• মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৫৬ পূর্বাহ্ন
Headline
আয়-ব্যয় ও অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিয়ে টিআইবির গবেষণা: দলগুলোর এত টাকা আসে কোথা থেকে রাজস্ব ঘাটতি ও পে-স্কেলের চাপে সরকারের ব্যাংক ঋণ: চার মাসেই ৪৮ হাজার কোটি টাকার নিট ঋণ বেসরকারি খাতের বড় সংকট: অবসরের নির্দিষ্ট আর্থিক পরিকল্পনা নেই দেশের ৮১ শতাংশ কর্মীর ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অভিযানের ইঙ্গিত, যা বললো রাশিয়া জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও মজুরির ব্যবধান: অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের অন্তরায় শীতে ঘাড় ব্যথার কারণ ও প্রতিকার বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলন – ৭ মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন: ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পতন এবং কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার অগ্নিপরীক্ষা এলজিইডিতে ১৮১ সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ, যোগদান ১০ নভেম্বর অক্টোবরে নিরাপদ খাদ্য আইনে সাড়ে ৩৫ লাখ টাকা জরিমানা

রাজস্ব ঘাটতি ও পে-স্কেলের চাপে সরকারের ব্যাংক ঋণ: চার মাসেই ৪৮ হাজার কোটি টাকার নিট ঋণ

Reporter Name / ৩ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব আদায় না হওয়া এবং সরকারের দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে দেশের ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাস অর্থাৎ জুলাই থেকে অক্টোবর সময়কালের মধ্যেই ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকার ঘরে গিয়ে ঠেকেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য উন্মোচিত হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

চলতি অর্থবছরের জন্য সরকার প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার একটি রেকর্ড পরিমাণ বাজেট ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এই বিশাল অঙ্কের বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার মধ্যে কেবল অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকেই ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু অর্থবছরের শুরুর দিককার হিসাব নিকাশ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে মাত্র চার মাস অতিক্রান্ত হতেই সরকার তার বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার প্রায় তেতাল্লিশ শতাংশই ইতিমধ্যে ব্যবহার করে ফেলেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে সাধারণত প্রতিটি অর্থবছরের প্রথমভাগে সরকারের ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার চাপ কিছুটা কম থাকে এবং মাঝামাঝি কিংবা শেষ প্রান্তিক থেকেই মূলত ঋণের চাহিদা তীব্র আকার ধারণ করে। কিন্তু বর্তমান অর্থবছরের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো, কারণ অর্থবছরের একেবারে শুরু থেকেই রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম তিন মাসেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ঘাটতি প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন সরকারি পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে তৈরি হওয়া বিশাল আর্থিক চাপ, যার জোগান দিতে গিয়ে সরকারকে বাধ্য হয়ে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে হচ্ছে।

বিশেষ করে সরকারি চাকুরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল অনুযায়ী কর্মচারীদের বকেয়া ও চলতি মাসের বেতন পরিশোধ নিশ্চিত করতে গত ২৯ অক্টোবর সরকার মাত্র চৌদ্দ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে আকস্মিকভাবে ৫ হাজার কোটি টাকা তুলে নেয়। এই বিশেষ ও স্বল্পমেয়াদি বিল উত্তোলনের ফলেই চলতি অর্থবছরে সরকারের সামগ্রিক নিট ঋণের স্থিতি আরও দ্রুতগতিতে ওপরে উঠে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে চাহিদা অনুযায়ী ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকারকে প্রয়োজনীয় ঋণের জোগান দেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব, যা তাঁরা পালন করে চলেছেন।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায় যে গোটা অক্টোবর মাসজুড়েই সরকার ব্যাংক খাত থেকে লাগাতার ঋণ গ্রহণের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। কেবল গত অক্টোবরের এক মাসেই ট্রেজারি বিল ও বন্ডের নিলামের মাধ্যমে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ সংগ্রহ করা হয়েছে, যা অতীতের যেকোনো একক মাসের তুলনায় সর্বোচ্চ রেকর্ড। এর আগে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস অর্থাৎ জুলাইয়ে বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ৫৬ হাজার কোটি টাকা এবং পরবর্তী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে যথাক্রমে ৫০ হাজার ও সাড়ে একচল্লিশ হাজার কোটি টাকা ঋণ তুলেছিল সরকার।

তবে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের নিলামের মাধ্যমে সংগৃহীত এই সমস্ত অর্থের পুরোটা নিট হিসেবে গণ্য হয় না, কারণ নতুন ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি পূর্ববর্তী মোদোত্তীর্ণ বিল ও বন্ড পরিশোধ বা রি-ইস্যুর পেছনেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে। সমস্ত হিসাব-নিকাশ চূড়ান্ত করার পর অক্টোবর মাসের শেষান্তে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেওয়া প্রকৃত বা নিট ঋণের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় ৪৭ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকায়। এই ধারাবাহিক ও অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা তরল অর্থের প্রবাহ সংকুচিত হয়ে আসছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিগত বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে চৌত্রিশ শতাংশের থেকেও বেশি। অথচ একই সমান্তরাল সময়ে দেশের উৎপাদনমুখী বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম সর্বনিম্ন চিত্র। সরকারের তরফ থেকে ব্যাংক খাত থেকে হু হু করে ঋণ নেওয়ার এই প্রবণতা অব্যাহত থাকায় বেসরকারি খাতের ঋণ সংকট দিন দিন আরও বেশি তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে।

অর্থ বিভাগের সাম্প্রতিক এক দীর্ঘমেয়াদী প্রক্ষেপণ অনুযায়ী বর্তমান এই ঋণ গ্রহণের ধারা যদি আগামী দিনগুলোতেও অপরিবর্তিত থাকে, তবে আগামী তিন বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছর নাগাদ দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি প্রায় ৩৪ লাখ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকবে। এই বিপুল পরিমাণ অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণের ফলে ব্যাংকগুলো সরকারের বন্ডে বিনিয়োগ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে, যার ফলে শিল্পায়ন ও ব্যবসা বাণিজ্যের সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন পাচ্ছে না বেসরকারি খাত।

বাণিজ্য ও ব্যাংক খাতের শীর্ষ বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন যে রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার আনা না গেলে এবং সরকারি পরিচালন ব্যয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আগামীতে দেশের পুরো সামষ্টিক অর্থনীতি এক গভীর সংকটের মুখে পড়তে পারে। সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের চাহিদা মেটাতে গিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সাধারণ আমানতকারীদের সুদের হার বাড়িয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে, যা সামগ্রিক বাজারে মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে।

আগামী দিনগুলোতে সরকারের আর্থিক নীতিমালায় শৃঙ্খলা না ফিরলে দেশের পুরো ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর এই ঋণের বোঝা আরও ভারী হয়ে উঠবে।

তাই রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ঘাটতি পূরণে বিকল্প আয়ের উৎস বাড়ানোর ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

সংশ্লিষ্ট সকলে আশা করছেন যে সরকার খুব দ্রুত এই পরিস্থিতি উত্তরণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

সব মিলিয়ে রাজস্ব ঘাটতির দুষ্টচক্র এবং নতুন পে-স্কেলের আর্থিক চাপ সামলাতে গিয়ে সরকার যেভাবে ব্যাংক ঋণের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এখনই। দেশের বেসরকারি খাতের স্থবিরতা দূর করতে এবং ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট নিরসনে সরকারের উচিত অভ্যন্তরীণ ঋণ নেওয়ার পরিমাণ কমিয়ে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category