• সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৬ পূর্বাহ্ন
Headline
যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে রুশ ভিন্নমতাবলম্বীকে হত্যার ছক: উন্মোচিত হলো পুতিনের গুপ্তচরদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ২০৩০ সালের মধ্যে ১০৬.৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য সরকারের নিখোঁজ শিশুর লাশ মিলল সীমান্তের ওপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন কতজন, তালিকায় যারা জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান জাতিসংঘে নতুন সরকারের বার্তা দেবেন তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী কাল নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন সরকার স্টার্টআপ, উদ্যোক্তা তৈরি ও উদ্ভাবনে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে : জনপ্রশাসন উপদেষ্টা বাংলাদেশ সফরে আগ্রহী চীনা কমিউনিস্ট পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা: রাষ্ট্রদূত মাকসুদ কামাল-জাফর ইকবালসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

নতুন পে-স্কেল: বেতন বাড়ছে, দুর্নীতি কমবে কি?

Reporter Name / ২৯ Time View
Update : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনা ও প্রতীক্ষার পর অবশেষে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল কাঙ্ক্ষিত ‘জাতীয় পে-স্কেল-২০২৬’ মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছে| এই নতুন ও যুগান্তকারী বেতন কাঠামোর ফলে দেশের প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মূল বেতন এক লাফে ১০০ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে| একই সঙ্গে দেশের প্রায় ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত বা পেনশনভোগীও এই বিশাল আর্থিক সুবিধার আওতাভুক্ত হচ্ছেন| নতুন অনুমোদিত প্রস্তাবনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রথম গ্রেড থেকে শুরু করে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মরতদের প্রারম্ভিক মূল বেতন ঠিক ১০০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে| অন্যদিকে, নিম্ন স্তরের অর্থাৎ ১২তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন ১১৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে| টাকার অঙ্কে হিসাব করলে, ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর সর্বনিম্ন মূল বেতন বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকায় উন্নীত হবে| একইভাবে, প্রথম গ্রেডের বা সচিব পর্যায়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকায় দাঁড়াবে| বিশাল এই আর্থিক সুবিধা একযোগে না দিয়ে পর্যায়ক্রমে মোট চারটি ধাপে বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার| তবে এই নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে প্রতি বছর সরকারের কোষাগার থেকে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে|
বেতন ও ভাতা খাতে সরকারের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের একটি বড় যৌক্তিকতা হিসেবে সরকারি চাকরিতে দুর্নীতি কমার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল| অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ১২ জুন রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এমন ইঙ্গিতই দিয়েছিলেন| তিনি আশা প্রকাশ করে বলেছিলেন যে, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হলে এবং তাদের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত হলে স্বাভাবিকভাবেই দুর্নীতি কমে আসবে| কিন্তু অর্থমন্ত্রীর এই সরল আশাবাদের সঙ্গে একমত হতে পারছেন না দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা| তাদের মতে, কেবল বেতন বাড়িয়ে কোনো দিনই দুর্নীতি কমানো সম্ভব নয়; এর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সিস্টেম, ব্যক্তিগত মানসিকতা এবং কঠোর জবাবদিহির বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত| অতীতেও বহুবার সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু দুর্নীতি কমার কোনো ইতিবাচক আলামত কখনো দেখা যায়নি|
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুহিন হোসেন প্রিন্স মনে করেন, সিস্টেমের দুর্বলতার কারণেই মূলত দুর্নীতি ডালপালা মেলে| তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত এই ঘুণে ধরা সিস্টেমের আমূল পরিবর্তন না হচ্ছে, ততক্ষণ দুর্নীতি চলতেই থাকবে| তার মতে, দুর্নীতিবাজরা নিচতলা থেকে ওপরতলা পর্যন্ত অত্যন্ত সুসমন্বিতভাবে দুর্নীতির ভাগাভাগি করে থাকে এবং সমাজের একটি বড় অংশও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে| রুহিন হোসেন প্রিন্স আরও একটি ভয়াবহ আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন| অতীতে দেখা গেছে, বেতন বাড়লে সরকারি কর্মচারীদের নিজেদের ‘দামি’ বা ‘উচ্চশ্রেণির’ ভাবার প্রবণতা তৈরি হয়, যার ফলে ঘুস বা দুর্নীতির ‘রেট’ বা হার উল্টো আরও বেড়ে যায়| তবে তিনি স্বীকার করেন যে, প্রশাসনে থাকা সৎ ও ভালো মানুষদের জন্য এই বেতন বৃদ্ধি অবশ্যই একটি স্বস্তির খবর| কিন্তু যাদের মজ্জায় মজ্জায় দুর্নীতি মিশে আছে, এই বিশাল বেতন বৃদ্ধি তাদের মোটেও শোধরাতে পারবে না| এছাড়া তিনি দেশের বিশাল সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, দেশের মোট কর্মজীবীর প্রায় ৯০ শতাংশই সরকারি কাঠামোর বাইরে কাজ করেন| তাদের জন্য আজও কোনো জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা ও বাস্তবায়ন হয়নি, উল্টো অনেকে কর্মহীন হয়ে পড়ছেন| তাই দুর্নীতি কমাতে হলে বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অভিযান পরিচালনা এবং সরকারি কর্মচারীদের কাজের ওপর নিবিড় নজরদারি বাড়ানো অত্যাবশ্যক বলে তিনি মনে করেন|
সরকারি খাতে দুর্নীতি রোধে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)| সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ডক্টর ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, দুর্নীতিমুক্ত সেবা পেতে হলে সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে বেতনের সামঞ্জস্য থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন| তবে জনগণের কষ্টের করের টাকায় তাদের এই বিশাল বেতন বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল পেতে হলে অবশ্যই একটি কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া উচিত| আর সেটি হলো, সব পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের আয়-ব্যয় ও সম্পদের হিসাব প্রতি বছর বাধ্যতামূলকভাবে হালনাগাদ করে প্রকাশ করা| টিআইবির প্রস্তাব অনুযায়ী, যারা স্বচ্ছতার সঙ্গে নিজেদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করবেন, কেবল তাদের ক্ষেত্রেই এই নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়া উচিত| যারা এটি মানবেন না, তাদের এই সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করতে হবে| ডক্টর ইফতেখারুজ্জামানের মতে, দুর্নীতিবাজদের অবৈধ সম্পদের লোভ এতটাই গগনচুম্বী যে, কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত না করে ঢালাওভাবে বেতন বাড়ানো হলে দুর্নীতির মাত্রা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে| ২০১৫ সালে অষ্টম পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল; বেতন বাড়ার বিপরীতে সেবার মান না বেড়ে উল্টো সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও ঘুসের ব্যাপকতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল| তাই সম্পদবিবরণী প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত না করলে এই দুষ্টচক্র থেকে সাধারণ জনগণের কোনোভাবেই পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় নেই|
দুর্নীতির সঙ্গে আর্থিক অনটনের চেয়ে মানসিকতার সম্পর্কই যে অনেক বেশি, তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল| তার মতে, বাংলাদেশে হাজার হাজার কোটি টাকার বড় বড় দুর্নীতি সাধারণত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা সচিবরাই করে থাকেন, সাধারণ পিয়নরা নয়| তাই বেতন বাড়িয়ে এই মজ্জাগত মানসিকতার কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়| তিনি আরও একটি রূঢ় বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে বলেন, দেশে যদি ১৫ লাখ সরকারি চাকরিজীবী থাকেন, তবে বেসরকারি খাতে কর্মরত আছেন অন্তত ৩০ লাখ মানুষ| সরকারি খাতে বেতন বাড়ার কারণে বাজারে যে মূল্যস্ফীতি বা জিনিসপত্রের দামের ঊর্ধ্বগতি তৈরি হবে, তার নির্মম শিকার হবেন এই বিপুল সংখ্যক বেসরকারি চাকরিজীবী| অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া চাপ এবং সরকারি কর্মচারীদের সন্তুষ্ট রাখার রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই বর্তমান সরকার বাধ্য হয়ে এই পে-স্কেল ঘোষণা করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন|
অন্যদিকে, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বিষয়টি নিয়ে আরও কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন| তিনি মনে করেন, দুর্নীতি আমাদের নীতি ও জিনগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে| তাই বেতন যতই বাড়ানো হোক না কেন, দুর্নীতি কমার কোনো অলৌকিক সম্ভাবনা নেই| এই দুরারোগ্য ব্যাধি দূর করতে হলে সারা দেশে ঐক্যবদ্ধভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন| একই সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি রাখা এবং দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি| লঘু শাস্তির কারণে দুর্নীতিবাজরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে উল্লেখ করে তিনি সরকারের প্রতি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্যিকার অর্থে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণের জোর আহ্বান জানান| পরিশেষে এটি বলাই বাহুল্য যে, বেতন বৃদ্ধি হয়তো সৎ কর্মচারীদের জন্য একটি ন্যায্য প্রাপ্তি, কিন্তু রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা ছাড়া কেবল টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে দুর্নীতির মতো বিষবৃক্ষকে সমূলে উৎপাটন করা কখনোই সম্ভব নয়|
এই পুনর্লিখিত প্রতিবেদনটি আপনার খবরের ওয়েবসাইটের জন্য কেমন হয়েছে, তা জানাতে পারেন|
তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category