দেশের বিচারব্যবস্থায় অপরাধের গুরুত্ব ও সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হলেও, সেই বিচার চূড়ান্ত হওয়ার মধ্যবর্তী দীর্ঘ সময়টিতে আসামিদের আইনি সুরক্ষার চিত্রটি অত্যন্ত জটিল ও করুণ। ফৌজদারি বিচার কাঠামোর নিম্ন আদালতে কারও বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় ঘোষণা হওয়ামাত্রই তাকে স্থানান্তর করা হয় ‘কারাগারের ভেতর কারাগার’ হিসেবে পরিচিত নির্জন কনডেমড সেলে। এরপর উচ্চ আদালতে সেই দণ্ড অনুমোদনের জন্য অপেক্ষার পালা শুরু হয়, যা কখনো কখনো দশকের পর দশক পেরিয়ে যায়। অথচ সাংবিধানিক অধিকার ও প্রচলিত আইনের নানা ফাঁকফোকর থাকা সত্ত্বেও বিচারিক প্রক্রিয়ার এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের পক্ষে জামিনের কোনো আবেদনই কার্যত করা হয় না। দেশের উচ্চ আদালতগুলোতে এটি বহু বছর ধরে এক ধরনের অনমনীয় ও অলিখিত প্রথা হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। আইনজীবী এবং বিচারপ্রার্থী উভয়ের মনেই এই বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ফাঁসির আসামির জামিন আবেদন আদালত শুনতেই চাইবেন না কিংবা তাৎক্ষণিকভাবে তা খারিজ করে দেবেন। এই ধারণার ফাঁদে বন্দি হয়ে হাজারো মানুষের জীবন নিঃশব্দে ফুরিয়ে যাচ্ছে চার দেয়ালের আবদ্ধ প্রকোষ্ঠে।
এই অলিখিত ব্যবস্থার সবচেয়ে নির্মম দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শরীফা বেগম। রাজধানীর শান্তিনগরে ১৯৯৮ সালের মে মাসে সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ২০০০ সালের ৩১ অক্টোবর বিচারিক আদালত তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়। পরবর্তীতে ২০০৩ সালের জুলাইয়ে হাইকোর্ট বিভাগেও শরীফার সেই মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। নিম্ন আদালতের রায়ের পর থেকেই তাকে ঠাঁই নিতে হয় কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারের কনডেমড সেলে। সুদীর্ঘ চব্বিশ বছর একাকী মৃত্যুর প্রহর গোনার পর অবশেষে ২০২৪ সালের ১ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তার ফাঁসির দণ্ড সংশোধন করে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করে। পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশিত হওয়ার পর প্রায় এক বছর আগে তাকে সাধারণ সেলে স্থানান্তর করা হয়। জীবনের আটাশটি বছর কারাভ্যন্তরে এবং চব্বিশটি বছর ফাঁসির প্রকোষ্ঠে কাটিয়ে দেওয়া এই নারী তার সুদীর্ঘ বন্দিজীবনে একবারের জন্যও উচ্চ আদালতে জামিনের প্রার্থনা নিয়ে যাননি। শরীফার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, বরং দেশের বিচারিক ইতিহাসে এটি এক সাধারণ এবং নীরব নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের সর্বশেষ সংগৃহীত তথ্যে এই সংকটজনক পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশের কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারগুলোর কনডেমড সেলগুলোতে বন্দি রয়েছেন মোট ২ হাজার ৪৮২ জন ফাঁসির আসামি। এই বিশাল বন্দিশিবিরে পুরুষের পাশাপাশি অবস্থান করছেন অন্তত ৭০ জন নারী আসামি। আরও আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, এদের মধ্যে ৬৩৭ জন বন্দি আছেন যারা কমপক্ষে ৫ বছর থেকে শুরু করে ১৫ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে এই বন্দিদশা ভোগ করছেন। কারা প্রশাসনের দায়িত্বশীলদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কনডেমড সেলে যে কেবল দাগি কিংবা পেশাদার অপরাধীরাই রয়েছেন তা নয়, বরং আকস্মিক পরিস্থিতির শিকার কিংবা প্রথমবারের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো গুরুতর ঘটনার সংস্পর্শে আসা মানুষও সেখানে দিন কাটাচ্ছেন। অধিকাংশ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিই চরম দারিদ্র্যের শিকার, অনেকেই বার্ধক্যজনিত নানা জটিল রোগব্যাধিতে আক্রান্ত এবং দীর্ঘদিনের মানসিক ট্রমার কারণে স্বাভাবিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। তাদের অনেকের পক্ষেই উচ্চ আদালতে বেসরকারি আইনজীবী নিয়োগ করার আর্থিক সংগতি থাকে না। ফলে সরকারিভাবে জেল আপিল দায়ের হলেও সেই নথি বছরের পর বছর ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে থাকে, আর তাদের জামিনের বিষয়টি উত্থাপনের কোনো আইনি কর্তৃত্ব কারা কর্তৃপক্ষের থাকে না।
ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাজার পর জামিন চাওয়ার ক্ষেত্রে আইনে কোনো প্রকাশ্য বা প্রত্যক্ষ নিষেধাজ্ঞা নেই। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারায় জামিন অযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে বিচার চলাকালীন জামিন দেওয়ার কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার মতো অপরাধে যুক্ত থাকার যুক্তিসংগত কারণ থাকলে আদালত সাধারণত জামিন মঞ্জুর করবে না। তবে একই বিধানে এটিও বলা হয়েছে যে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি ষোলো বছরের কম বয়সী কোনো শিশু, নারী কিংবা শারীরিকভাবে পীড়িত বা অক্ষম কেউ হন, তবে আদালত চাইলে তাকে জামিনে মুক্তি দিতে পারে। ফৌজদারি আইনবিদদের যুক্তি অনুযায়ী, মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর ৪৯৭ ধারার প্রত্যক্ষ প্রয়োগ থাকে না, বরং সাজার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল নিষ্পত্তির আগপর্যন্ত বিচার স্থগিত রেখে জামিন দেওয়ার ক্ষমতা আদালতের রয়েছে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬ ধারা অনুসারে। এই ধারায় স্পষ্ট বলা আছে যে আপিল আদালত চাইলে যেকোনো দণ্ড স্থগিত রেখে আসামিকে জামিনে বা নিজস্ব মুচলেকায় মুক্তির আদেশ প্রদান করতে পারে।
আইনের সুস্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও ফাঁসির আসামিদের জামিন না চাওয়ার পেছনে আইনজীবীদের নিজস্ব কিছু যৌক্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা রয়েছে। তাদের মতে, কোনো ব্যক্তিকে যখন মৃত্যুদণ্ডের মতো চরম শাস্তি দেওয়া হয়, তখন অপরাধের তীব্রতা, ভুক্তভোগী পরিবারের ন্যায়বিচার এবং সমাজে কঠোর বার্তা পাঠানোর বিষয়গুলো সামনে চলে আসে। এমন আসামিকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেওয়া হলে তিনি সাক্ষীদের প্রভাবিত করতে পারেন, পলাতক হয়ে বিচার প্রক্রিয়া বানচাল করতে পারেন কিংবা আবারও মারাত্মক অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারেন—এমন গভীর আশঙ্কাই কাজ করে আদালতের মনে। তবে এই দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে ভিন্ন মতও জোরালো হচ্ছে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা যুক্তি দেখাচ্ছেন যে, অধস্তন আদালতের প্রতিটি রায়ই চূড়ান্ত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে—এমন দাবি করার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে বিচারিক আদালতে ত্রুটিপূর্ণ সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হলেও উচ্চ আদালতে আসামিরা সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পেয়েছেন। বহুল আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টে দশজন আসামির খালাস পাওয়া এর একটি স্পষ্ট প্রমাণ।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বেসরকারি আইনি সংস্থা ল’ ল্যাব ফাউন্ডেশন প্রায় ১১০টি ডেথ রেফারেন্স মামলায় দেড় শতাধিক ফাঁসির আসামির পক্ষে উচ্চ আদালতে শুনানি পরিচালনা করেছে। এসব আইনি পর্যালোচনার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে আসামিরা শেষ পর্যন্ত নির্দোষ হিসেবে অব্যাহতি পেয়েছেন অথবা তাদের ফাঁসির আদেশ কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তর করা হয়েছে। এই সংস্থার সহায়তায় চৌদ্দ বছর ধরে কনডেমড সেলে বন্দি থাকা আকবর নামের এক আসামির গুরুতর অসুস্থতা বিবেচনায় হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে শুনানিতেই আসেনি, যদিও চূড়ান্ত বিচারে তিনি সম্পূর্ণ খালাস পান। অর্থাৎ বহু নির্দোষ মানুষ কেবল প্রথাগত বাধ্যবাধকতা এবং শুনানির দীর্ঘসূত্রতার কারণে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো নির্জন সেলের ভেতরে তিলে তিলে ধ্বংস করে দিচ্ছেন।
একই ধরনের নির্মম বাস্তবতার শিকার হয়েছেন বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার অন্যতম আসামি আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বিচারিক আদালত তার বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় প্রদান করে। রায় ঘোষণার পর দীর্ঘ সাত বছর অতিক্রম হতে চললেও হাইকোর্টে এখনো তার ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি শুরুই করা যায়নি। এই দীর্ঘ অপেক্ষার মাঝে ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চার দফায় তার পক্ষে জামিনের আবেদন দাখিল করা হলেও উচ্চ আদালত তা শুনানিতে গ্রহণ করেনি, এমনকি ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে একটি দ্বৈত বেঞ্চ সরাসরি অপারগতা প্রকাশ করে। এই মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য হলো, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দিরা পাঁচ কিংবা দশ বছর সাজা খাটার পর উচ্চ আদালত থেকে অনায়াসে জামিন সুবিধা লাভ করছেন, অথচ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো প্রার্থনাই শোনা হচ্ছে না।
বিচার ব্যবস্থার এই দীর্ঘস্থায়ী দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিরসনে ২০২৪ সালের ১৩ মে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ এক যুগান্তকারী অভিমত দিয়েছিল। তিন বন্দির করা রিট আবেদনের রায়ে আদালত সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছিল যে, উচ্চ আদালতে ফাঁসির আদেশ চূড়ান্ত অনুমোদন হওয়ার আগেই আসামিকে কনডেমড সেলে আবদ্ধ রাখা মূলত এক অপরাধের জন্য দুইবার সাজা দেওয়ার শামিল। আদালত তার রায়ে বলেছিল, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদেরও ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬ ধারার আওতায় জামিন চাওয়ার পূর্ণ আইনি অধিকার রয়েছে এবং হাইকোর্টের উচিত সেই আবেদনগুলো আমলে নিয়ে শুনানি করা। যদিও রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে চেম্বার আদালত পরবর্তীতে এই রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করে দেয়, যা বর্তমানে আপিল বিভাগে চূড়ান্ত পর্যালোচনার অপেক্ষায় রয়েছে।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলের মতে, যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি বিচারিক প্রথার পেছনে এক ধরনের ঐতিহ্যগত যৌক্তিক ভিত্তি কাজ করে। ফাঁসির আসামিকে জামিন দিলে বিচার এড়িয়ে যাওয়ার বা সমাজে নতুন সংকট তৈরির যে আশঙ্কা তৈরি হয়, তা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তবে তিনি এটিও স্বীকার করেন যে, ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তির যে ভয়াবহ কালক্ষেপণ, সেটিই মূলত এই মানবিক উদ্বেগের মূল কারণ। যদি অধস্তন আদালতের রায়ের পর উচ্চ আদালতে দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সমস্ত প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার সঙ্গে নিষ্পত্তি করা যেত, তবে এমন অমীমাংসিত প্রশ্ন ও দীর্ঘ কারাবাসের যাতনা কখনোই জন্ম নিত না।
প্রথার নিগড়ে বন্দি হয়ে বিচার বিলম্বের এই ভার কোনোভাবেই একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার স্বাভাবিক চিত্র হতে পারে না। আদালতের ভেতরে শুনানির অপেক্ষায় বন্দি মানুষগুলোর অধিকার নিশ্চিত করতে হলে এই দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটানোই প্রধানতম সমাধান। অপরাধীকে তার প্রাপ্য শাস্তি যেমন দ্রুত বুঝিয়ে দিতে হবে, তেমনি বিচারিক ত্রুটির শিকার হয়ে কোনো নিরপরাধ নাগরিক যেন কনডেমড সেলের অন্ধকার কুঠুরিতে নিজের জীবন বিসর্জন না দেন, সেই সাংবিধানিক সুরক্ষার পথও উন্মুক্ত রাখতে হবে। প্রচলিত অনড় প্রথা ভেঙে আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তির গতি ত্বরান্বিত করাই এই দীর্ঘ অচলাবস্থা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ।
তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর