বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ে বিনামূল্যে অসংক্রামক রোগের (Non-Communicable Diseases – NCD) চিকিৎসা এবং ওষুধ প্রদান ব্যবস্থা চরম হুমকিতে পড়েছে। অর্থ সংকটের কারণে দেশের অন্তত ২৬টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ‘এনসিডি (NCD) কর্নার’-এ ওষুধের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো জীবনঘাতী রোগের ওষুধ রেশনিং করে দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে ভোগান্তিতে পড়ছেন হাজারো নিম্ন আয়ের রোগী।
রোগীদের ভোগান্তির বাস্তব চিত্র:
ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিত ডায়াবেটিস পরীক্ষার জন্য এসেছিলেন ৩৫ বছর বয়সী গৃহিণী মিহুরা বেগম। বোয়ালখালী গ্রামের এই বাসিন্দা আগে প্রতি মাসে পুরো এক মাসের বিনামূল্যে ওষুধ পেতেন। কিন্তু এবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাকে মাত্র এক স্ট্রিপ (এক পাতা) ওষুধ ধরিয়ে দেওয়া হয়।
মিহুরা আক্ষেপ করে বলেন, “তারা আগে পুরো মাসের ওষুধ দিত। এবার মাত্র এক পাতা দিয়ে বলল ওষুধ কম আছে। এটা দিয়ে মাত্র পাঁচ দিন চলবে। আমি ১০০ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে এসেছি। বাকি ওষুধ কিনে খাওয়া আমার জন্য খুব কঠিন।”
একই অবস্থার শিকার হয়েছেন বামনসুর গ্রামের ৭০ বছর বয়সী উচ্চ রক্তচাপের রোগী মোসলেম উদ্দিন। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি এই সুবিধা নিচ্ছেন। তিনি বলেন, “আগে এক মাসের ওষুধ পেতাম, এখন দেয় মাত্র ১০ দিনের। বাকিটা ফার্মেসি থেকে কিনতে হবে। এই সুবিধাটি আমার জন্য বড় স্বস্তি ছিল, কিন্তু এখন আমি বিপদে পড়ে গেছি।”
পরিসংখ্যান ও ঘাটতির কারণ:
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) তথ্য অনুযায়ী, এই এনসিডি কর্নারগুলোর মাধ্যমে বর্তমানে সারা দেশে ৯.১৮ লাখ উচ্চ রক্তচাপ এবং ৭.৩১ লাখ ডায়াবেটিস রোগী নিবন্ধিত আছেন। ২০১৮ সালে চালু হওয়া এই কর্মসূচির আওতায় ৪১৬টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ৩০টি জেলা হাসপাতালে বিনামূল্যে পাঁচ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হতো।
কিন্তু তহবিলের অভাবে এই সফল কর্মসূচি এখন বাধাগ্রস্ত। গত ১৬ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে জরুরি ভিত্তিতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের আবেদন করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তারা সতর্ক করেছিল যে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে ওষুধের মজুত সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আবেদনের পর ৫০ দিন পার হয়ে গেলেও কোনো বরাদ্দ মেলেনি।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও আশঙ্কা:
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ জানান, একটি সেক্টরাল প্রোগ্রাম স্থগিত হওয়ার কারণেই মূলত এই সংকট দেখা দিয়েছে। ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের সম্ভাবনা কম জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার আগামী বাজেটে হাসপাতালগুলোর জন্য সরাসরি বরাদ্দ বাড়াতে পারে, যাতে তারা নিজেরাই ওষুধ কিনতে পারে।
তবে তিনি দাবি করেন, ৭০ শতাংশ রোগী আগে থেকেই নিজেদের ওষুধ নিজেরা কেনেন, ফলে এই সংকটের কারণে ভোগান্তির হার মাত্র ৫ শতাংশ বাড়তে পারে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী আশ্বস্ত করে বলেছেন, “যদি কোনো সংকট থেকে থাকে, তবে তা সমাধানে আমরা অবশ্যই পদক্ষেপ নেব।”
কেন এই সংকট ও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব?
উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অসংক্রামক রোগ, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশের জন্য দায়ী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এই এনসিডি কর্মসূচির ব্যাপক প্রশংসা করেছিল।
চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা এবং পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচির (HPNSP) অধীনে এটি পরিচালিত হতো, যার মেয়াদ ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পঞ্চম HPNSP বাতিল করে শুধুমাত্র অসমাপ্ত কাজগুলোর জন্য প্রজেক্ট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। নিয়মিত রাজস্ব বাজেট না থাকায় এবং কোনো নতুন প্রকল্প অনুমোদিত না হওয়ায় ২০২৫ সালের শুরু থেকেই এই ওষুধের ঘাটতি তীব্র হতে শুরু করে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস পরীক্ষার স্ট্রিপের সংকট সবচেয়ে বেশি, যা গত দুই বছর ধরে কেনাই হয়নি।
মাঠপর্যায়ের অবস্থা:
কেরানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আব্দুল মোকাদ্দেশ জানান, ঘাটতির কারণে তারা পুরো এক মাসের বদলে কেবল ১০ দিনের ওষুধ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা ৫৬ শতাংশ রোগীর শারীরিক অবস্থা আবার অবনতির দিকে যেতে পারে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী সতর্ক করে বলেন, “আগামী এক মাসের মধ্যে অধিকাংশ উপজেলার ওষুধের মজুত শেষ হয়ে যাবে। আমরা দ্রুত নতুন ব্লক বরাদ্দের দাবি জানিয়েছি।”
এই কর্মসূচি বিঘ্নিত হলে দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে, যার ফলে অনেকেই চিকিৎসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন। এটি দেশের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যমাত্রাকেও বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সূত্র: দ্যা ডেইলি স্টার