দেশের শিক্ষাঙ্গনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে ছাত্রসমাজ তথা কিশোরদের মধ্যে পড়ালেখার প্রতি অনীহা ও মনোসংযোগের এক মারাত্মক ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে চলতি বছরের প্রকাশিত উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে মানবিকে ছেলেদের পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার বিষয়টি শিক্ষক, অভিভাবক ও নীতিনির্ধারক মহলে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে অর্ধেকের বেশি ছাত্রই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে দিয়েছে।
চলতি বছর সারা দেশে মোট দশ লাখ আটচল্লিশ হাজার পাঁচশত ত্রিশ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল, যার মধ্যে ছাত্রের সংখ্যা ছিল চার লাখ তিরাশি হাজার একশত একানব্বই জন। এদের মধ্যে মাত্র দুই লাখ সাতাশ হাজার সাতশত উনআশি জন ছাত্র পাশ করতে পেরেছে, যা হিসাব করলে দাঁড়ায় মাত্র সাতচল্লিশ দশমিক চৌদ্দ শতাংশ। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি ছাত্র পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে। এর বিপরীতে ছাত্রীদের পাসের হার ছিল পঞ্চান্ন দশমিক পঁয়তাল্লিশ শতাংশ। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালেও ছেলেদের পাসের হার ছিল চুয়ান্ন দশমিক ষাট শতাংশ, যেখানে মেয়েদের পাসের হার ছিল বাষট্টি দশমিক ৯৭ শতাংশ, যা থেকে প্রমাণিত হয় যে গত এক বছরের ব্যবধানে ছেলেদের ফলাফল আরও বেশি নিম্নমুখী হয়েছে।
ফলাফল আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এ বছর সবচেয়ে খারাপ অবস্থা তৈরি হয়েছে মানবিক বিভাগে। সারা দেশে মানবিক বিভাগে ছেলেদের পাসের হার মাত্র পঁয়ত্রিশ দশমিক শূন্য এক শতাংশে নেমে এসেছে। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে মানবিকে ছেলেদের পাসের হার সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে রাজশাহী বোর্ডে, যেখানে পাসের হার মাত্র আটাশ দশমিক ১১ শতাংশ। এছাড়া যশোর বোর্ডে ত্রিশ দশমিক পঁয়ষট্টি, বরিশালে ত্রিশ দশমিক পিন্চানব্বই, চট্টগ্রামে বত্রিশ দশমিক উনআশি, দিনাজপুরে তেত্রিশ দশমিক উনিশ এবং কুমিল্লায় তেত্রিশ দশমিক সাতষট্টি শতাংশ ছাত্র পাশ করেছে। মানবিকে ছেলেদের পাসের হার তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি ছিল ঢাকা বোর্ডে, যা ছিল তেতাল্লিশ দশমিক চৌত্রিশ শতাংশ।
শিক্ষাবিদ ও কলেজ অধ্যক্ষরা ছেলেদের এই ক্রমাগত অবনতিশীল ফলাফলের পেছনে একাধিক সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ চিহ্নিত করেছেন। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাহেদুল ইসলাম চৌধুরী জানিয়েছেন যে বর্তমান সময়ে ছাত্রছাত্রীদের তুলনায় ছাত্রীরা পড়াশোনার প্রতি অনেক বেশি মনোযোগী ও দায়িত্বশীল। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উভয় দিক থেকেই মেয়েদের ওপর তদারকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। এছাড়া কভিডকালীন সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘকাল বন্ধ থাকা এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে শিক্ষাঙ্গনে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়, যার নেতিবাচক প্রভাব ছাত্রদের মনস্তত্ত্বে সবচেয়ে বেশি পড়েছে।
করোনা মহামারীর ওই সংকটময় সময়ে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতির নিয়মে শিথিলতা আসায় ছাত্রদের মধ্যে কোচিংনির্ভরতা এবং সহজে পাস করার এক অসুস্থ মানসিকতা শিকড় গেড়ে বসে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি দুর্বল হয়ে পড়ায় অনেক ছাত্র পড়াশোনার বদলে আড্ডা, মুঠোফোন আসক্তি এবং রাজনৈতিক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে। কৈশোরের এই বয়সে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রলোভন ও হুজুগে পড়ার প্রবণতা ছেলেদের যতটা প্রভাবিত করে, মেয়েদের ক্ষেত্রে তার মাত্রা কিছুটা কম থাকায় তারা অপেক্ষাকৃত ভালো ফলাফল অর্জন করে চলেছে।
অবশ্য বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ফলাফল কিছুটা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্রদের ফলাফল তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক ছিল এবং এ বিভাগে ছেলেদের সামগ্রিক পাসের হার ছিল তيهাত্তর দশমিক বারো শতাংশ। ঢাকা বোর্ডে বিজ্ঞান বিভাগে ছেলেদের পাসের হার ছিল আশি দশমিক সাতানব্বই শতাংশ, যা দেশের অন্যান্য বোর্ডের তুলনায় সর্বোচ্চ। অন্যদিকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ছেলেদের পাসের হার ছিল পঁয়তাল্লিশ দশমিক ৯৪ শতাংশ। তবে বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষার কিছু সাফল্য সত্ত্বেও সামগ্রিক ছাত্র সমাজের বড় একটি অংশের এই পড়াশোনার প্রতি অনীহা পুরো শিক্ষা খাতকে বড় ঝুঁকিতে ফেলছে।
কিশোরদের এই বিপথগামিতা কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং পরিবারগুলোতে এর বাস্তব ও মর্মান্তিক পরিণতি নিয়মিত দৃশ্যমান হচ্ছে। যেমনটা দেখা গেছে মাদারীপুরের এক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে, যেখানে কলেজে ভর্তির পর থেকেই ছেলেটি পড়াশোনা ছেড়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মোবাইল ফোন নিয়ে মত্ত হয়ে পড়ে। শত চেষ্টা করেও তাকে ক্লাসমুখী করা যায়নি এবং শেষ পর্যন্ত তাকে বিদেশ পাঠিয়ে দেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন অভিভাবকরা। নির্দিষ্ট বয়সসীমার আগে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং মুঠোফোনের অবাধ ব্যবহারের ওপর কঠোর আইনি বিধিনিষেধ আরোপ করা জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন অভিভাবক সমাজ।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আকতার বানু মনে করেন যে করোনাকালীন অনলাইন শিক্ষা, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস এবং অটো পাসের সংস্কৃতি শিক্ষার্থীদের বইবিমুখ করে তোলার জন্য দায়ী। সৃজনশীল পদ্ধতিতে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার প্রবণতা বা ওভারমার্কিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীরা না পড়েও ভালো নম্বর পাওয়ার মানসিকতা তৈরি করেছে, যা তাদের গভীর অধ্যাবসায়কে চিরতরে ধ্বংস করে দিয়েছে। এছাড়া নিয়মিত ক্লাস না হওয়া, কোচিং সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং শিক্ষক নিয়োগে নানা অনিয়মের কারণে শিক্ষার মান দিন দিন তলানিতে গিয়ে ঠেকছে।
বর্তমান সমাজের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং মাদকের ভয়ংকর বিস্তার। অধ্যাপক আকতার বানু জোরালোভাবে সতর্ক করে বলেছেন যে সীমান্ত দিয়ে মাদক চোরাচালান কঠোরহস্তে দমন না করা হলে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো না হলে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করা অসম্ভব হবে। মাদকের সহজলভ্যতা কেবল কিশোরদেরই নয়, বরং সমগ্র সমাজব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। তাই মাদক ও অপরাধের বিস্তার রোধে এখনই সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করতে হবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল আশাবাদী কণ্ঠে জানিয়েছেন যে ছাত্রদের ফল পতনের এই নেতিবাচক ধারা পরিবর্তনে সরকার বহুমুখী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, এবং শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে মাদকাসক্তি ও অপরাধপ্রবণতা রোধে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে দেশের কিশোর ও যুবসমাজকে পড়াশোনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের সঠিক নৈতিক শিক্ষায় গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় জাতীয় দাবি। পরিবারের সচেতনতা, শিক্ষকদের সজাগ দৃষ্টি এবং প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপে কেবল এই গভীর সংকট থেকে জাতিকে মুক্ত করা সম্ভব।
দেশ গঠনের মূল চালিকাশক্তি হলো আজকের তরুণ প্রজন্ম, তাই তাদের বিপথগামিতা রোধে সর্বস্তরের জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অত্যন্ত জরুরি।
আগামী দিনে একটি দক্ষ, শিক্ষিত ও নৈতিকতাসম্পন্ন জাতি গঠনে শিক্ষা খাতের চলমান এই সমস্যার আশু সমাধান করা অত্যন্ত বাঞ্ছনীয়।
তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা