• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২২ অপরাহ্ন
Headline
এনসিটিবির উপসচিব-সদস্যসহ আরও ৪ কর্মকর্তাকে বদলি তাহসিফের মৃত্যুতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতি রয়েছে: জামায়াত সশস্ত্র বাহিনী বোর্ডের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন ফি ১৬৮ টাকা রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ শুরু খাদ্যশস্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে: খাদ্যমন্ত্রী মানবতাবিরোধী অপরাধে হানিফের মৃত্যুদণ্ড, অপর তিন আসামির আমৃত্যু কারাদণ্ড চার বছরে ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষক কার্ড দেবে সরকার জাপানে টয়োটার মোতোমাচি কারখানা পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী কারিগরি ত্রুটিতে টোকিও থেকে ঢাকাগামী প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে বিলম্ব বিচার ব্যবস্থাকে মানুষের আস্থার জায়গায় আরও সুদৃঢ় করতে চাই: আইনমন্ত্রী

নয় মাসে ১০৯ মাদ্রাসা শিক্ষার্থী নির্যাতন

Reporter Name / ২ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬

দেশের কোমলমতি শিশু ও কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের, ঠিক সেখানেই কীভাবে একের পর এক মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো পৈশাচিক ঘটনা ঘটে চলেছে, তার এক ভয়াবহ ও লোমহর্ষক চিত্র উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সাম্প্রতিক গবেষণায় | ফ্রান্সভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ‘জাস্টিস মেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স’ বা জেএমবিএফের প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শত শত শিশু চরম যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে | ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিকতার পাঠ দেওয়ার আড়ালে গড়ে ওঠা এই অন্ধকার জগতটি কেবল শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকেই ধ্বংস করছে না, বরং পুরো জাতির অভিভাবকত্বকেও মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে | দেশ ও বিদেশের বাহাত্তরটি বিভিন্ন জাতীয়, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের যাচাইকৃত তথ্য এবং সংগৃহীত রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে এই প্রামাণ্য প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে, যা আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর গভীর ক্ষতের দিকটি অত্যন্ত জোরালোভাবে উন্মোচন করেছে |

প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে যে ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, তা যেকোনো সংবেদনশীল মানুষকে আতঙ্কিত করার জন্য যথেষ্ট | চলতি বছরের প্রথম নয় মাসের সামগ্রিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, সারা দেশে ছেলেশিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের মোট একশত একত্রিশটি সুনির্দিষ্ট ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে, যার নেপথ্যে জড়িত ছিল একশত ছাপ্পান্ন জন অভিযুক্ত ব্যক্তি | এসব ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভুক্তভোগী হয়েছে মোট একশত একাত্তর জন অবুঝ ছেলেশিশু | এর মধ্যে কেবল ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের ঘটনা ঘটেছে একশত বাইশটি, যার শিকার হয়েছে একশত একষট্টি জন শিশু | বাকি নয়টি ঘটনায় অন্তত দশজন শিশুকে জোরপূর্বক ধর্ষণচেষ্টার শিকার হতে হয়েছে | এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, বরং এর প্রতিটি অংকের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে একেকটি শিশুর তছনছ হয়ে যাওয়া শৈশব, যা সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট হওয়ার কথা ছিল |

সাধারণ স্কুল বা অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় আবাসিক ও অনাবাসিক মাদ্রাসার পরিবেশ যে শিশুদের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তা প্রতিবেদনের তুলনামূলক চিত্রে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে | সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী, মোট চুরাশিটি ঘটনায় একশত বাইশ জন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে, যেখানে স্কুল বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটি ছিল আটত্রিশটি ঘটনায় চল্লিশ জন শিক্ষার্থী | আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, কেবল মাদ্রাসার অভ্যন্তরেই বাহাত্তরটি পৈশাচিক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে নির্যাতনের শিকার হয়েছে মোট একশ নয় জন শিক্ষার্থী | সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিশুদের সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব যাদের কাঁধে ন্যস্ত, সেই শিক্ষকরাই এই হিংস্রতার প্রধান কুশীলব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন | ৬৫টি আলাদা ঘটনায় অন্তত ৮১ জন মাদ্রাসা শিক্ষক এসব ন্যক্কারজনক ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় সরাসরি অভিযুক্ত হয়েছেন, যা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর পবিত্র সম্পর্ককে চিরতরে কলুষিত করেছে |

অভিযুক্ত লম্পট ও অপরাধীরা শিশুদের ওপর নির্যাতন চালাতে অত্যন্ত সুকৌশলে বিভিন্ন ভয়ভীতি ও প্রলোভনের আশ্রয় নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে | গভীর রাতে ঘুম থেকে ডেকে তোলা, নিরিবিলিতে আলাদা কক্ষে নিয়ে যাওয়া, খাবার বা নগদ অর্থের লোভ দেখানো, এমনকি কাউকে কিছু বললে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া বা আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বছরের পর বছর ধরে এই অপকর্ম চালিয়ে যাওয়া হয়েছে | সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা সাহস করে মাদ্রাসার সুপার বা পরিচালনা কমিটিকে অভিযোগ জানানোর পরও কোনো ধরনের প্রতিকার পাওয়া যায়নি | উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে হুমকি দিয়ে মুখ বন্ধ রাখার জন্য বাধ্য করা হয়েছে, স্থানীয়ভাবে সালিশ বা অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে খোদ প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষই অভিযুক্ত শিক্ষককে পালিয়ে যেতে গোপনে সহায়তা করেছে |

এই অপরাধের পরিধি কেবল আকস্মিক কিছু ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা দীর্ঘমেয়াদি ও সুপরিকল্পিত নির্যাতনের রূপ নিয়েছিল | জেএমবিএফের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত তেতাল্লিশটি ঘটনায় সাতাত্তর জন শিশুকে দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিতভাবে শারীরিক ও মানসিক শোষণের শিকার হতে হয়েছে | এই দীর্ঘমেয়াদি পৈশাচিকতার কারণে শিশুদের শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি তাদের মানসিক অবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে | সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ বলছে, এই সহিংসতাগুলোর মধ্যে তিনটি আলাদা ঘটনায় তিনজন দুর্ভাগ্য শিশু অতিরিক্ত নির্যাতন ও ট্রমার শিকার হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে | এছাড়া একত্রিশটি ঘটনায় অন্তত পঁয়তাল্লিশ জন ভুক্তভোগী শিশুকে মারাত্মকভাবে শারীরিক আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে, যা এসব প্রতিষ্ঠানের ভেতরের আইনি ও প্রশাসনিক শূন্যতার ভয়ংকর রূপটিকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে |

আইনি সহায়তা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতার চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এসব ঘটনার বড় একটি অংশ আড়ালেই থেকে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে | মোট একশ সতেরোটি ঘটনার ক্ষেত্রে একশ উনচল্লিশ জন ভুক্তভোগীর পরিবার পুলিশের দ্বারস্থ হয়ে মামলা বা সাধারণ ডায়েরি করতে বাধ্য হলেও, চৌদ্দটি ঘটনায় প্রায় বত্রিশ জন শিশুর ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আইনি পদক্ষেপ বা মামলা পর্যন্ত দায়ের করা হয়নি | যদিও পুলিশ প্রশাসন একশ একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রায় একশ উনিশ জন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে, তবুও মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন যে, এটি মূলত হিমশৈলের চূড়ামাত্র | সামাজিক লজ্জা, অপরাধীদের প্রভাবশালী অবস্থান এবং প্রতিষ্ঠানের মান রক্ষার্থে ধামাচাপা দেওয়া হাজার হাজার ঘটনা আজও আলোর মুখ দেখেনি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির আড়ালে ঢাকা পড়ে রয়েছে |

পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে জেএমবিএফের পক্ষ থেকে শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও জরুরি দাবি উত্থাপন করা হয়েছে | প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে কালবিলম্ব না করে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকরী তদন্ত পরিচালনা করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে | একই সঙ্গে ভুক্তভোগী শিশু ও তাদের পরিবারগুলোর জীবন ও নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত করা, গণমাধ্যম বা তদন্তে শিশুদের নাম, ছবি, ঠিকানা কিংবা কোনো ধরনের শনাক্তকারী তথ্য প্রকাশ না করার জন্য কঠোর নির্দেশনা জারির কথা বলা হয়েছে | বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ এবং সাক্ষীদের সুরক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বা মুখ খুলতে গিয়ে কোনো ধরনের বাধার সম্মুখীন না হয় |

শিশুদের পুনর্বাসন ও আইনি সহায়তার পরিধি বাড়াতে শিশুবান্ধব চিকিৎসা পরীক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা কাটাতে মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং, বিনামূল্যে আইনি সহায়তা এবং তাদের শিক্ষা কার্যক্রম যেকোনো মূল্যে অব্যাহত রাখার সুযোগ করে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে | বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য অতিরিক্ত ও সহজলভ্য সহায়তা ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে | মাদ্রাসা, এতিমখানা এবং অন্যান্য আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কঠোর শিশু সুরক্ষা নীতি প্রণয়ন, কর্মচারীদের জন্য স্পষ্ট আচরণবিধি তৈরি এবং স্বাধীন অভিযোগ বাক্স চালুর সুপারিশ করা হয়েছে | অভিভাবকবৃন্দের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি জোরদার না করলে এই ধরনের অপরাধ থামানো অসম্ভব হয়ে পড়বে |

বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের উদ্যোগে অনানুষ্ঠানিক সালিশ বসানো, অর্থের বিনিময়ে অপরাধ ধামাচাপা দেওয়া কিংবা লম্পট শিক্ষকদের কেবল পদত্যাগের মাধ্যমে মুক্তি দেওয়ার সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে হবে | কোনো অবস্থাতেই যেন ভুক্তভোগী শিশুদের ওপর আপস করার জন্য বা জবানবন্দি বদলানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করা না হয় | নাবালক বা বয়সে তরুণ অভিযুক্তদের বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে কঠোরভাবে শিশুবান্ধব বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে এবং তাদের পরিচয় গোপন রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে | এছাড়া রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থাকে শিশুদের ওপর সংঘটিত অপরাধের সঠিক পরিসংখ্যান নিয়মিতভাবে প্রকাশ করার পাশাপাশি দ্বৈত রিপোর্টিং রোধ করার জন্য আধুনিক ডেটাবেজ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে |

পরিশেষে বলা যায়, ধর্মীয় শিক্ষার এই পবিত্র অঙ্গনগুলো আজ যেভাবে অপরাধের আখড়ায় পরিণত হচ্ছে, তা রোধ করতে না পারলে আমাদের সামাজিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে পড়বে | জেএমবিএফের এই প্রতিবেদনটি আমাদের তথাকথিত সমাজ ব্যবস্থার মুখে এক বিশাল চপেটাঘাতের মতো কাজ করেছে | কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু গ্রেপ্তার বা দায়সারা বিবৃতি দিয়ে এই গভীর সংকটের সমাধান করা সম্ভব নয় | রাষ্ট্রযন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদ এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগে অবিলম্বে একটি কঠোর ও সুরক্ষামূলক বলয় গড়ে তুলতে হবে | তবেই কেবল আমাদের আগামী প্রজন্ম এই পৈশাচিক কোপান্ন থেকে মুক্তি পাবে এবং শিক্ষাঙ্গনগুলো সত্যিকারের মানুষ গড়ার কারখানায় রূপ নিতে পারবে |

তথ্যসূত্র: বাংলা স্ট্রিম


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category