স্বাধীনতার উষালগ্ন থেকেই বাংলাদেশের বিশ্বস্ত ও অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার জাপান। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের পুনর্গঠন থেকে শুরু করে আজকের উদীয়মান অর্থনীতির রূপান্তরমূলক যাত্রায় টোকিওর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান অনস্বীকার্য। ঢাকার মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল কিংবা মাতারবাড়ী সমন্বিত গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের মতো দৃশ্যমান মেগা অবকাঠামোগুলো দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের জীবন্ত স্মারক। এই পটভূমিতে আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চার দিনের জাপান সফর দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মাইলফলক হতে যাচ্ছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে এই সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন অংশীদারিত্বের সন্ধানে রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের প্রধানতম গুরুত্ব নিহিত রয়েছে বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও জাপানি সরাসরি বেসরকারি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের সুনির্দিষ্ট রূপরেখায়। দীর্ঘদিনের প্রথাগত সরকারি উন্নয়ন সহায়তা বা ওডিএ ঋণের গণ্ডি পেরিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করা এখন সময়ের দাবি। জাপান দূতাবাসের পক্ষ থেকেও স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, বাংলাদেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে টোকিও বিশেষ আগ্রহী। সফরকালে জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে প্রধানমন্ত্রীর মূল বক্তব্য উপস্থাপন এবং জেট্রো, জাইকা, জেবিক ও শীর্ষস্থানীয় জাপানি ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা নতুন বিনিয়োগের পথ সুগম করবে। বিশেষ করে টয়োটার মতো গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এবং ইউনিক্লোর সদর দপ্তর পরিদর্শন কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং বাংলাদেশে যন্ত্রাংশ উৎপাদন, অটোমোবাইল কারখানা স্থাপন ও তৈরি পোশাক শিল্পের উচ্চমূল্যের ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা যায়। এর সঙ্গে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) কার্যকর বাস্তবায়ন জাপানের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণে বড় চালিকাশক্তি হতে পারে।
অবকাঠামো ও বাণিজ্যের পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও উদীয়মান খাতগুলোতে সহযোগিতার পরিধি বাড়ানোর যে পরিকল্পনা রয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। জাপানের শিল্প ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে বর্তমানে তীব্র দক্ষ শ্রমিকের সংকট বিদ্যমান। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উপযুক্ত ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নার্সিং, আইসিটি ও মেকানিকস খাতে বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত দক্ষ কর্মী পাঠানোর প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া কৃষি আধুনিকায়ন, ব্লু-ইকোনমি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং চিবা প্রিফেকচারের ফুতসুর মতো এলএনজি টার্মিনাল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগগুলো দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল এনে দিতে পারে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত স্থিতিশীলতার প্রশ্নে জাপানের মতো প্রভাবশালী দেশের সমর্থন বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে শীর্ষ পর্যায়ের যেকোনো সফরের আসল সাফল্য নির্ভর করে সমঝোতা ও প্রতিশ্রুতির মাঠপর্যায়ের কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। জাপান দূতাবাস যথার্থভাবেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, বাস্তব অগ্রগতিই বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হয়। আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ সহজ করা, নীতিমালার ধারাবাহিকতা রক্ষা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস এবং বন্দরগুলোর লজিস্টিক সক্ষমতা দ্রুত উন্নত না করলে বিদেশি বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত প্রবাহ নিশ্চিত করা যাবে না। একই সঙ্গে চলমান প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছতা ও নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন টোকিও সফরটি শুধুই প্রতিশ্রুতির তালিকায় সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের এক বলিষ্ঠ ও কার্যকর দিগন্ত উন্মোচন করুক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।