• বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০১ অপরাহ্ন
Headline
এবার এশিয়ান গেমসের পালা বাংলাদেশের তারেক রহমানের দিল্লি সফর চূড়ান্তের আগে সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা চায় ঢাকা: দ্য হিন্দু হাম উপসর্গে আরও ৭ জনের মৃত্যু ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ৬ মৃত্যু, আক্রান্ত ৪৮ হাজার ছাড়াল ভালোমন্দ খাওয়ার পর ঘুম পায় কেন? আত্মহত্যার হার শূন্যের কোঠায় নামাতে চায় সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ইরানের রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ সাংবাদিকরা বস্তুনিষ্ঠ থাকলে অনেক সমস্যা দূর হয়ে যায় : ড. মঈন খান ‘মাননীয়’ সম্বোধন পরিহারের সিদ্ধান্ত নিজের দপ্তর থেকেই বাস্তবায়ন শুরু করলেন প্রধানমন্ত্রী সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা ও অবক্ষয়মূলক কনটেন্ট প্রতিরোধই সরকারের লক্ষ্য : তথ্যমন্ত্রী

বঙ্গোপসাগরের বুকে জ্বালানি-রাজনীতির নতুন সমীকরণ: এলএনজি খাতে মার্কিন আধিপত্যের মাঝে রাশিয়ার প্রবেশোদ্যোগ

Reporter Name / ০ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বাণিজ্যে এবার নতুন করে প্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে রাশিয়া। এতদিন এই খাতে মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্য থাকলেও এখন দৃশ্যপটে নতুন প্রতিযোগীর আবির্ভাব ঘটছে। বঙ্গোপসাগরের মতো কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকায় একই সঙ্গে আমেরিকা ও রাশিয়াকে প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ করে দেওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, ভূরাজনৈতিক এই মেরুকরণের মধ্যে প্রতিটি দিক নিখুঁতভাবে বিবেচনা করে তবেই সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত। পুরো বিষয়টি সফলভাবে সামাল দেওয়া সম্পূর্ণভাবে বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক দক্ষতা ও প্রজ্ঞার ওপর নির্ভর করছে। শেষ পর্যন্ত যদি রাশিয়ার এই উদ্যোগটি সফলতার মুখ দেখে, তবে এটি হবে বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহ কাঠামোর চতুর্থ এলএনজি টার্মিনাল।
পেট্রোবাংলা এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের শীর্ষস্থানীয় সূত্রগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের মহেশখালীতে এলএনজি খালাস করার লক্ষ্যে একটি গ্র্যাভিটি-বেইজড স্ট্রাকচার বা জিবিএস (GBS) স্থাপনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে ‘নোভাটেক মিডলইস্ট ডিএমসিসি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। গত ৩ সেপ্টেম্বর পেট্রোবাংলার কাছে প্রতিষ্ঠানটি তাদের এই সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবটি জমা দেয়। পেট্রোবাংলার দপ্তরে উপস্থাপিত কোম্পানিটির ৩২ স্লাইডবিশিষ্ট একটি বিস্তারিত প্রেজেন্টেশনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই জিবিএস কাঠামোর নির্মাণকাজে প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন, বিদেশ থেকে এলএনজি ক্রয় করে আনা, টার্মিনালের সার্বিক উন্নয়ন এবং পরবর্তীতে এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নোভাটেক মিডলইস্ট ডিএমসিসি নিজেই গ্রহণ করতে আগ্রহী।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক নাম ব্যবহারকারী এই প্রতিষ্ঠানটির টার্মিনাল নির্মাণের পূর্ব অভিজ্ঞতা খুঁজতে গিয়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, জিবিএস স্থাপনের ক্ষেত্রে নোভাটেক মিডলইস্টের নিজস্ব কোনো অতীত অভিজ্ঞতা নেই। তবে রাশিয়ায় সম্পূর্ণ একই নামের একটি স্বনামধন্য জ্বালানি কোম্পানির অস্তিত্ব রয়েছে। পেট্রোবাংলার কাছে দেওয়া প্রেজেন্টেশনে নোভাটেক মিডলইস্ট যে লোগো ব্যবহার করেছে, সেটি আর রাশিয়ার মূল নোভাটেক কোম্পানির লোগো হুবহু এক। অভিন্ন নাম ও লোগো ব্যবহারের এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে নোভাটেক মিডলইস্ট এবং রাশিয়ার নোভাটেক একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কযুক্ত। এছাড়া ২০২৩ সালের ২৯ জুন সম্পাদিত একটি চুক্তির নথিতে রাশিয়ার নোভাটেককে লাইসেন্সদাতা বা স্বত্বাধিকারী এবং নোভাটেক মিডলইস্ট ডিএমসিসিকে লাইসেন্সগ্রহীতা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে প্রতিষ্ঠান দুটি একই মূল মালিকানার অধীন। শুধু তাই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বিশ্লেষণ করে নোভাটেক মিডলইস্টের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার প্রোফাইল খুঁজে পাওয়া গেছে, যেখানে তাঁদের রুশ ভাষায় পারদর্শিতা এবং কর্মজীবনের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা হিসেবে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর প্রেজেন্টেশন দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেলেও পেট্রোবাংলার এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, এমন প্রেজেন্টেশন যে কেউ দিতে পারে, তাই বিষয়টি নিয়ে এখনই আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি মেটাতে প্রতি মাসে গড়ে অন্তত ১০ কার্গো এলএনজি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। জ্বালানি বিভাগের সূত্রগুলো শঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, ভবিষ্যতে দেশীয় গ্যাসের মজুদ ও উৎপাদন আরও কমে গেলে বাধ্য হয়ে এলএনজি আমদানির পরিমাণ বহুগুণ বাড়াতে হবে। বর্তমান খোলা বাজার বা স্পট মার্কেট থেকে প্রতি কার্গো এলএনজি কিনে আনতে সরকারের প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। সেই হিসাব অনুযায়ী প্রতি মাসে ন্যূনতম ১০ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম বর্তমান পর্যায়ে স্থির থাকলে বছরে বাংলাদেশকে প্রায় ৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার শুধু এলএনজি আমদানির পেছনেই ব্যয় করতে হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, স্পট মার্কেটের বদলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে এই বিপুল পরিমাণ ব্যয় অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
নোভাটেক তাদের সুবিস্তৃত প্রস্তাবে মহেশখালীর সাগরবক্ষে একটি গ্র্যাভিটি-বেইজড স্ট্রাকচার নির্মাণের কথা বলেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এটি হবে সমুদ্রের তলদেশে শক্তভাবে বসানো একটি সুবিশাল কংক্রিটের কাঠামো, যার ওপর এই স্থায়ী টার্মিনালটি প্রতিষ্ঠিত হবে। ভাসমান টার্মিনালগুলোর মতো এটি সমুদ্রের ঢেউ বা প্রলয়ংকরী ঝড়ের আঘাতে দুলবে না, ফলে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় এলএনজি খালাস বাধাগ্রস্ত হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটবে না। এই জিবিএস টার্মিনালটিতে একসঙ্গে পুরো এক মাসের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের বিশাল মজুদ নিরাপদে সংরক্ষণ করা যাবে। এটি মূলত এলএনজি গ্রহণ, সংরক্ষণ এবং পরবর্তীতে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহের জন্য একটি স্থায়ী ও বৃহৎ অবকাঠামো হিসেবে কাজ করবে, যেখানে বড় আকারের এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজগুলো সরাসরি নোঙর করে খালাস প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবে।
এলএনজি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নোভাটেক সম্পূর্ণ নতুন দুটি বিকল্প পদ্ধতির প্রস্তাব দিয়েছে। প্রথম পদ্ধতিতে, টার্মিনালে এলএনজি পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর বা রিগ্যাসিফিকেশন করার পর সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে স্থাপিত পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ করার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় ও অভিনব পদ্ধতিতে, এলএনজি তরল অবস্থাতেই প্রায় ৫ হাজার ঘনমিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ছোট আকারের জাহাজে করে দেশের অভ্যন্তরে নদীর রুট ব্যবহার করে নির্দিষ্ট এলাকাগুলোতে পাঠিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে নদীপথে এলএনজি পরিবহনের জন্য মূলত চারটি সুনির্দিষ্ট রুটের কথা প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। রুটগুলো হলো—নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাট, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ, নরসিংদীর ঘোড়াশাল এবং কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা। নোভাটেক বলছে, এই এলাকাগুলোতে ছোট আকারের রিগ্যাসিফিকেশন বা পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট স্থাপন করা হলে সমুদ্রবন্দর থেকে আর বিশাল ও ব্যয়বহুল পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস নেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। ছোট জাহাজে করে সরাসরি ওইসব এলাকার গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে এলএনজি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এরপর স্থানীয় পর্যায়ে তরল এলএনজিকে গ্যাসে রূপান্তরিত করে সরাসরি আশেপাশের শিল্পকারখানা, সার কারখানা এবং ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোতে সরবরাহ করা যাবে। নতুন পাইপলাইন নির্মাণের বিপুল খরচ ও সময় বাঁচানোর জন্য এটি একটি যুগান্তকারী কৌশলগত প্রস্তাব।
নোভাটেক কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে প্রায় ৩২ মাস সময়ের প্রয়োজন হবে। প্রকল্পের জন্য প্রয়োজন হবে অন্তত ৯৫০ মিলিয়ন ডলারের বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ। এই টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন প্রায় ৯৫০ থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত করা সম্ভব হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেছে। তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণে সাধারণত ৫০০ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হয় এবং সরকার এগুলোর সঙ্গে মাত্র ১৫ বছরের জন্য গ্যাস সরবরাহের চুক্তি করে থাকে। অন্যদিকে নোভাটেকের প্রস্তাবিত জিবিএস টার্মিনাল নির্মাণে ৯৫০ মিলিয়ন ডলার খরচ হলেও এটি একটানা ৬০ থেকে ৮০ বছর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস সরবরাহ করে যেতে সক্ষম। তদুপরি, এটি একটি ভাসমান টার্মিনালের তুলনায় দ্বিগুণ পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করার সক্ষমতা রাখে এবং ঝড়ঝঞ্ঝার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও এর কার্যক্রম সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন থাকে।
বর্তমানে মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল কার্যকর রয়েছে। সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে স্থাপিত ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সাবসি পাইপলাইনের মাধ্যমে এই দুটি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যায়। এই দুটি টার্মিনালের একটির মালিকানা যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির হাতে এবং অন্যটির মালিকানা দেশীয় উদ্যোক্তা সামিট পাওয়ারের হাতে রয়েছে। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দুটি টার্মিনালই সার্বিকভাবে পরিচালনা করে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি। মহেশখালী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত মূল গ্যাস পাইপলাইনের মোট সরবরাহ সক্ষমতা ১ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ, বর্তমান সরবরাহের পরও এই পাইপলাইনে আরও ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের বিশাল সুযোগ অব্যবহৃত রয়ে গেছে। এই খালি পড়ে থাকা পাইপলাইনের সক্ষমতা কাজে লাগানোর জন্য সরকার ইতিমধ্যে একটি চীনা কোম্পানির প্রস্তাবও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। জুনের শেষের দিকে চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিএনইই) প্রতিদিন ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহে সক্ষম একটি নতুন ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দিয়েছে।
রাশিয়ার নোভাটেক মিডলইস্টের এই বিশাল প্রস্তাব গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের আইনি ও ভূরাজনৈতিক বাধা সামনে এসে দাঁড়াতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তির কঠিন শর্তানুসারে, জ্বালানি খাতের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ে তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে নতুন চুক্তি করতে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বানুমোদন নিতে হবে। ফলে রাশিয়ার এই মেগাপ্রকল্পের বাস্তবায়ন অনেকটাই মার্কিন রাজনৈতিক ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও প্রখ্যাত জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রস্তাব গ্রহণের আগে বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো কৌশলগত বা অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হবে কি না, তা সবার আগে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা অপরিহার্য। যেকোনো বিদেশি প্রস্তাব অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করে তবেই গ্রহণ করা উচিত বলে তিনি সুস্পষ্ট মত দেন। আমেরিকার সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির আইনি বাধ্যবাধকতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, যদি আমেরিকা শেষ পর্যন্ত এই চুক্তিতে বাধা দেয় বা অনুমতি প্রদানে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তখন পরিস্থিতি নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে। তবে তাঁর মতে, এমন গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী টার্মিনাল কোনো বিদেশি কোম্পানির হাতে ছেড়ে না দিয়ে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে ও পেট্রোবাংলার নিজস্ব তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করাই হবে রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।
অন্যদিকে, আরেক বরেণ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম এই জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করছেন। তিনি মনে করেন, পুরো বিষয়টির চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশ সরকারের মুন্সিয়ানা ও দক্ষতার ওপর। প্রতিবেশী ভারতের সফল কূটনীতির একটি বাস্তব উদাহরণ টেনে তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বব্যাপী নানামুখী সংকট ও মার্কিন আপত্তির মধ্যেও ভারত ঠিকই নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে রাশিয়া থেকে সস্তায় জ্বালানি তেল ক্রয় করেছে। বাংলাদেশও সেই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে নিজের অর্থনৈতিক ও জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে রাশিয়ার সঙ্গে এই টার্মিনাল চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারবে কি না, তা সরকারের নীতিনির্ধারকদের কূটনৈতিক কৌশলের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। যদি সরকার বিচক্ষণতা ও অসামান্য দক্ষতার সঙ্গে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর এই প্রতিযোগিতাকে সফলভাবে সামাল দিতে পারে, তবে দিন শেষে বাংলাদেশই অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। আর সরকার যদি এই অত্যন্ত সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তবে যথারীতি আমেরিকার ব্যবসায়িক স্বার্থই একচেটিয়াভাবে প্রাধান্য পাবে এবং চূড়ান্তভাবে তারাই লাভবান হবে।

 

তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category