• বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:০১ অপরাহ্ন

ত্রুটিপূর্ণ বেয়ারিং প্যাডে ঝুঁকিপূর্ণ মেট্রো রেলের উড়াল কাঠামো

Reporter Name / ৪ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

রাজধানীর যানজট নিরসনের লাইফলাইন খ্যাত দেশের একমাত্র মেট্রো রেলের (এমআরটি লাইন-৬) নিরাপত্তা ও নির্মাণমান নিয়ে এক মারাত্মক ও প্রলয়ংকরী চিত্র সামনে এসেছে। উত্তরা উত্তর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বিস্তৃত রুটের উড়াল কাঠামোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বেয়ারিং প্যাডের ২৩ দশমিক ২৮ শতাংশ, অর্থাৎ ৭৩০টি প্যাডই বর্তমানে গুরুতর ত্রুটিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। একই সাথে মেট্রোর ৪৬টি পিয়ার হেড এবং অন্তত ২০টি বক্স গার্ডারে বিপজ্জনক ফাটল শনাক্ত হয়েছে, যা যাত্রী নিরাপত্তা ও অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বকে এক চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব ত্রুটি কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং এটি একটি ‘যৌগিক ঝুঁকি প্রোফাইল’ তৈরি করেছে। এর পেছনে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, গুরুতর নির্মাণত্রুটি কিংবা নকশাগত বড় ধরনের দুর্বলতা জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার মূল কারণ নির্ণয় বা স্থায়ী কোনো সমাধানের উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি।

বিগত বছরের ২৬ অক্টোবর রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় চলন্ত মেট্রোর একটি বেয়ারিং প্যাড নিচে পড়ে পথচারীর মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনার পর হাইকোর্ট ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। চুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে গঠিত ৯ সদস্যের এই কমিটির প্রতিবেদনে সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বেয়ারিং প্যাডের নড়বড়ে দশা। উড়াল কাঠামোর এই উপাদানটি মূলত ট্রেনের বিপুল ওজন ও কম্পন পিলারে স্থানান্তর করে। পরিদর্শনে দেখা গেছে, ট্রেন চলাচলের সময় বেশ কয়েকটি পিলারে অস্বাভাবিক ধাক্কা লাগছে এবং ৪২৩ নম্বর পিয়ারে একটি বেয়ারিং প্যাড ইতিমধ্যে নিজের স্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি ৩৪১ নম্বর পিয়ারের ফাটলটি নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে অনেক বড় ও গভীর হওয়ায় সেটিকে উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রেখেছে কমিটি। অথচ এই ফাটল মেরামতের বা নিয়মিত ক্র্যাক গেজ বসিয়ে পর্যবেক্ষণের কোনো নজির মেলেনি।

এই কাঠামোগত দুর্বলতার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে মেট্রো রেলের দৈনন্দিন পরিচালন ব্যবস্থার ওপর। মূল নকশা অনুযায়ী ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার হওয়ার কথা থাকলেও, তীব্র কম্পন ও ঝাঁকুনির কারণে বর্তমানে ১০টি অংশে জরুরি গতিসীমা বা টেম্পোরারি স্পিড রেস্ট্রিকশন জারি রয়েছে। এসব অংশে ট্রেনের গতি কমিয়ে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৯০ কিলোমিটার করা হয়েছে এবং কোনো কোনো অতি ঝুঁকিপূর্ণ অংশে প্রকৃত গতি নেমে আসছে মাত্র ৪৪ থেকে ৪৭ কিলোমিটারে। কমিটির মতে, মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান না করে কেবল ট্রেনের গতি কমিয়ে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের এই চেষ্টা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এছাড়া কারিগরি ত্রুটির কারণে ট্রেন নির্ধারিত স্টপিং পয়েন্টের আগেই থেমে যাওয়ার মতো ‘আন্ডারশুটিং’ সমস্যা দেখা দিয়েছে, যার ফলে ট্রেনের দরজা ও প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোরের মাঝে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়ে যাত্রীদের পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এই ব্রেকিং জটিলতার কারণে ইতিমধ্যে পাঁচটি সম্পূর্ণ ট্রেনসেটকে বাণিজ্যিক চলাচল থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।

অডিটে আরও উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ পেয়েছে যে, বিগত তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে ডিপো এলাকার ট্র্যাক দেবে যাওয়ার সমস্যাটি রয়েই গেছে। চাকার অস্বাভাবিক ক্ষয়, দরজা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ত্রুটি এবং ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেমে অনবরত বৈদ্যুতিক স্পার্কিং এই নিরাপত্তাহীনতাকে আরও উসকে দিচ্ছে। সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো, পুরো রেল ব্যবস্থায় কোনো কার্যকর রিয়াল-টাইম স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং (এসএইচএম) ব্যবস্থা নেই, যার ফলে পিলারের ফাটল বা ট্র্যাক বসে যাওয়ার মতো বিপদগুলো তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করার কোনো ডিজিটাল সুযোগ নেই।

এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি নিয়ে অডিট কমিটির সদস্য এবং বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, বর্তমানে গতি কমিয়ে ট্রেন চালানো কিংবা সাময়িক ব্র্যাকেট বসানোর মতো পদক্ষেপগুলো মূলত জোড়াতালির ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। এই জাতীয় ঝুঁকি দূর করতে কমিটি জরুরি ভিত্তিতে উচ্চ ঝুঁকির বেয়ারিং প্যাডগুলো দ্রুত প্রতিস্থাপন, পূর্ণাঙ্গ ডাইনামিক ভাইব্রেশন পরীক্ষা, আন্তর্জাতিক মানের স্বাধীন নিরাপত্তা পর্যালোচনা এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি স্মার্ট ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর জোর সুপারিশ করেছে।

তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category