‘বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরাচার যেন পুলিশ সদস্যদের দেশ ও জনগণের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না পারে—স্বাধীনতার প্রথম প্রহরে পুলিশের রক্তে রঞ্জিত এই রাজারবাগের মাটিতে দাঁড়িয়ে আজ আমাদের সেই নতুন শপথে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে।’—রোববার (১০ মে) সকালে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আয়োজিত ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
ফ্যাসিবাদবিরোধী সুদীর্ঘ আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পুলিশ বাহিনীর উদ্দেশে তাঁর এই বক্তব্যকে একটি বড় ধরনের নীতিগত বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর শিকার শহীদ পুলিশ সদস্যদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
তিনি বলেন, “এই সেই ঐতিহাসিক রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, যেখানে ঘুমন্ত পুলিশ সদস্যদের ওপর হানাদার বাহিনী বর্বর হামলা চালিয়ে শত শত সদস্যকে হত্যা করেছিল। তবে শুধু তাদের স্মরণের মধ্য দিয়েই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। যে স্বাধীনতার জন্য এই বীর পুলিশ সদস্যরা আত্মত্যাগ করেছিলেন, যেকোনো মূল্যে সেই স্বাধীনতা রক্ষা করা আমাদের সবার পবিত্র দায়িত্ব।” পুলিশ যেন কোনোভাবেই আর রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে তিনি বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে সতর্ক ও সচেতন থাকার আহ্বান জানান।
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি বিশেষ দিকের প্রতি গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন,
“একদিকে চট্টগ্রামে মেজর জিয়ার ‘উই রিভল্ট’, অন্যদিকে ঢাকায় রাজারবাগ পুলিশের মরণপণ প্রতিরোধ—এরপর স্বাধীনতাকামী মানুষের আর পিছিয়ে থাকার সুযোগ ছিল না। তবে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি কৌশল নিয়ে এখনো গবেষণার সুযোগ রয়েছে। উত্তাল মার্চে যখন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার সৈন্য ঢাকায় জড়ো করা হচ্ছিল, ঠিক সেই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে সব পুলিশ সদস্যকে কেন রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে একসঙ্গে জড়ো করে রাখা হয়েছিল? এর পেছনের যুক্তি বা কৌশল কী ছিল, তা নিয়ে আমাদের গবেষকদের কাজ করা উচিত।”
গত দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য মানুষ হামলা, মামলা, নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অধিকারহারা সেই মানুষগুলো ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারকে নির্বাচিত করেছে।
“জনগণ এখন কেবল শান্তি এবং নিরাপত্তা চায়,” উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দেশের মানুষের এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের ভূমিকার ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। আপনারা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আপনাদের সাধ্য ও সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবেন—এটাই বর্তমান সরকারের প্রধান প্রত্যাশা।”
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ পুলিশের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “অতীতের সব কলঙ্ক মুছে ফেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা, দক্ষতা এবং পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব।”
প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার সুরক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আমাদের পুলিশ সদস্যরা সাহসিকতা ও মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিশেষ করে আমাদের নারী পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা আজ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। আমি চাই, বিদেশের মাটিতে আপনারা যেমন মানবিকতার দৃষ্টান্ত রাখছেন, দেশের সাধারণ জনগণের সঙ্গেও ঠিক তেমনই মানবিক আচরণ করবেন।”
এর আগে প্রধানমন্ত্রী পুলিশ সপ্তাহের সুসজ্জিত ও বর্ণাঢ্য প্যারেড পরিদর্শন করেন এবং সালাম গ্রহণ করেন। প্যারেড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এই প্যারেড শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি পুলিশ সদস্যদের শৃঙ্খলা, আত্মমর্যাদা এবং দায়িত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ।”
অনুষ্ঠানে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন পদমর্যাদার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস এলাকাকে বর্ণিল সাজে সজ্জিত করা হয়।