• বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৭ অপরাহ্ন

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দীর্ঘ পথে নানা চ্যালেঞ্জ

Reporter Name / ৫ Time View
Update : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজে যে গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং আমূল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জোরালো প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, গত দুই বছরে সেই অঙ্গীকার থেকে ক্ষমতাসীন সরকার অনেকটাই পিছু হটেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও স্বাধীনতা এখনো দুর্বল রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসের এই সময়ে সংসদ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় সরকার কাঠামোর বহু প্রতীক্ষিত সংস্কারের ভাগ্য এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের আগস্টে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন ও আইনি সংস্কারের লক্ষ্যে যেসব অধ্যাদেশ জারি করেছিল, তার একটি বড় অংশ নির্বাচিত সংসদে অনুমোদন না পাওয়ায় ইতিমধ্যে বাতিল বা তামাদি হয়ে গেছে। সংস্কারের সেই গতি সংসদীয় রাজনীতিতে এসে স্থবির হয়ে পড়ায় জনগণের মধ্যে একধরনের মোহভঙ্গ তৈরি হয়েছে।

সংসদ ও ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা

জাতীয় সংসদ এখনো নির্বাহী বিভাগের ওপর কার্যকর কোনো নিয়ন্ত্রণ বা ভারসাম্য (চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স) প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি বলে দাবি করেছেন সমালোচকরা। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার জানান, গণতন্ত্রের জন্য কেবল নির্বাচনই যথেষ্ট নয়; মৌলিক অধিকার রক্ষা ও অবিচার দূর করতে হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত পুনর্গঠন অপরিহার্য। তিনি বলেন, সংসদের মূল দায়িত্ব ছিল নির্বাহী বিভাগের ওপর নজরদারি রাখা, যার একটি কার্যকর উপায় ছিল বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটিগুলোর নেতৃত্ব দেওয়া। কিন্তু সরকার সেই মৌলিক নীতি এড়িয়ে গেছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন বলেন, জুলাই সনদের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের স্থায়ী কমিটির সভাপতি নির্বাচিত করা। কিন্তু তা বাস্তবায়ন না করায় জনমনে চরম হতাশা তৈরি হয়েছে। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাও জানান, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে শক্তিশালী করার প্রস্তাবগুলো সরকারের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের কারণেই আটকে আছে।

বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। বদিউল আলম মজুমদার উল্লেখ করেন, বিচারক নিয়োগে এখনো কোনো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ স্থায়ী নীতিমালা তৈরি হয়নি। অধ্যাপক মহিউদ্দিনের মতে, ১৯৯০ সাল থেকেই প্রতিটি রাজনৈতিক দল বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসার পর তা ভুলে যায়।
বিরোধী জোটের দলগুলো এ বিষয়ে বিএনপি সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করার ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। এছাড়া গুম ও মানবাধিকারবিষয়ক নতুন আইনগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে; স্বাধীনভাবে রায় দেওয়ার কারণে বিচারকদের পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়া কিংবা বাধ্যতামূলক বদলির মতো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে হচ্ছে।
এছাড়া নির্বাচন কমিশন (ইসি), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ও মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন অস্তিত্ব নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিরোধী নেতারা। এনসিপির আখতার হোসেন ও সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম অভিযোগ করেন, সাংবিধানিক ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্দলীয় সার্চ কমিটির মাধ্যমে নিরপেক্ষ নিয়োগের ব্যাপারে জাতীয় ঐকমত্য হলেও, বাস্তবে দলীয় পরিচয়ের ব্যক্তিদের এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে।

পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারের আমলাতান্ত্রিকতা

আইনের শাসনের ভঙ্গুর অবস্থার কথা তুলে ধরে অধ্যাপক মহিউদ্দিন বলেন, পুলিশ বাহিনী এখনো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি। অথচ গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য পুলিশের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণ বন্ধ করা পূর্বশর্ত ছিল।
অন্যদিকে, স্থানীয় সরকারকে গণতান্ত্রিক সংস্কারের বাইরে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বদিউল আলম মজুমদার জানান, সরকার স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান না করে দলীয় অনুগতদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করছে। নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় তৃণমূল পর্যায়ে জবাবদিহিতা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
নির্বাহী ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও একক ব্যক্তির হাতে অতিমাত্রায় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া ঠেকানোর প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত না হওয়া প্রসঙ্গে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা সর্বদা নিরঙ্কুশ নির্বাহী ক্ষমতা ধরে রাখতেই পছন্দ করেন। গণভোটের দাবি ও জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে এনসিপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়।

সরকারের অবস্থান ও আত্মপক্ষ সমর্থন

তবে এসব অভিযোগের বিপরীতে সরকারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন ক্ষমতাসীন দলের চিফ হুইপ ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম মনি। তিনি দাবি করেন, সরকার কোনো বিচারিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করছে না এবং কোনো ধরনের স্বেচ্ছাচারী আটকাদেশ দিচ্ছে না।
নুরুল ইসলাম মনি বলেন, গত পাঁচ দশক ধরে দেশে পুলিশ, বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশনের মতো স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়নি। দীর্ঘ সময় মানুষ ভোটাধিকার ও সুশাসন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। রাতারাতি পুরো সংবিধান নতুন করে লেখার চেয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর মাধ্যমে সংস্কার আনাটাই বাস্তবসম্মত। তিনি দাবি করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতীত আচরণ কাটিয়ে তাদের মনোবল ফেরাতে এবং সার্বিক সংস্কারের জন্য সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে মনি বলেন, জনগণ ও সাংবাদিকরা এখন যেকোনো জনপরিসর বা ডিজিটাল মাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করতে পারছেন। তবে কেউ কেউ সেই স্বাধীনতার অপব্যবহার করে দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য দিচ্ছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন

সরকারি দলের দাবি সত্ত্বেও বাস্তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে বলে উদ্বেগ জানিয়েছেন মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নাগরিকদের তাঁর সরকারের সমালোচনা করার আহ্বান জানালেও, দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) সম্প্রতি এ ধরনের গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সংস্থাটি মন্তব্য করেছে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনামূলক পোস্টের কারণে সাধারণ নাগরিকদের আটক করা পূর্ববর্তী সরকারের দমনমূলক নীতিরই এক উদ্বেগজনক ধারাবাহিকতা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category