• শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৪ অপরাহ্ন
Headline
উন্নয়নের মরীচিকা ও মেগা প্রকল্পের ফাঁদ: প্রতিশ্রুতির আড়ালে একই খাদের কিনারে অর্থনীতি মোংলা বন্দর ঘুরে দেখলেন প্রধানমন্ত্রী আমি শোকর করি, কারণ… রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আগুন, ৪০ রোগী আহত পিএইচপির ত্রুটি: ঝুঁকিতে লাখো ওয়েবসাইট, বিশ্বজুড়ে সাইবার সতর্কতা ধেয়ে আসছে সুপার টাইফুন, ঘণ্টায় গতিবেগ ২২৭ কিলোমিটার ৫৯২ কোটি টাকায় দুই কূপ খনন, জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ‘বিপুল গ্যাস’ প্রধানমন্ত্রীর সফরে টোকিওতে থাকবেন না রাষ্ট্রদূত, সমন্বয়ে পররাষ্ট্রসচিব রূপগঞ্জে ট্রাকের ধাক্কায় অটোরিকশার দুই যাত্রী নিহত, আহত ৩ ৭ দল নিয়ে ‘সমমনা ইসলামী দল’ ঘোষণা, একসঙ্গে চলার অঙ্গীকার

নীতি প্রণয়নে নির্ভুল ও হালনাগাদ তথ্যের অপরিহার্যতা

Reporter Name / ৬ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬

যেকোনো রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন, জনকল্যাণমুখী সংস্কার এবং কার্যকর নীতি প্রণয়নের মূল ভিত্তি হলো নির্ভুল, নিরপেক্ষ ও হালনাগাদ পরিসংখ্যান। সঠিক তথ্য ছাড়া প্রণীত কোনো নীতি বা উন্নয়ন পরিকল্পনা কখনোই কাঙ্ক্ষিত সুফল বয়ে আনতে পারে না। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া মারাত্মক তথ্যঘাটতি ও পরিসংখ্যানগত অস্পষ্টতার মুখে ধুঁকছে। বিশেষ করে জাতীয় পরিসংখ্যানের প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসের সক্ষমতাহীনতা এবং জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ জরিপগুলো বছরের পর বছর বন্ধ হয়ে থাকা এই সংকটকে চরম আকার দিয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থায়ন এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতির অজুহাত দেখিয়ে দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান ও জনসংখ্যার মতো মৌলিক ভিত্তিসূচক জরিপগুলো স্থগিত রাখা হয়েছে। এর ফলে নীতিনির্ধারকেরা এখন মাঠপর্যায়ের বাস্তব তথ্য ছাড়াই কার্যত অন্ধকারে হাতড়ে জাতীয় পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছেন। তথ্যের এই শূন্যতা রাষ্ট্র পরিচালনা ও উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করা যায় বিবিএসের স্থবির হয়ে পড়া সাম্প্রতিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে। দেশের মানুষের জীবনযাত্রার প্রকৃত মান ও আর্থসামাজিক অবস্থার মূল মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত তিনটি প্রধান জরিপ—খানা আয় ও ব্যয় জরিপ, শ্রমশক্তি জরিপ এবং বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। সর্বশেষ দারিদ্র্য পরিস্থিতি মূল্যায়নে ব্যবহৃত খানা আয় ও ব্যয় জরিপ সম্পন্ন হয়েছিল ২০২২ সালে। শ্রমশক্তি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম ২০২৪ সাল থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে। অন্যদিকে প্রায় ১৬০টি গুরুত্বপূর্ণ আর্থসামাজিক সূচক নিয়ে গঠিত স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকসের সর্বশেষ হালনাগাদ সংস্করণটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০২৩ সালে। ফলে দেশে বর্তমানে দারিদ্র্যের প্রকৃত হার কত, কর্মহীন মানুষের সঠিক সংখ্যা কেমন কিংবা জন্ম-মৃত্যু ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির আসল রূপ কী—তার কোনো নির্ভরযোগ্য ও সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য নীতিনির্ধারকদের হাতে নেই।

তথ্যের এই মারাত্মক ঘাটতির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সরকারের সাম্প্রতিক নীতিনির্ধারণী উদ্যোগে। গত আগস্টে প্রকাশিত অর্থনৈতিক সংস্কার ও উন্নয়নের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামোর পর্যালোচনাতেই এর স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। পাঁচটি মূল স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে দেশকে অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা থেকে একটি স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কল্যাণ রাষ্ট্রে রূপান্তরের যে মহৎ লক্ষ্যমাত্রা এতে নির্ধারণ করা হয়েছে, তা দাঁড়িয়ে আছে বহু পুরোনো জরিপ এবং অত্যন্ত বিতর্কিত এক বেকারত্ব সূচকের ওপর। বাস্তব তথ্য ছাড়া সেকেলে অনুমানের ওপর নির্ভর করে এমন একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা প্রণয়ন করায় এর চূড়ান্ত বাস্তবায়ন শুরুতেই বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর ভর করে নেওয়া জাতীয় কৌশল কখনোই তার উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না।

তথ্যের অভাবের পাশাপাশি বিবিএসের প্রকাশিত তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞ মহল ও স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার অভিযোগ করে আসছে যে সংস্থাটির তথ্য রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য বিকৃত করা হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে দারিদ্র্য হ্রাস এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির একটি অতিমাত্রায় স্বস্তিদায়ক কৃত্রিম চিত্র তুলে ধরতে তথ্যে নির্লজ্জ কারসাজি করা হতো। এমনকি ২০২৫ সালের বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবসে প্রকাশিত সরকারি টাস্কফোর্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনেও বিবিএসের তথ্যে আস্থার মারাত্মক ঘাটতি ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক খবরদারি, অযাচিত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং দাতাসংস্থার প্রেসক্রিপশনের কারণে বিবিএসের পেশাদারি ধ্বংস হয়ে গেছে। পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের অনাকাঙ্ক্ষিত খবরদারির ফলে আইনগত কর্তৃত্ব থাকা সত্ত্বেও সংস্থাটির স্বাধীনতা শৃঙ্খলিত হয়েছে। তহবিলের অভাবে একদিকে বড় বড় জরিপ বন্ধ রাখা হয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতার অজুহাতে যথাসময়ে প্রতিবেদন প্রকাশ না করে আটকে রাখা হয়েছে।

প্রমাণভিত্তিক সুশাসনের মূল চালিকাশক্তি হলো সময়োপযোগী ও বস্তুনিষ্ঠ পরিসংখ্যান। সঠিক তথ্য ছাড়া দারিদ্র্য বিমোচন কিংবা বৈষম্য হ্রাসে সরকারি উদ্যোগের কার্যকারিতা পরিমাপ করা অসম্ভব। তাই সরকারকে অবিলম্বে উপলব্ধি করতে হবে যে বিকৃত বা পুরোনো তথ্যের ধ্বংসস্তূপের ওপর কোনো আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে না। বিবিএসকে বাঁচাতে হলে একে মন্ত্রণালয় ও আমলাতন্ত্রের অযাচিত নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। পর্যাপ্ত জাতীয় বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করে এবং রাজনৈতিক প্রভাবের সংস্কৃতি বন্ধ করে সংস্থাটিকে আন্তর্জাতিক মানের স্বাধীন ও পেশাদার পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category