• বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৫ অপরাহ্ন

নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা নেই: ঠিকাদারের অর্থে ফের বিদেশ ভ্রমণে সরকারি কর্মকর্তারা

Reporter Name / ৩ Time View
Update : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট এবং বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে সরকার বেশ কিছুদিন ধরেই ব্যয় সংকোচনের কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে। সরকারি অর্থের অপচয় রোধ এবং প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের যথেচ্ছ বিদেশ ভ্রমণের ওপর বারবার লাগাম টানার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষ করে, কোনো সরঞ্জাম সরবরাহকারী বা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের বিষয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও অর্থ বিভাগের সুস্পষ্ট ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত বিস্ময়কর ও হতাশাজনক বিষয় হলো, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এসব বিধিনিষেধ ও পরিপত্রকে কার্যত বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একশ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা এখনো ঠিকাদারের টাকায় প্রমোদভ্রমণে মেতে আছেন। সরকারি আদেশের সরাসরি বরখেলাপ করে কেবল গত কয়েক দিনেই অন্তত আটজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পূর্ণ খরচে চীন ভ্রমণের সরকারি অনুমোদন বা জিও (গভর্নমেন্ট অর্ডার) বাগিয়ে নিয়েছেন। দরপত্রের শর্তাবলির ধুয়া তুলে তারা এই অনৈতিক সুবিধাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করলেও, দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ও সাবেক শীর্ষ আমলারা একে সরাসরি ‘স্বার্থের সংঘাত’ এবং সরকারি ক্রয়নীতির চরম লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
সরকারি পর্যায়ে বিদেশ ভ্রমণের লাগাম টানতে গত কয়েক বছরে দফায় দফায় নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই সরকারি কর্মচারীদের বিদেশ সফর নিরুৎসাহিত করতে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে তিন দফায় কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর জারি করা প্রথম নির্দেশনায় অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থ ছাড়া যেকোনো ধরনের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এরপর ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ জারি করা অপর এক পরিপত্রে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয় যে, ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে বিদেশ ভ্রমণ কোনোভাবেই করা যাবে না এবং তা অবশ্যই পরিহার করতে হবে। পরবর্তীতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও এই ব্যয় সংকোচনের নীতি অব্যাহত থাকে। গত ৩০ এপ্রিল অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সচিব ও সমপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আকাশপথে ভ্রমণের ক্ষেত্রে এক্সিকিউটিভ বা বিজনেস ক্লাসের পরিবর্তে সুলভ শ্রেণি বা ইকোনমি ক্লাস ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। সর্বশেষ গত ৮ জুলাই অর্থ বিভাগের জারি করা পরিপত্রে সরকারি অর্থায়নে সব ধরনের বৈদেশিক প্রশিক্ষণ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেখানে প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন (পিএসআই) এবং ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপটেন্স টেস্টের (এফএটি) ক্ষেত্রে কেবল কারিগরি সনদপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞদের পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব নির্দেশনার কোনোটিই মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
সর্বশেষ নিয়ম লঙ্ঘনের একটি বড় প্রমাণ পাওয়া যায় গত ৬ সেপ্টেম্বর জারি করা একটি সরকারি আদেশে। স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. রবিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই আদেশে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) চারজন কর্মকর্তাকে পাঁচ দিনের জন্য চীন ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হয়। তাদের এই সফরের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে, তারা দুটি চেইন ডোজার বা ক্রলার বুলডোজার পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ক প্রশিক্ষণে অংশ নেবেন। আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদের এই ভ্রমণকে দায়িত্বের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং এই সফরের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করবে চেইন ডোজার সরবরাহকারী দেশীয় প্রতিষ্ঠান ‘সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড’। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, বুলডোজার চালানোর মতো একটি সম্পূর্ণ কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য যাদের মনোনীত করা হয়েছে, তাদের অনেকের সঙ্গেই এই কাজের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। এই দলে রয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম ফয়সাল এবং ডিএনসিসির প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. বরকত হায়াত। তাদের পাশাপাশি রয়েছেন ডিএনসিসির যান্ত্রিক সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী মাকসূদ আলম এবং সহকারী প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুল ইসলাম। ঠিকাদারের খরচে এমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিদেশ ভ্রমণের বিষয়ে মন্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মাকসূদ আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রশ্নটি শোনামাত্রই তড়িঘড়ি করে ফোন কেটে দেন এবং পরবর্তীতে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার দিক থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ঠিকাদারের অর্থে বিদেশ সফরের আরেকটি সমান্তরাল ঘটনা ঘটেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ক্ষেত্রে। এই অধিদপ্তরের অধীনে বর্তমানে ১০টি অগ্রাধিকারভিত্তিক শহরে সমন্বিত স্যানিটেশন ও হাইজিন বা সমন্বিত কঠিন ও মানব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শীর্ষক একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৫৯ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের জন্য কেনা একটি নির্দিষ্ট ডিসচার্জিং সরঞ্জামের পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রশিক্ষণে অংশ নিতে আগামী ২০ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর চীন ভ্রমণের অনুমোদন পেয়েছেন আরও চারজন সরকারি কর্মকর্তা। গত ৯ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব ড. আশফিকুন নাহার স্বাক্ষরিত আদেশে এই সফরের অনুমোদন দেওয়া হয়। এই দলে রয়েছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. আনোয়ার ইমাম, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক এস এম শামীম আহমেদ, নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ছামিউল হক এবং মো. শামীম আনোয়ার। এই আদেশেও অবিকল আগেরটির মতোই বলা হয়েছে যে, এই ভ্রমণের সব ধরনের ব্যয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘গ্রীন ডট লিমিটেড’ বহন করবে। এই সফরের বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. আনোয়ার ইমামের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি পুরো দায় এড়িয়ে গিয়ে বলেন যে, মন্ত্রণালয়ের উপযুক্ত প্রতিনিধি হিসেবে তাকে শুধু মনোনীত করা হয়েছে, এর বাইরে তিনি কিছু জানেন না। বিস্তারিত জানতে তিনি প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
পরবর্তীতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক এস এম শামীম আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই অনৈতিক যাত্রার পক্ষে এক অদ্ভুত আমলাতান্ত্রিক যুক্তি দাঁড় করান। তিনি দাবি করেন যে, গ্রীন ডট লিমিটেড প্রকল্পের একটি নির্দিষ্ট ডিসচার্জিং ইকুইপমেন্টের সরবরাহকারী এবং টেন্ডার ডকুমেন্ট বা দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী এই যন্ত্রপাতির অপারেশন ও মেইনটেন্যান্সের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট যাবতীয় ব্যয় সরবরাহকারীকেই বহন করতে হবে। তাঁর মতে, যেহেতু এটি দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্প এবং চুক্তির টার্মস অব রেফারেন্সে এটি সাপ্লায়ারের নিজস্ব ব্যয় হিসেবে নির্ধারিত রয়েছে, সেহেতু কর্মকর্তাদের উৎপাদনকারী দেশে নিয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার খরচের জন্য সরকারকে আলাদা কোনো অর্থ দিতে হচ্ছে না। কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই যুক্তিটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কারণ, দরপত্রের কোনো শর্তই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা অর্থ বিভাগের জারি করা সুস্পষ্ট ও সর্বজনীন নিষেধাজ্ঞার ঊর্ধ্বে হতে পারে না। তাছাড়া সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত এই ভ্রমণের খরচ তাদের দেওয়া যন্ত্রপাতির বিলের সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে সমন্বয় করে নেয়, যা চূড়ান্ত বিচারে রাষ্ট্রেরই আর্থিক ক্ষতি।
সরকারি দপ্তরগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের খরচে বিদেশ ভ্রমণের এই অপসংস্কৃতি একদিনে গড়ে ওঠেনি, বরং এটি দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। উদাহরণস্বরূপ, সরকারি বিভিন্ন সংস্থায় সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের অর্থায়নে গত বছরের নভেম্বরেও হুইল ডোজার পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন তিনজন সরকারি কর্মকর্তা। তারা হলেন ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের সচিব সুমনা আল মজিদ, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মো. ফিরোজ মাহমুদ এবং একটি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম মিয়া। এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাঁচটি চেইন ডোজার কেনার আগে একইভাবে চীন ভ্রমণের অনুমোদন পেয়েছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তিন কর্মকর্তা। সেবার তাদের ভ্রমণের সমস্ত ব্যয় বহন করেছিল উৎপাদক প্রতিষ্ঠান সিনোওয়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোম্পানি লিমিটেড ও এইচটিএমএস। এছাড়া চলতি বছরের জুলাই মাসেও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইফাদ ও নেদারল্যান্ডস সরকারের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন একটি পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের অধীনে এলজিইডি এবং মন্ত্রণালয়ের ছয় কর্মকর্তা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স সরকার কবীর আহমেদের অর্থায়নে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছিলেন। গত বছর মোবাইল টয়লেট, স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্টের যন্ত্রপাতি, স্ক্র্যাপার ব্রিজ ক্রয়সহ নানা উদ্ভট কারণে কর্মকর্তাদের বিদেশে যাওয়ার ছড়াছড়ি ছিল। জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে কয়েক মাস এই প্রবণতা কিছুটা স্তিমিত থাকলেও বর্তমানে তা আবার ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের এ ধরনের বিদেশ ভ্রমণের লাগামহীন প্রবণতা এবং এর পেছনের অনৈতিক দিকগুলো নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্লেষক ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনকর্মীরা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিষয়টিকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, এ ধরনের বিদেশ সফর শুধু যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশের সরাসরি বরখেলাপ তা-ই নয়; বরং এটি পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অযাচিত আনুগত্য এবং অনৈতিক ও লোভাতুর ব্যক্তিগত সুবিধা ভোগের একটি অত্যন্ত নিকৃষ্ট উদাহরণ। তাঁর মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন ঠিকাদারের টাকায় প্রমোদভ্রমণে যান, তখন তিনি সেই ভেন্ডরের প্রতি একধরনের অসম্মানজনক অনুরাগের বশবর্তী হয়ে পড়েন। এই অনুকম্পা গ্রহণ করা সামগ্রিকভাবে সরকার ও দেশের জন্য চরম মানহানিকর এবং এটি সরকারি ক্রয়নীতি লঙ্ঘনের জন্য একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সাবেক অর্থ সচিব এবং দেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বিষয়টিকে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলেন, এখানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সরকারি কর্মকর্তাদের পেছনে অর্থায়ন করছে, যার সোজা অর্থ হলো তারা এখানে একধরনের বিনিয়োগ করছে। ব্যবসায়ীরা কোনো বিনিয়োগই বিনা লাভে করেন না। এ ক্ষেত্রে সরাসরি স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার শতভাগ সম্ভাবনা থাকে। একটি কোম্পানির টাকায় বিদেশ ঘুরে আসার পর সেই কোম্পানির সরবরাহ করা পণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার নৈতিক সাহস আর ওই কর্মকর্তার থাকে না। ফলে ঠিকাদার যদি নিম্নমানের পণ্যও সরবরাহ করে, তবু তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না এবং এর মাধ্যমে রাষ্ট্র কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এছাড়া বিদ্যমান সরকারি নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর থাকা অবস্থায় এ ধরনের ভ্রমণের আদেশ জারি করা কোনোভাবেই সমীচীন হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সামগ্রিক এই হতাশাজনক পরিস্থিতির বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি অনেকটা দায়সারা ও প্রথাগত মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা রয়েছে এবং সেই নির্দেশনা অনুযায়ীই রাষ্ট্র পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর এই আশ্বাসের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা অমান্য করে কীভাবে মাসের পর মাস ঠিকাদারের অর্থে সরকারি আদেশ বা জিও জারি হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর কারও কাছেই নেই। বিষয়টির গভীরে গিয়ে বক্তব্য জানার জন্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসানের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কেউই এ বিষয়ে কোনো সাড়া দেননি। তাদের এই নীরবতা পুরো প্রক্রিয়াটির অস্বচ্ছতাকে আরও ঘনীভূত করেছে এবং সরকারি প্রশাসনে সুশাসন প্রতিষ্ঠার দাবিকে একটি বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category