দেশের সার্বিক সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে একাধিক ফ্রন্টে বহুমুখী তৎপরতার তথ্য সামনে আসছে। ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন ও জাতীয় রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে একদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ে আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর অস্ত্র সংগ্রহ ও উসকানি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সীমান্তে ‘পুশইন’ বা জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়ার নীতি এবং সমতলে আত্মগোপনে থাকা নিষিদ্ধ সংগঠনের চোরাগোপ্তা তৎপরতা—এই ত্রিমুখী সংকট মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অভিমত, দেশের নির্বাচিত সরকারকে মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক চাপে রাখতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে নানামুখী সমীকরণ তৈরি করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা তথ্যের সূত্রে জানা যায়, সমতলে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় আকস্মিক নাশকতা ও জনমনে ভীতি তৈরির কৌশল হাতে নেওয়া হয়েছে। আত্মগোপনে থাকা রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা জনবহুল বা গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ৩ থেকে ৫ মিনিটের ‘ফ্ল্যাশ মার্চ’ বা ঝটিকা মিছিল করে ককটেল বিস্ফোরণ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে দৈনিক ভাতার বিনিময়ে কর্মী ভাড়া করে এনে এসব কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ানোর ছক কষা হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিতি দেখিয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা। ভারতের আশ্রয়ে থাকা সাবেক সরকারপ্রধানের দেশে ফেরার বক্তব্যের সুযোগ নিয়ে এই গোপন নেটওয়ার্ক সক্রিয় করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
দ্বিতীয় বড় উদ্বেগের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল পার্বত্য চট্টগ্রাম। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে, পাহাড়ি এলাকায় অস্থিরতা ছড়িয়ে দিতে তিনটি আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন—কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) একাংশ সক্রিয় হয়েছে। এদের সাথে সীমান্তপারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নতুন সমঝোতা পাহাড়ি জনপদে ভারী অস্ত্র, গোলাবারুদ ও উচ্চমাত্রার বিস্ফোরক প্রবেশের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তিন পার্বত্য জেলা—রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর সমতল থেকে পাহাড়ে সরিয়ে নেওয়ার একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
তৃতীয় সংকটটি দৃশ্যমান হচ্ছে দেশের আন্তর্জাতিক সীমান্তগুলোতে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটগুলো বাংলাভাষী সাধারণ মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার তৎপরতা বাড়িয়েছে। সীমান্তজুড়ে উত্তেজনা জিইয়ে রেখে কূটনৈতিকভাবে ঢাকাকে চাপে রাখাই এই ধরনের পদক্ষেপের উদ্দেশ্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তবে সীমান্তে স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে বিজিবি সদস্যরা অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিহত করতে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে।
সার্বিক সীমান্ত নিরাপত্তা প্রসঙ্গে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ২৭১ কিলোমিটারজুড়ে সার্বক্ষণিক কঠোর নজরদারি বলবৎ রয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ড্রোন, থার্মাল ইমেজিং ডিভাইস, নাইট ভিশন ইকুইপমেন্ট এবং আকাশপথে রসদ সরবরাহের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নজরদারি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা হচ্ছে। যেকোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ, অস্ত্র চোরাচালান ও সন্ত্রাসী তৎপরতা ঠেকাতে বিজিবি ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থা সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করছে।
এরই মধ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আকস্মিক ঢাকা সফর ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক গুঞ্জন সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবেশী দেশের নীতিনির্ধারকরা ঢাকার নতুন নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকারের অবস্থান গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করছেন।
নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বহির্দেশীয় ষড়যন্ত্রের চেয়েও অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও মেরুকরণের সুযোগ নিয়ে তৃতীয় পক্ষ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে। পাহাড় বা সমতলের নিরাপত্তা কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং জনগণের সক্রিয় সম্পৃক্ততা ও জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমেই সুদৃঢ় করা সম্ভব। সার্বিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সীমান্ত অক্ষুণ্ণ রাখতে জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করাই বর্তমান সময়ের প্রধান করণীয়।