মনে প্রকৃত শান্তির পরশ এনে দিতে পারে না।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ট্রাইব্যুনাল-১ এবং ট্রাইব্যুনাল-২-এ জুলাই-আগস্টের মানবতাবিরোধী অপরাধসহ নানা জঘন্য অপরাধের বিচারকাজ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে শুরু হয়েছিল। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনাল থেকে এখন পর্যন্ত যে সাতটি রায় ঘোষিত হয়েছে, তাতে সর্বমোট ৬৮ জন অপরাধীকে আইন অনুযায়ী দণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এই দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে জঘন্যতম অপরাধের দায়ে ফাঁসির রশিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেওয়া হয়েছে ২৩ জনকে। অপরাধের মাত্রা কিছুটা কম হওয়ায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন ১১ জন। এছাড়া আরও ৩৩ জন আসামিকে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড। বিচারিক নজির হিসেবে একজনের হাজতবাসের সময়কালকেই তার মূল সাজার মেয়াদ হিসেবে গণ্য করে ট্রাইব্যুনাল তাকে মুক্তি দিয়েছেন। পাশাপাশি, একজন আসামি রাষ্ট্রপক্ষের রাজসাক্ষী হতে রাজি হওয়ায় আদালতের বিশেষ ক্ষমতাবলে তাকে ক্ষমা প্রদর্শন করা হয়েছে।

এই পরিসংখ্যান আপাতদৃষ্টিতে বিচারিক সফলতার একটি চিত্র তুলে ধরলেও, এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিশাল ব্যর্থতা। দণ্ডপ্রাপ্ত এই ৬৮ জন আসামির মধ্যে ৪৭ জনই বর্তমানে আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পলাতক রয়েছেন। সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হলো, যে ২৩ জন মানবতাবিরোধী অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা পুলিশ এখন পর্যন্ত মাত্র চারজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। বাকি ১৯ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিই দেশ বা দেশের বাইরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আসামিদের এই পলাতক থাকাটাই রায় কার্যকর করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আইনি ও বাস্তব বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের রায় কেন কার্যকর হচ্ছে না, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রসিকিউশন বা রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আইনি সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো জটিল মামলাগুলোর বিচারপ্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে শেষ করে রায় ঘোষণা করা পর্যন্তই কেবল ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব। বিচারিক আদালতের গণ্ডি পেরিয়ে দণ্ড কার্যকর করার মূল বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ বা সরকারের সদিচ্ছা ও এখতিয়ারের ওপর। তাছাড়া, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের কোনো রায়ের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ পক্ষ আপিল করলে, তা চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করার দায়িত্ব দেশের সর্বোচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, আপিল দায়ের করার পর তা মাত্র ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালতে অন্যান্য মামলার বিশাল জট ও অস্বাভাবিক চাপের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই এই আইনি সময়সীমার মধ্যে আপিল নিষ্পত্তি করা বাস্তবসম্মতভাবে সম্ভব হয়ে উঠছে না।

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করলে দেখা যায়, ওই সময়ের প্রবল জনরোষের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার সরকারের একাধিক প্রভাবশালী মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বা অন্যান্য স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করেন। চব্বিশের সেই গণঅভ্যুত্থানে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত এবং পুলিশের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় ও ঊর্ধ্বতন সাবেক কর্মকর্তা। সর্বশেষ গত ১৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনাল-২ এক ঐতিহাসিক রায়ে ওবায়দুল কাদেরসহ মোট সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। এই রায়ের মাধ্যমেই পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাতটি রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মোট আসামির সংখ্যা ২৩ জনে উন্নীত হয়।

প্রসিকিউশন বা রাষ্ট্রপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুনর্গঠিত এই ট্রাইব্যুনালে প্রতিদিন বিচারের আশায় অভিযোগের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে। শুধু জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানই নয়, বরং ২০০৯ সাল থেকে বিগত দেড় দশকে সংঘটিত অসংখ্য গুম, খুন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোকেও এখন এই ট্রাইব্যুনালের বিচারের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রসিকিউশন সেলে এমন প্রায় ৬০০টির মতো ভয়াবহ অভিযোগ জমা পড়ে আছে, যার তদন্ত চলছে। ইতিমধ্যে সাতটি মামলার রায় ঘোষণা করা হলেও, আরও ৭০টিরও বেশি চাঞ্চল্যকর মামলা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে অনেকগুলো মামলাই এখন সাক্ষ্যগ্রহণের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যা শিগগিরই রায়ের মুখ দেখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে অতীতের তুলনা করতে গেলে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য গঠিত প্রথম ট্রাইব্যুনালের কথা প্রাসঙ্গিকভাবেই চলে আসে। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ গঠিত সেই ঐতিহাসিক ট্রাইব্যুনালে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় মোট ৫৬টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছিল। ওই মামলাগুলোতে সর্বমোট ১৯৫ জন অপরাধীকে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা প্রদান করা হয় এবং অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস পেয়েছিলেন মাত্র দুজন। প্রথম ট্রাইব্যুনালের ঘোষিত রায়ের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ আইনি প্রক্রিয়া শেষে মোট ছয়জন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়েছিল। অন্যদিকে, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৭৫ জন আসামি বার্ধক্য বা অসুস্থতাজনিত কারণে কারাগারে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন। আর বাকি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাজা কার্যকরের আইনি প্রক্রিয়া এখনও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ঝুলে রয়েছে।

২০১০ সালে গঠিত সেই ট্রাইব্যুনালে প্রথম রায় এসেছিল ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি। ওই রায়ে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন রোকন আবুল কালাম আযাদকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি দেশ থেকে পলাতক থাকায় সেই রায় কখনোই কার্যকর করা যায়নি। তবে একই বছরের ১২ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কার্যকর করার মাধ্যমে প্রথম কোনো যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর হয়। এরপর ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল আরেক শীর্ষ নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে ধাপে ধাপে ফাঁসি কার্যকর হয় জামায়াতের শীর্ষ নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামী, মীর কাশেম আলী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর। ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মীর কাশেম আলীর ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়েই সেই দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়ার কার্যত সমাপ্তি ঘটেছিল। আগের ট্রাইব্যুনালের ক্ষেত্রে প্রথম রায় ঘোষণার পর ছয় বছরের মাথায় ছয়জনের ফাঁসি কার্যকর করা সম্ভব হয়েছিল, যা বর্তমান ট্রাইব্যুনালের প্রেক্ষাপটে একটি বড় উদাহরণ।

ট্রাইব্যুনালের রায়ের ধরন ও সাজার পরিসংখ্যান নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, আগের ট্রাইব্যুনালে মোট ১৯৭ জনের বিচার হলেও আইনি জটিলতার কারণে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে মাত্র ছয়জনের। অথচ সেই সময়ে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের একটি বিশাল অংশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারেই বন্দি ছিলেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থায় প্রতিনিয়ত অসংখ্য মামলার বিচার হয়, তবে যেকোনো বিচারিক আদালতের ওপরে একটি আপিল আদালত থাকে। আপিল বিভাগে মামলার বিশাল জটের কারণে দীর্ঘ সময় ফাইলগুলো ঝুলে থাকে, যার কারণেই মূলত দণ্ড কার্যকরে এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব ঘটে। প্রসিকিউশন হিসেবে তাদের মূল দায়িত্ব হলো আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আসামিদের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা। বিচারকের রায় ঘোষণার পর তা আপিল বিভাগে নিষ্পত্তি করার দায়িত্ব উচ্চ আদালতের এবং চূড়ান্তভাবে রায় কার্যকর করার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে সরকারের নির্বাহী বিভাগের কাঁধে বর্তায়।

আগের ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার প্রবণতা সম্পর্কে এই প্রসিকিউটর আরও জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে গঠিত প্রথম ট্রাইব্যুনালে দু-একটি ব্যতিক্রম ঘটনা ছাড়া প্রায় ৯৫ শতাংশ আসামিকেই সরাসরি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো। সেই সময়ে আসামিদের দণ্ডিত হওয়ার হার ছিল ৯৯ শতাংশেরও বেশি। একপর্যায়ে জনমনে এমন একটি বদ্ধমূল ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কারও নামে মামলা হওয়া মানেই তার অবধারিত মৃত্যুদণ্ড। তবে পুনর্গঠিত বর্তমান ট্রাইব্যুনাল সেই একপেশে সংস্কৃতি ও গতানুগতিক ধারণা থেকে অনেকটাই বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। এখন শুধুমাত্র আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়, বরং প্রতিটি আসামির অপরাধের ধরন, হত্যাকাণ্ডে তার ব্যক্তিগত ভূমিকা এবং বাস্তব সম্পৃক্ততা গভীরভাবে বিবেচনা করে ৭ বছর, ১০ বছর, যাবজ্জীবন কিংবা সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হচ্ছে।

এই প্রসিকিউটর একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ দিয়ে বলেন, রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় কনস্টেবল সুজন হোসেন সরাসরি নিজের অস্ত্র থেকে গুলি চালালেও, ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে তুলনামূলক কম সাজা প্রদান করেছেন। কারণ আদালত তার পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তিনি কেবল একজন সাধারণ কনস্টেবল হিসেবে তার ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সরাসরি নির্দেশ মানতে আইনত বাধ্য ছিলেন। প্রসিকিউশন আদালতের এই বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণকে দেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে। অবশ্য, আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কনস্টেবল সুজনের সাজা আরও কিছুটা বাড়ানোর জন্য প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে আপিল দায়ের করা হয়েছে। ঠিক একইভাবে, কুষ্টিয়ায় সংঘটিত ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সাজা বৃদ্ধি করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার জন্যও রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আপিল করার জোরালো প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বর্তমান বিচারকাজের ধীরগতি নিয়ে চরম অসন্তোষ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দেশের সাধারণ জনগণের যে বিপুল প্রত্যাশা ছিল, সেই অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজ মোটেও এগোয়নি। এর মূল কারণ হিসেবে তিনি শুরুতেই ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনে হওয়া বিলম্বকে দায়ী করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম দিকে চরম জনবল সংকট থাকা সত্ত্বেও বিচারকাজে কিছুটা দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পুরো বিচার প্রক্রিয়াই রহস্যজনকভাবে ধীরগতির হয়ে পড়েছে। বিচারকাজ দ্রুত শেষ করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিতে তাদের দলের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে স্মারকলিপিও প্রদান করা হয়েছে।

এই জামায়াত নেতা আরও বলেন, যেসব মামলার রায় ইতিমধ্যে ট্রাইব্যুনাল থেকে ঘোষিত হয়েছে, সেগুলো যদি কালক্ষেপণ না করে দ্রুত কার্যকর করা যেত, তবে সন্তান হারানো শহীদ পরিবারগুলো অন্তত ন্যায়বিচারের কিছুটা স্বাদ পেত। রায় ঘোষণা হওয়ার পরও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় সমাজে ‘জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড’ বা ‘বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে বিচার অস্বীকার করা’-এর মতো একটি চরম নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এমন অবস্থা চলতে থাকলে দেশের স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং বর্তমান সরকারের সদিচ্ছার প্রতি দেশের সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে কমে যাবে। পলাতক আসামিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে তাদের উপযুক্ত সাজা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সরাসরি সহায়তা নিয়ে হলেও বিদেশে পালিয়ে থাকা খুনিদের দ্রুত দেশের মাটিতে ফিরিয়ে আনা উচিত। একই সঙ্গে যে রায়গুলো ইতিমধ্যে ঘোষিত হয়েছে তা দ্রুত কার্যকর করে এবং বিচারাধীন বাকি মামলাগুলোর বিচারকাজ দ্রুত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি ঘটিয়ে দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। তার মতে, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে এ দেশে আর কখনোই ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে না, এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না।

পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে যাদের নামে সুনির্দিষ্ট গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরে থাকা এমন অনেক আসামিকে পুলিশ ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করেছে। তবে যেসব প্রভাবশালী আসামি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বিদেশে পালিয়ে গেছেন, তাদের ভিনদেশের মাটিতে সরাসরি গিয়ে গ্রেপ্তার করার কোনো আইনি এখতিয়ার বাংলাদেশ পুলিশের নেই। তবে পুলিশ বসে নেই, পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারিসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে থাকা বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় সর্বাত্মক আইনি ও কূটনৈতিক চেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে।

বর্তমান ট্রাইব্যুনাল থেকে ঘোষিত সাতটি চাঞ্চল্যকর রায়ের দিকে নজর দিলে এর ব্যাপকতা অনুধাবন করা যায়। প্রথমত, শেখ হাসিনার মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। একই মামলায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে প্রধান দুই আসামি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল বর্তমানে দেশ থেকে পলাতক রয়েছেন। দ্বিতীয়ত, চানখাঁরপুলের হত্যাযজ্ঞের মামলায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ মোট তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য পাঁচ পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই আটজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মধ্যে মাত্র চারজন বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।

তৃতীয়ত, আশুলিয়ায় ভ্যানে করে নির্মমভাবে লাশ পোড়ানোর চাঞ্চল্যকর মামলায় ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ ছয়জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যান্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে এই মামলার ১৬ জন আসামির মধ্যে আটজনই এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। চতুর্থত, রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় তৎকালীন এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড এবং বাকি আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এই মামলার মোট ৩০ জন আসামির মধ্যে পুলিশ মাত্র সাতজনকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছে। পঞ্চমত, রামপুরার হত্যা মামলায় তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং দুজনের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই মামলায় ২০ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত চঞ্চল চন্দ্র সরকার বর্তমানে কারাগারে বন্দি রয়েছেন। ষষ্ঠত, কুষ্টিয়ার নির্মম হত্যাযজ্ঞের মামলায় সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে কারাবন্দি অবস্থায় দিন পার করছেন। সবশেষে, জুলাই হত্যাকাণ্ডের আরেকটি মেগা মামলায় সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ মোট সাতজন হাইপ্রোফাইল নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সব আসামিই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে এই রায়গুলো দ্রুত কার্যকর করার মাধ্যমেই কেবল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বলে মনে করছেন দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ।

তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category