• সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৭ অপরাহ্ন
Headline
পর্তুগাল–স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্র–বেলজিয়াম দ্বৈরথ: কার জয়রথ চলবে কোয়ার্টার ফাইনালে মেয়ের বিয়ে: আমিন চাচার আট পরামর্শ পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল শুনানি মুলতবি প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ গুলশান লেকের পরিবেশ রক্ষা ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ‘ডে-কেয়ার সেন্টার’ দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ : ডা. জুবাইদা রহমান অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্ততি ইসির ফিলিস্তিনকে সমর্থন করায় খামেনিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল: হুথি মুখপাত্র গাজার শাসনভার ছাড়ার ঘোষণা হামাসের সংসদহীন ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর টিকে থাকার লড়াই

ঢাকা ওয়াশিংটন সরাসরি কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায়

Reporter Name / ১ Time View
Update : সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি অনেকাংশেই ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি ও আঞ্চলিক স্বার্থের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীর বিষয়ে কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন সবসময় দিল্লির সংবেদনশীলতা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিত। তবে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক সমীকরণ পরিবর্তনের পর আমেরিকা এখন আর দিল্লির সেই পুরোনো চশমা দিয়ে ঢাকাকে দেখছে না। বরং নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে সরাসরি বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক জোরদার করতে মাঠে নেমেছে ওয়াশিংটন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বাংলাদেশই নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়া জুড়েই ভারতকে ভায়া বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করার দীর্ঘদিনের নীতি থেকে সরে আসছে মার্কিন প্রশাসন।

বিগত দুই দশকে বিশ্ব রাজনীতিতে পরাশক্তি চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থান ঠেকাতে এশিয়ার মাটিতে আমেরিকার একজন শক্তিশালী অংশীদার প্রয়োজন ছিল। বেইজিংকে টেক্কা দেওয়ার এই কৌশলে ভারতের চেয়ে ভালো বিকল্প ওয়াশিংটনের কাছে ছিল না। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় দিল্লির একচ্ছত্র প্রভাবকে একরকম মেনে নিয়েছিল মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা কৌশলগত যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দিল্লির পরামর্শকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হতো। ভারতের প্রধান যুক্তি ছিল যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তাদের নিজেদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য। আমেরিকাও এই আঞ্চলিক সংবেদনশীলতাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে দীর্ঘ সময় এই অংশে সরাসরি নাক গলানো থেকে বিরত ছিল। তবে সময়ের সাথে সাথে ওয়াশিংটনের থিংক ট্যাংকগুলোর মধ্যে একটি নতুন উপলব্ধি তৈরি হয় যে, ভারতের ওপর পুরো ভরসা ছেড়ে দেওয়ায় তারা আসলে বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছিল, যার ফলে জনআকাঙ্ক্ষা বুঝতেও তাদের বড় ধরনের ভুল হচ্ছিল।

এই দীর্ঘমেয়াদি সমীকরণের মধ্যেই বাংলাদেশে ঘটে যায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান। ভারতের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা ও নীতিতে এক বড় পরিবর্তন আসে। ২০২৪ সালের সেই রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই ঢাকার মাটিতে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও সক্রিয়তা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পর বর্তমানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশাসনেও আমেরিকাপন্থী কর্মকর্তাদের জোরালো অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে প্রায় ৪৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার মেগা চুক্তি সম্পন্ন করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এর বাইরেও প্রতিরক্ষা ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে দুই দেশের মধ্যে পর্দার আড়ালে বড় দুটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, যা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ বিষয়ে দিল্লিকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার দিন ফুরিয়ে এসেছে।

আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি বা আইপিএস-এর জন্য বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটন এখন নিজেই সরাসরি বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে চায়। কারণ এই প্রক্রিয়ায় ভারতের স্বার্থকে টেনে আনতে গেলে তাদের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের গতি শ্লথ হয়ে পড়ে। এমনকি মিয়ানমার সীমান্তের জটিল পরিস্থিতি এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো স্পর্শকাতর বিষয়েও আমেরিকা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অস্বস্তিকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি ঢাকার পাশে দাঁড়িয়ে ভূমিকা রাখতে চাইছে। আমেরিকা এখন ঢাকাকে শুধু কোনো আঞ্চলিক শক্তির নিরাপত্তা উদ্বেগের চশমা দিয়ে দেখছে না। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ড ক্রিস্টেন্সন জোর দিয়ে বলেছেন যে, তাঁরা দুই দেশের মানুষের সম্পর্ককে আরও গভীর করতে চান। মার্কিন রাষ্ট্রদূত এখন কেবল ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ নন, বরং মানুষের মন বুঝতে এবং বাংলাদেশকে আরও কাছ থেকে জানতে চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও সিলেটে সরাসরি ছুটে বেড়াচ্ছেন।

দ্বিপাক্ষিক এই নতুন মাত্রার সম্পর্কের প্রতিফলন এখন একদম শীর্ষ পর্যায়েও দেখা যাচ্ছে। আমেরিকার ২৫০তম ঐতিহাসিক স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উষ্ণ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। এই শুভেচ্ছা বার্তায় মার্কিন স্বপ্ন, আত্মত্যাগ ও মূল্যবোধকে বিশ্বের মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যকার বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব এখন দিল্লির চোখ এড়িয়ে সরাসরি ওয়াশিংটন-ঢাকা অক্ষ বরাবর বিকশিত হচ্ছে।

স্বাভাবিকভাবেই ওয়াশিংটনের এই সরাসরি মাঠে নামা এবং দিল্লির মধ্যস্থতা মাইনাস হওয়াকে ভারত খুব একটা স্বস্তির সাথে দেখছে না। দিল্লির বড় ভয় হলো, আমেরিকা যদি এই অঞ্চলে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে এমন কিছু করে যা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের চিরাচরিত প্রভাবকে দুর্বল করে, তবে তা তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বিশাল কূটনৈতিক এবং কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো পরাশক্তি যখন অন্য কোনো আঞ্চলিক দেশের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি কোনো রাষ্ট্রের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করে, তখন টেবিল ও দর-কষাকষিতে সেই দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। বাংলাদেশ এখন আর কোনো আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব বলয় হিসেবে নয়, বরং একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম সত্তা হিসেবে আমেরিকার সাথে সরাসরি নিজের জাতীয় স্বার্থের কথা বলতে পারছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চিরস্থায়ী স্বার্থের সূত্র মেনে আমেরিকা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে যে, ঢাকার সাথে দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্ব করতে হলে দিল্লির চশমা ফেলে সরাসরি ঢাকার মাটিতেই পা রাখতে হবে।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category