পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক সক্ষমতা জোরদার এবং ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লাঞ্চারগুলো ধ্বংস করার লক্ষ্যে এক অভাবনীয় ও ব্যয়বহুল সামরিক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের সর্বাধুনিক ‘ডার্ক ঈগল’ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র এই অঞ্চলে মোতায়েন করার কথা ভাবছে। সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইতোমধ্যে এই অত্যাধুনিক অস্ত্র মোতায়েনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছে।
পরিকল্পনার নেপথ্যে কী?
বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের যেসব ‘প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল’ মোতায়েন করা আছে, সেগুলো দিয়ে ইরানের একেবারে গভীর অভ্যন্তরে থাকা সামরিক স্থাপনা বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লাঞ্চারগুলোতে আঘাত হানা সম্ভব নয়। তাই মার্কিন সামরিক বাহিনীর দূরপাল্লার নিখুঁত হামলা চালানোর সক্ষমতা বাড়াতেই মূলত এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
যদিও পেন্টাগনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, তবে এই প্রস্তাব যদি অনুমোদন পায়, তবে এটিই হবে মার্কিন সামরিক ইতিহাসে হাইপারসনিক অস্ত্রের প্রথম কোনো সরাসরি ফিল্ড ডিপ্লয়মেন্ট বা যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন।
কী এই ‘ডার্ক ঈগল’ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র?
‘ডার্ক ঈগল’ (Dark Eagle), যার পোশাকি নাম ‘লং-রেঞ্জ হাইপারসনিক ওয়েপন’ (LRHW), বর্তমানে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারের অন্যতম ভীতিকর একটি নাম। এটি সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক।
গতি ও পাল্লা: এটি শব্দের চেয়ে অন্তত পাঁচ গুণ বেশি গতিতে (ম্যাক ৫+) লক্ষ্যবস্তুর দিকে ছুটে যেতে পারে। এর পাল্লা এতটাই বেশি যে, এটি ১ হাজার ৭২৫ মাইল দূর থেকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম।
দিক পরিবর্তনের সক্ষমতা: এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ‘গ্লাইড বডি প্রযুক্তি’। এই প্রযুক্তির সাহায্যে ডার্ক ঈগল ছোঁড়ার পরও আকাশের যেকোনো মুহূর্তে নিজের গতিপথ ও দিশা পরিবর্তন করতে পারে। ফলে কোনো রাডার বা অ্যান্টি-মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের পক্ষে একে ট্র্যাক করা বা মাঝপথে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব।
বিপুল ব্যয়: এই প্রযুক্তির দামও আকাশছোঁয়া। প্রতিটি ডার্ক ঈগল ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার (প্রায় ১৮০ কোটি টাকা)। আর একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাটারি সিস্টেম (মিসাইল, লাঞ্চার ও রাডারসহ) স্থাপন করতে খরচ হবে প্রায় ২৭০ কোটি ডলার।
ইরানকে টার্গেট করার কারণ
মূলত রাশিয়া ও চীনের অগ্রসর হাইপারসনিক প্রযুক্তির শক্ত জবাব দিতে এবং তাদের সাথে পাল্লা দিতেই যুক্তরাষ্ট্র এই ডার্ক ঈগল তৈরি করেছিল। কিন্তু এখন পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দমনে এটি ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, অতীতে ইরানের আকাশে বেশ কয়েকটি অত্যাধুনিক মার্কিন এমকিউ-৯ (MQ-9) ড্রোন এবং চালকসহ বিমান ভূপাতিত করার ঘটনা ঘটেছে, যা পেন্টাগনকে বেশ বিব্রত করেছে। বর্তমানে অস্ত্রবিরতির আলোচনা চলমান থাকলেও, মার্কিন পেন্টাগন ভবিষ্যতে ইরানকে প্রতিহত করার জন্য এই ব্রহ্মাস্ত্রটি প্রস্তুত রাখতে চাইছে।
বিশ্লেষকদের উদ্বেগ
সামরিক বিশ্লেষকরা যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, পশ্চিম এশিয়া এমনিতেই বারুদের স্তূপের ওপর বসে আছে। সেখানে ‘ডার্ক ঈগল’-এর মতো অত্যাধুনিক ও অপ্রতিরোধ্য হাইপারসনিক অস্ত্রের অনুপ্রবেশ যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাতকে কেবল ত্বরান্বিতই করবে না, বরং এটিকে কল্পনাতীত মাত্রায় প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক করে তুলবে।