২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত নজিরবিহীন হতাহতের ঘটনায় দেশজুড়ে দায়ের হওয়া হাজারো মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া চরম ধীরগতি ও নানামুখী জটিলতার আবর্তে থমকে রয়েছে। ঘটনার পর প্রায় দুই বছর সময় পার হয়ে গেলেও দেশজুড়ে রুজু হওয়া ১ হাজার ৮৬২টি মামলার মধ্যে মাত্র ২৫৪টি মামলার তদন্ত শেষ করতে পেরেছে পুলিশ প্রশাসন, যা মোট মামলার মাত্র ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ। অন্যদিকে, সিংহভাগ অর্থ্যাৎ ৮৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ মামলার তদন্তকাজ এখনো শেষ করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের উচ্চপর্যায়ের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভ্যুত্থানের সময়কার সহিংসতায় নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনাগুলোর তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশকে মাঠপর্যায়ে বহুমুখী পদ্ধতিগত ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা গেছে, ঘটনার সময়কার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির কারণে বেশির ভাগ লাশই কোনো প্রকার আইনি সুরতহাল বা ময়নাতদন্ত ছাড়াই তাড়াহুড়ো করে দাফন করা হয়েছিল।
পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মতে, ঘটনার সময় ময়নাতদন্ত করা হলে গুলিতে মৃত্যুর সঠিক কারণ বা অস্ত্রের ধরন তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি নথিতে লিপিবদ্ধ থাকত। কিন্তু এখন দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পর আদালতের নির্দেশে কবর থেকে লাশ তুলে ফরেনসিক পরীক্ষা করতে গিয়ে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি মামলার বিবরণে ঘটনাস্থলের কাল্পনিক ও ভুল বর্ণনা, একই ব্যক্তি নিহতের ঘটনায় পৃথক পৃথক থানায় একাধিক ভিন্ন ঘটনাস্থল দেখিয়ে মামলা দায়ের এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষকে ঢালাও আসামি করার মতো গুরুতর অসংগতির কারণে তদন্তের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে এই সংবেদনশীল মামলাগুলোর তদন্তভার যৌথভাবে সামলাচ্ছে থানা পুলিশ, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), সিআইডি, এটিইউ এবং ডিবি।
পুলিশ সদর দপ্তরের সংগৃহীত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত গণ-অভ্যুত্থান কেন্দ্রিক মোট মামলার মধ্যে মাত্র ১৯৯টি মামলায় আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। আর ঘটনার সাথে আসামিদের কোনো ধরণের প্রাথমিক সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় ৫৫টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা ফাইনাল রিপোর্ট জমা দিয়েছে পুলিশ। প্রাপ্ত তথ্যমতে, অভ্যুত্থানের ঘটনায় দেশজুড়ে মোট হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে ৭৯৯টি, যেখানে মোট আসামির সংখ্যা আকাশচুম্বী—প্রায় ৩ লাখ ২৭ হাজার ৮৪১ জন। এর মধ্যে সুনির্দিষ্ট এজাহারভুক্ত আসামি ৬৫ হাজার ২১০ জন এবং সন্দেহভাজন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে আরও ২ লাখ ৬২ হাজার ৬৩১ জনকে। অন্যদিকে, আন্দোলনে গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ insert হাজার ৬৩টি, যেখানে আসামির সংখ্যা ২ লাখ ৮২ হাজার ৮৭৯ জন। তদন্ত শেষে এই আহত হওয়ার মামলার মধ্যে ১৫৪টির প্রতিবেদন দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
আদালত ও থানা সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়লে মাঠপর্যায়ে সঠিক তদারকির অভাবে বহু মামলায় ব্যক্তিগত শত্রুতা, ব্যবসায়িক বিরোধ ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চরমভাবে শায়েন্তা করার উদ্দেশ্যে ঢালাওভাবে নিরীহ মানুষদের জড়ানো হয়েছে, যা এক ধরণের ‘মামলা-বাণিজ্যে’ রূপ নিয়েছে। ঢাকার মিরপুর মডেল থানায় দায়ের হওয়া কলেজছাত্রী রিতা আক্তার হত্যা মামলার বাস্তব উদাহরণ দিয়ে পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, সেখানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীসহ ৩৯৫ জনকে আসামি করা হলেও মুক্তবাংলা শপিং কমপ্লেক্সের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আফরোজ উদ্দিনকে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে। মামলার রিকশাচালক বাদী আশরাফ আলী নিজেই পরবর্তীতে স্বীকার করেছেন যে, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার চাপে ও আর্থিক প্রলোভনে পড়ে তিনি না দেখেই থানায় প্রস্তুত করা আসামির তালিকায় সই করেছিলেন এবং তিনি আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে এই নির্দোষ মানুষদের বাঁচাতে চান।
তদন্তের এই নাজুক পরিস্থিতির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জুলাই অভ্যুত্থানের মামলাগুলোর কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, শুরুতে বৈশ্বিক ও দেশীয় মানবাধিকার সংস্থা এবং ছাত্র নেতারা তদন্তে তথ্য দিয়ে সাহায্য করলেও, এখন অনেকেই আর কথা বলতে চান না। ফলে মাঠপর্যায়ে নিরপেক্ষ ও অকাট্য সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা চরম কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, মানবাধিকারকর্মী নূর খানের মতে, ৫ আগস্টের আগে ও পরে হাসপাতালগুলোতে গুরুতর আহত ও নিহতদের তথ্য সংরক্ষণে চরম জালিয়াতি করা হয়েছিল। তৎকালীন দলীয় লোক ও গোয়েন্দাদের প্রভাবে ঢাকা মেডিকেলসহ বিভিন্ন হাসপাতালে আহতদের সঠিক চিকিৎসায় বাধা দেওয়া হয়েছিল এবং বহু লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে চিকিৎসাজনিত সমস্ত সরকারি রেকর্ড ও আঙুলের ছাপ নষ্ট করে ফেলা হয়েছে, যা বর্তমান তদন্তকারীদের অন্ধকারের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
এই আইনগত অচলাবস্থার সমান্তরালে, গণ-অভ্যুত্থানের পর পুনর্গঠিত হওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ৬টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। ১৯ মাসের বিচারিক কার্যক্রমে দুটি ট্রাইব্যুনাল থেকে মোট ৬১ জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ১১ জন সাবেক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। তবে রায় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দণ্ডপ্রাপ্ত ৬১ জনের মধ্যে ৪০ জনই বর্তমানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ফাঁকি দিয়ে পলাতক রয়েছেন এবং মাত্র ২১ জন কারাগারে আছেন। পলাতকদের মধ্যে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান ও যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তীর মতো প্রভাবশালী কর্মকর্তারা রয়েছেন। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো। আবদুল কাইয়ুম বলেন, ঢালাও মামলার মাধ্যমে নির্দোষদের হয়রানি বন্ধ করতে হলে অবিলম্বে প্রতিটি জেলায় বিশেষ তদারকি কমিটি গঠন করে সময় বেঁধে দিয়ে তদন্ত শেষ করতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কেবল শক্ত প্রমাণের ভিত্তিতেই পুলিশি প্রতিবেদন দাখিলের আইনি স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
তথ্যসূত্র: প্রধম আলো