ঢাকার কোরবানির হাট বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গরু-ছাগলের জটলা, দালালদের হাঁকডাক আর গোবরের পরিচিত গন্ধমাখা এক অদ্ভুত নাগরিক উপাখ্যান। কিন্তু এবারের চিত্রটা একটু ভিন্ন। হাটের ময়দানে এবার গরুর চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে ‘রাজনীতি’। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, গরুর গলায় ঘণ্টা থাকুক বা না থাকুক, ইজারাদারদের গলায় রাজনৈতিক পরিচয়ের অদৃশ্য সাইনবোর্ড ঝুলছে। কে বিএনপি, কে জামায়াত, আর কে এনসিপি—তা বুঝতে এখন আর পোস্টারের প্রয়োজন হয় না, দরপত্রের খাম খুললেই রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ স্পষ্ট হয়ে যায়।
দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে ঢাকার পশুর হাটগুলো ছিল একপ্রকার রাজনৈতিক জমিদারির অংশ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই হাটগুলো এমন এক ‘সংরক্ষিত এলাকা’ ছিল, যেখানে প্রতিযোগিতার শব্দটি কেবল অভিধানেই মিলত, বাস্তবে নয়। তখন বিএনপি বা জামায়াতের কোনো নেতা দরপত্র কিনতে গেলে এমন দৃষ্টিতে তাকানো হতো, যেন তিনি কোরবানির ক্রেতা নন, বরং রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আসামি! কিন্তু সময় বড়ই বিচিত্র। আগে যারা হাটের রাজা ছিলেন, তারা এখন খবরের কাগজের অতীত উদ্ধৃতি। আর যারা একসময় দূরে দাঁড়িয়ে কেবল ধুলো ওড়া দেখতেন, তারা আজ দরপত্রের বাক্সে কোটি কোটি টাকার পে-অর্ডার ফেলছেন। আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীর অস্থায়ী পশুর হাট নিয়ে যে দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে, তা এককথায় ‘গণতন্ত্রের কোরবানির সংস্করণ’।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এবার ঈদের দিনসহ মোট পাঁচ দিনের জন্য ১২টি অস্থায়ী হাটের দরপত্র উন্মুক্ত করেছে। বহুদিন পর এই হাটগুলো নিয়ে সত্যিকারের একটি প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। এতদিন যারা সিন্ডিকেট করে জলের দরে হাট বাগিয়ে নিতেন, সেখানে এবার দর হাঁকানো হচ্ছে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত।
প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় চমক দেখা গেছে দনিয়া কলেজের পূর্বপাশ ও সন্টেক মহিলা মাদ্রাসার সংলগ্ন হাটে। গত বছর এই হাটটি নিয়েছিলেন স্থানীয় বিএনপি নেতা তারিকুল ইসলাম তারেক (নেপথ্যে ছিলেন নবীউল্লাহ ও সাবেক কমিশনার জুম্মান)। এবার তারেক সাহেব ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকার পে-অর্ডার জমা দিলেও রহস্যজনকভাবে দর লিখেননি। আর ঠিক এই সুযোগেই স্থানীয় জামায়াত নেতা শামীম খানের প্রতিষ্ঠান ‘কেবি ট্রেড’ সরাসরি ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকার বিশাল দর হাঁকিয়ে বসে! এত বড় অঙ্কের দর দেখে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারাও হয়তো মনে মনে ‘বিসমিল্লাহ’ পড়ে ফেলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত এই হাটের সিদ্ধান্ত এখনো ঝুলে আছে।
অন্যদিকে, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট সংলগ্ন নদীর পাড়ের হাটটির সরকারি মূল্য ছিল ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। সেখানে বিএনপি নেতা কাজী মাহবুব মওলা হিমেল ৪ কোটি ১ লাখ টাকার বিশাল দর দিয়ে হাটটি নিয়েছেন। তবে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীও ছেড়ে কথা বলেননি, তিনি দর দিয়েছিলেন ৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা। অর্থাৎ, কোরবানির বাজারে এখন আর শুধু পশুর দামই বাড়ে না, রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার পারদও বাড়ে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা যত বাড়ে, ধাক্কাধাক্কিও পাল্লা দিয়ে বাড়ে। গত ২৭ এপ্রিল দক্ষিণ নগরভবনের সম্পত্তি বিভাগে ঠিক এমনই এক দৃশ্য দেখা গেছে, যাকে অত্যন্ত ভদ্র ভাষায় ‘ধাক্কাধাক্কি’ বলা হচ্ছে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সেখানে কনুই, কাঁধ, বুক ও গলার পেশির সম্পূর্ণ ‘গণতান্ত্রিক ব্যবহার’ হয়েছে।
যাত্রাবাড়ীর কাজলা, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট এবং শ্যামপুর কদমতলী ট্রাকস্ট্যান্ড সংলগ্ন হাটের দরপত্র সংগ্রহকে কেন্দ্র করে শ্যামপুর থানা জামায়াতের আমির মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের অনুসারীদের সঙ্গে বিএনপি নেতা হিমেল ও শ্যামলের লোকজনের তুমুল বাদানুবাদ ও ধাক্কাধাক্কি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শেষমেশ অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করতে হয়। সহজ কথায়—গরু এখনো হাটে ওঠেনি, কিন্তু মানুষ আগেই রাজনৈতিক ‘শিং’ বের করে ফেলেছে।
পুরো দৃশ্যটাকে দেখে কেউ যদি ভাবেন যে হাটে এবার শতভাগ সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা হচ্ছে, তবে তিনি সম্ভবত বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে এখনো শিশু শ্রেণিতে পড়েন। কারণ, এই প্রতিযোগিতার ভেতরেও রয়েছে সিন্ডিকেটের সূক্ষ্ম খেলা।
অভিযোগ উঠেছে, কৌশলে হাটের নাম ও সীমানা পাল্টে আয়তন কম দেখিয়ে সরকারি মূল্য কমিয়ে দেওয়া হয়েছে:
যাত্রাবাড়ীর কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ি হাট: এই হাটের সরকারি মূল্য এবার ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। অথচ গত বছর ‘দনিয়া কলেজের পূর্বপাশ’ নামে পরিচিত একই এলাকার হাটের সরকারি মূল্য ছিল ৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা। শুধু কাগজের নাম বদলে দিয়ে দাম কমানো হয়েছে।
হাজারীবাগ হাট: হাজারীবাগের ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি কলেজের পূর্বপাশের হাটটির সরকারি মূল্য গত বছর ছিল ৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এবার সেটিকে সামান্য সরিয়ে শিকদার মেডিকেল কলেজ সংলগ্ন আমির মোহাম্মদ গ্রুপের খালি জায়গায় নেওয়া হয়েছে, আর তাতেই সরকারি মূল্য কমে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ২০ লাখ টাকায়।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) অবশ্য বিএনপির আধিপত্য বেশ স্পষ্ট। এখানে জামায়াত বা এনসিপির উপস্থিতি দক্ষিণের মতো ততটা জোরালো নয়। তবে এখানে দরের অঙ্ক চোখ কপালে তোলার মতো। দিয়াবাড়ির বউবাজার এলাকার হাটের জন্য ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শেখ ফরিদ হোসেন দর দিয়েছেন ১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা! এই অঙ্ক শুনে সাধারণ মানুষের মনে হতে পারে, এখানে সাধারণ গরু নয়, বরং হীরা-জহরত খচিত কোনো প্রাণী বিক্রি হবে।
বিপরীত চিত্রও আছে। খিলক্ষেত, মেরুল বাড্ডা, বসিলা ও ভাটারা সুতিভোলা খালের হাটগুলোতে কোনো দরপত্রই জমা পড়েনি। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, ঢাকার আকাশে এখনো সিন্ডিকেটের ভূত দিব্যি উড়ে বেড়াচ্ছে।
এই পুরো আখ্যান আসলে শুধু পশুর হাটের গল্প নয়; এটি মূলত ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস ও আধিপত্য বিস্তারের গল্প। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ একচ্ছত্র আধিপত্যের পর রাজধানীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রগুলোতে নতুন করে জায়গা দখলের যে লড়াই শুরু হয়েছে, পশুর হাট তার সবচেয়ে নগ্ন উদাহরণ। এখানে রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে জায়গার দখল, প্রভাব, টাকা আর নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি জরুরি। টেন্ডারের বাক্সের সামনে এসে সব রাজনৈতিক মতবাদই শেষ পর্যন্ত হিসাববিজ্ঞানের অঙ্কে পরিণত হয়।
অবশ্য ইতিবাচক দিক হলো, বহু বছর পর অন্তত একটা প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে এবং সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয় বাড়ছে। তবে সাধারণ ক্রেতার মনে শঙ্কা একটাই—ইজারার এই আকাশচুম্বী দরের প্রভাব কোরবানির পশুর মূল্যের ওপর পড়বে না তো?
ঈদের হাটে মানুষ যায় গরু কিনতে। কেউ দাঁত দেখে, কেউ লেজ ধরে, কেউ পিঠ চাপড়ে দাম ঠিক করে। কিন্তু ঢাকার এই রাজনৈতিক হাটে মানুষ দেখছে ভিন্ন এক দৃশ্য—এখানে গরুর চেয়েও বড় পশু হলো ‘ক্ষমতা’। আর সেই ক্ষমতার জন্যই নগরভবনের করিডরে এখন গরুর ‘হাম্বা’ ডাকের চেয়ে রাজনৈতিক হিসাবের খসখসানিই বেশি শোনা যাচ্ছে।