• শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৪ অপরাহ্ন
Headline
দিলারা জামানের বাড়ি দখলের ঘটনা নিয়ে আলোচনা, অভিনেত্রী যা বললেন কাগজে-কলমে শতভাগ কাভারেজের রেকর্ড: বাস্তবে ওয়ার্ডজুড়ে হামের হাহাকার শিক্ষকদের শেষ সম্বল গিলে খেল সিন্ডিকেট: অবসর তহবিলের ৭ হাজার কোটি টাকা হরিলুটের নেপথ্যে আমদানির মোহ ও মেগা প্রকল্পের ফাঁদ: জ্বালানির নতুন রোডম্যাপে সংস্কারের অনুপস্থিতি তৃতীয় এলএনজি টার্মিনালে চড়া মাশুল: অসঙ্গতি জেনেও চীনা কোম্পানির প্রস্তাবে সায় দেওয়ার পথে সরকার তালাবদ্ধ ওটি ও ধুলোজমা যন্ত্রপাতি: দেশের ৮০ শতাংশ উপজেলায় বিকল সরকারি শল্যচিকিৎসা কলকাতার ফুটপাতে রোগীর কান্না: হোটেল সংকটে খোলা আকাশের নিচে বাংলাদেশি ক্যানসার আক্রান্তরা দ্য হিন্দুর এক্সপ্লেইনার: ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তিতে শেখ হাসিনাকে কি ফেরত পাঠাবে ভারত? শিক্ষার আড়ালে রমরমা বাণিজ্য: মেডিকেলে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তিতে বেপরোয়া আন্তর্জাতিক চক্র হাইপারভিজিল্যান্স: আপনার কি এরকম কখনো হয়েছে?

তালাবদ্ধ ওটি ও ধুলোজমা যন্ত্রপাতি: দেশের ৮০ শতাংশ উপজেলায় বিকল সরকারি শল্যচিকিৎসা

Reporter Name / ১ Time View
Update : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার প্রধান ভরসাস্থল হওয়ার কথা ছিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর। আধুনিক অবকাঠামো, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অপারেশন থিয়েটার এবং কোটি কোটি টাকার আধুনিক অস্ত্রোপচার সরঞ্জামাদিও পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এসব সরকারি হাসপাতালে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের রূঢ় বাস্তবতা হলো, এই বিপুল আয়োজন থাকা সত্ত্বেও দেশের প্রায় চার-পঞ্চমাংশ বা প্রায় ৮০ শতাংশ উপজেলাতেই সাধারণ মানুষের জন্য সরকারিভাবে অস্ত্রোপচার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে। কোথাও কয়েক মাস, আবার কোথাও টানা কয়েক বছর ধরে অপারেশন থিয়েটারের দরজায় ঝুলছে মরিচাপড়া তালা। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও মূলত অ্যানেসথেসিওলজিস্ট বা অজ্ঞানবিদ এবং শল্যচিকিৎসক ও এনেসথেসিয়া সহকারীর তীব্র ঘাটতি, ল্যাব টেকনিশিয়ানের অভাব এবং অদূরদর্শী প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার কারণে পুরো শল্যচিকিৎসা ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে। ফলে নামমাত্র খরচে প্রসূতি মায়েদের সিজারিয়ান কিংবা অ্যাপেন্ডিক্স ও হার্নিয়ার মতো জরুরি ও সাধারণ অস্ত্রোপচারের সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের লাখ লাখ অসহায় মানুষ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে পুরো ব্যবস্থার এক উদ্বেগজনক চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। দেশে বর্তমানে মোট ৪৩৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে ৩৪৪টিতেই রোগীদের কোনো ধরনের অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে না, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ৭৯ দশমিক ৪৪ ভাগ। শল্যচিকিৎসা বন্ধ থাকার প্রধানতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মারাত্মক অ্যানেসথেসিয়া সংকট। সারাদেশে অনুমোদিত চিকিৎসকদের মধ্যে প্রায় দুই হাজার অ্যানেসথেসিওলজিস্ট থাকলেও সরকারি ব্যবস্থাপনায় যুক্ত রয়েছেন মাত্র এক হাজারের মতো। এর মধ্যে ৪৩৩টি উপজেলার জন্য বরাদ্দ রয়েছেন মাত্র ১৪২ জন বিশেষজ্ঞ, যার অর্থ দাঁড়ায় প্রায় ৭০ শতাংশ অনুমোদিত পদই বছরের পর বছর শূন্য পড়ে রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিপরীতে অ্যানেসথেসিওলজিস্টের উপস্থিতি মাত্র শূন্য দশমিক ৪৫ জন এবং প্রতি সার্জনের বিপরীতে অজ্ঞানবিদ আছেন মাত্র শূন্য দশমিক ৩৭ জন। এমনকি রোগ নির্ণয়ের মৌলিক সুবিধা দিতে প্রতিটি উপজেলায় গড়ে সার্জন ১ দশমিক ২২ জন থাকলেও ল্যাব টেকনিশিয়ানের অনুপাত মাত্র শূন্য দশমিক ১৭ জন, অর্থাৎ গড়ে ছয়টি উপজেলার ভাগ্যে জুটছে মাত্র একজন টেকনিশিয়ান।
অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি ডায়াগনস্টিক বা রোগ নির্ণয় ব্যবস্থার অচলাবস্থাও রোগীদের সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকারি হাসপাতালগুলোর ৬৯ হাজার ১১৭টি পদের মধ্যে ২৫ হাজার ৮৬টি পদই শূন্য। ৪৩৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে ১০১টিতে এক্স-রে সুবিধা নেই, যা মোট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। একইভাবে ১৯৬টি হাসপাতালে আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন অকেজো কিংবা টেকনিশিয়ানের অভাবে বন্ধ, যা মোট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রায় ৪২ দশমিক ২৬ শতাংশ। এছাড়া ৭০টি হাসপাতালে নিয়মিত ইসিজি সুবিধাও পান না রোগীরা। এর ফলে কোটি কোটি টাকা খরচ করে কেনা উন্নত ডিজিটাল এক্স-রে বা আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনগুলো প্যাকেটবন্দী হয়ে নষ্ট হচ্ছে। সরকারিভাবে এই ন্যূনতম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও শল্যচিকিৎসার পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্রামের দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষ বাধ্য হয়ে জেলা শহর কিংবা স্থানীয় বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর দ্বারস্থ হচ্ছেন। সেখানে জমিজমা বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ব্যক্তিগত ক্লিনিকের গলাকাটা বিল পরিশোধ করতে গিয়ে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারগুলো প্রতিনিয়ত সর্বস্বান্ত হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র পর্যবেক্ষণ করলে জেলাভিত্তিক হাসপাতালগুলোতে জনবল সংকটের আরও ভয়াবহ রূপ দেখা যায়। শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে সম্প্রতি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করে নতুন ভবন ও ওটি স্থাপন করা হলেও অস্ত্রোপচার সেবা আজও শুরু হতে পারেনি। সেখানে অনুমোদিত ২২ জন চিকিৎসকের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১১ জন, এবং সার্জারি, গাইনি কিংবা অ্যানেসথেসিয়া—কোনো বিভাগেই কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অপারেশন থিয়েটার দীর্ঘ তিন বছর ধরে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে ১৮ জন মেডিকেল অফিসারের বিপরীতে আছেন মাত্র ৯ জন। হাসপাতালের জন্য শিশু ও অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ পদায়ন করা থাকলেও তারা ‘সংযুক্তি’ আদেশে কর্মস্থল ত্যাগ করে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে সেখানে কোনো সিজারিয়ান অপারেশন বা জরুরি শল্যসেবা পাওয়া দূরহ হয়ে পড়েছে।
ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও একই কারণে বিগত সাত-আট মাস ধরে সব ধরনের অস্ত্রোপচার পুরোপুরি বন্ধ। ৪১টি অনুমোদিত চিকিৎসক পদের বিপরীতে সেখানে কাজ করছেন মাত্র ১৫ জন। হাসপাতালে নিয়মিত গাইনি বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ সার্জন উপস্থিত থাকলেও একজন অ্যানেসথেসিওলজিস্টের অভাবে অপারেশন থিয়েটারের দরজায় ঝুলছে তালা। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ রোগী আউটডোরে চিকিৎসা নিতে আসেন, যার মধ্যে প্রায় ৭০ জন নারী গাইনি জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে এলেও প্রসবকালীন জরুরি অপারেশনের প্রয়োজনে তাদের বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন চিকিৎসকরা। সবচেয়ে নাটকীয় ও করুণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে মেহেরপুর জেলায়। সেখানে ২৫০ শয্যার মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতাল ছাড়াও ৫০ শয্যার মুজিবনগর ও গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পুরো শল্যসেবা নির্ভর করছিল মাত্র একজন অ্যানেসথেসিওলজিস্টের কাঁধে। গত ১৯ জুন তাকে হঠাৎ চুয়াডাঙ্গায় বদলি করা হলে একযোগে ওই জেনারেল হাসপাতাল ও দুটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওটি সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। নতুন পদায়িত চিকিৎসক কাজে যোগ না দেওয়ায় কেবল প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার বলি হয়ে পুরো একটি জেলার সরকারি অস্ত্রোপচার দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে স্থবির হয়ে রয়েছে।
এমন সর্বনাশা অচলাবস্থা থেকে উত্তরণে জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা ও লোকদেখানো অবকাঠামো সম্প্রসারণ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ডা. মোজাহেরুল হক সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করে ওটি বন্ধের সুনির্দিষ্ট কারণগুলো চিহ্নিত করার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে সমন্বিত মনিটরিং কমিটি গঠন করে ছোট ও মাঝারি সাধারণ অস্ত্রোপচার, সিজারিয়ান এবং চোখ ও নাক-কান-গলার সাধারণ সার্জারিগুলো দ্রুত চালুর ওপর জোর দেন। তার মতে, চিকিৎসক, টেকনিশিয়ান, ওষুধ ও যন্ত্রপাতি—সবকিছুর সমন্বিত উপস্থিতি ছাড়া খণ্ডিত পদায়নে কোনো সুফল মিলবে না। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আবু জামিল ফয়সাল মনে করেন, লোকবল নিশ্চিত না করে হাসপাতালকে কেবল শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর তথাকথিত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার। নতুন অবকাঠামো বানানোর চেয়ে বিদ্যমান অপারেশন থিয়েটারগুলো সচল করাই রাষ্ট্রের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। প্রতিটি হাসপাতালে ওটি বন্ধ থাকার কারণ এবং তা চালুর সময়সীমা প্রকাশ করে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, নতুবা সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ওপর থেকে সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাটুকুও চিরতরে হারিয়ে যাবে।
তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category