• বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:০২ অপরাহ্ন

বিকল রাডারে অন্ধ দেশের আবহাওয়া ও বিমান খাত

Reporter Name / ৪ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম ও রুদ্ররূপের সামনে মানুষ চিরকালই এক প্রকার অসহায় ও দুর্বল। কিন্তু ভাবুন তো, যদি কোনো এক মহা দুর্যোগ বা প্রলয়ংকরী ঝড়ের মুখে আমরা দেশের কোটি কোটি মানুষ সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে যাই? যদি ধেয়ে আসা নিশ্চিত বিপদের নিখুঁত আগাম সংকেতটাই আমরা ঠিক সময়ে আর হাতে না পাই? ঠিক এমনই এক চরম জাতীয় ও কৌশলগত সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে এখন আমাদের বাংলাদেশ। দেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের একের পর এক অত্যাধুনিক রাডার এখন সম্পূর্ণ অকেজো ও অচল হয়ে পড়ে রয়েছে। কোনোটি নিয়মিত সংস্কারের অভাবে বছরের পর বছর ধরে বন্ধ, কোনোটি সামান্য যন্ত্রাংশ বা পার্টস না পেয়ে মৃতপ্রায় অবস্থায় পড়ে আছে, আবার কোনোটি যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে দুদিন পর পরই বিকল হয়ে পড়ছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা এই প্রযুক্তির এমন করুণ দশা দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জাতীয় নিরাপত্তাকে এক বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

অনেকেই মনে করতে পারেন যে, বর্তমান আধুনিক যুগে যখন উন্নত স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ রয়েছে, তখন ভূপৃষ্ঠে কোটি টাকা খরচ করে রাডার সচল রাখার কী প্রয়োজন? এই সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ধারণাটির পার্থক্য আমাদের সহজ ভাষায় বুঝতে হবে। স্যাটেলাইট মূলত অবস্থান করে মহাকাশে। সে সুদূর ওপর থেকে মেঘের উপরিভাগের ছবি তুলে ঝড় কবে নাগাদ কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে, তার একটি সামগ্রিক বা বড় ছবি আমাদের দিতে পারে। কিন্তু সেই ঘন মেঘের ভেতর ঠিক কী লুকিয়ে আছে বা তার তীব্রতা কতখানি, তা কিন্তু স্যাটেলাইট নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে না। ঠিক এখানেই অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে ভূপৃষ্ঠের রাডার ব্যবস্থা। রাডার মূলত ভূপৃষ্ঠ থেকে শক্তিশালী বেতার তরঙ্গ আকাশে পাঠায়। সেই তরঙ্গ মেঘ ও বৃষ্টির জলকণায় বাধা পেয়ে পুনরায় রাডারে ফিরে আসে। এর ফলে রাডার নিখুঁতভাবে মেপে দিতে পারে যে মেঘে ঠিক কতটুকু পানি জমা আছে এবং কত মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হতে পারে। একই সাথে বৃষ্টি ঠিক কখন, কোথায় এবং কত জোরে নামবে, এমনকি হঠাৎ ধেয়ে আসা টর্নেডো বা বজ্রপাতের আগাম নিখুঁত বার্তাও দিতে পারে এই রাডার। সহজ কথায়, স্যাটেলাইট যদি দূরবিন হয়, তবে রাডার হলো এক্সরে মেশিন, আর ঝড়ের নিখুঁত পূর্বাভাসের জন্য এই দুটি প্রযুক্তিই সমান জরুরি।

বর্তমানে বাংলাদেশে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের জন্য মোট পাঁচটি কৌশলগত স্থানে রাডার স্থাপন করা আছে। এই পাঁচটি কেন্দ্র হলো গাজীপুর, রংপুর, কক্সবাজার, মৌলভীবাজার এবং পটুয়াখালী। কিন্তু এই রাডারগুলির ইতিহাস ও বর্তমান পরিচালনাগত অবস্থা বিশ্লেষণ করলে এক আশঙ্কাজনক চিত্র সামনে আসে। বিগত ২০০৭ এবং ২০০৮ সালের দিকে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় পটুয়াখালীর খেপুপাড়া ও পর্যটন শহর কক্সবাজারে দুটি আধুনিক রাডার বসানো হয়েছিল। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, একটি আবহাওয়া রাডারের গড় আয়ু থাকে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২ বছর। আর সেই হিসাবে ২০১৯ সালের মধ্যেই এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাডারের কার্যকারিতার মেয়াদ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘদিন বিকল থাকার পর এগুলোর আধুনিকায়নের কাজ শুরু হলেও তা করা হয়েছে অত্যন্ত দায়সারাভাবে। ফলশ্রুতিতে, কক্সবাজারের রাডারটি গত প্রায় তিন বছর ধরে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে আছে এবং খেপুপাড়ার রাডারটি বন্ধ রয়েছে দীর্ঘ আট বছর ধরে।

অনুরূপভাবে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরক্ষায় নিয়োজিত মৌলভীবাজারের রাডারটিও কয়েক বছর ধরে সম্পূর্ণ অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অন্যদিকে, ঢাকা ও রংপুরের রাডার দুটি ১৯৯৯ সালে স্থাপিত হয়েছিল। এই পুরনো রাডার দুটি অনেক আগেই তাদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়েছিল। এরপর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর জাইকার অর্থায়নে ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা ও রংপুরে নতুন প্রযুক্তির ডপলার রাডার প্রতিস্থাপন করা হয়। কিন্তু চরম দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনের কিছুদিন যেতে না যেতেই সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এই নতুন রাডারগুলিও মারাত্মক কারিগরি ত্রুটিতে আক্রান্ত হয়। এর মূল কারণ হলো, বিপুল অর্থ খরচ করে প্রযুক্তি কেনা হলেও সঠিক সময়ে সেগুলির সার্ভিসিং করা হয় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি না করে বিদেশী প্রকৌশলীদের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল থাকাই এই সংকটের প্রধান কারণ।

এই কারিগরি ব্যর্থতার ফলে আমরা কতটা ঝুঁকিতে আছি এবং রাডার নষ্ট থাকলে ক্ষতিটা কার হচ্ছে, তা একটু তলিয়ে দেখা দরকার। এই চরম ক্ষতি কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সংস্থার নয়, বরং সাধারণ মানুষের এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির। রাডার সচল না থাকলে হঠাৎ ধেয়ে আসা কালবৈশাখী ঝড়ের সবশেষ মুহূর্তের লাইভ পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব হয় না, যার ফলে গ্রামীণ জনপদে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। এছাড়া বজ্রপাতের সঠিক সময় ও সুনির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করা যায় না, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের অন্যতম বড় মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকটের কারণে সবচেয়ে বড় বিপদে পড়েন আমাদের উপকূলের লাখো জেলেরা, যারা সাগরে আকস্মিক ঝড়ের কবলে পড়ে প্রাণ হারান।

আবহাওয়ার পাশাপাশি রাডারের ওপর প্রচণ্ডভাবে নির্ভরশীল আমাদের বিমান পরিষেবাও। ত্রুটিপূর্ণ বা অচল রাডারের কারণে দেশের আকাশসীমায় বিমান চলাচলে চরম নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিমান চলাচলের রাডার হলো এমন এক অপরিহার্য ও সংবেদনশীল প্রযুক্তি যা আকাশের প্রতিটি উড়োজাহাজের অবস্থান, গতি, উচ্চতা এবং দিক নিখুঁতভাবে নির্ণয় করে আকাশপথের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। উড়োজাহাজ ট্র্যাকিং করা, মাঝ আকাশে দুটি বিমানের সংঘর্ষ এড়ানো এবং ঝোড়ো হাওয়া বা বজ্রঝড়ের মতো প্রতিকূল আবহাওয়া শনাক্ত করে বিমানকে নিরাপদ বিকল্প পথ দেখানো ও অবতরণে সহায়তা করা রাডারের মূল কাজ। তবে আশার কথা হলো, দেশের বিমান চলাচলের নিরাপত্তার জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামে নতুন আধুনিক রাডার বসানো হয়েছে, কিন্তু আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার রাডারগুলো এখনো অকেজোই রয়ে গেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের এই যুগে এসে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাসের রাডার বিকল থাকা আসলে আমাদের নীতিনির্ধারকদের এক চরম ব্যর্থতা।

এই অন্ধকার পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য বিশেষজ্ঞরা কিছু বাস্তবমুখী পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, প্রযুক্তি শুধু বিদেশ থেকে কোটি টাকায় কিনলেই হবে না, তা সচল রাখার আন্তরিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। প্রথমত, আমাদের নিজস্ব দেশীয় প্রকৌশলীদের উচ্চতর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে হবে, যাতে ছোটখাট পার্টস বা সফটওয়্যার সমস্যার জন্য বিদেশী কোম্পানির দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকা বন্ধ হয়। দ্বিতীয়ত, রাডার রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়মিত সার্ভিসিংয়ের জন্য বাজেটে স্থায়ী বরাদ্দ রাখতে হবে এবং এর জন্য কঠোর টেকনিক্যাল অডিট করা প্রয়োজন। প্রকৃতির রুদ্র আচরণের ওপর মানুষের কোনো হাত নেই, কিন্তু প্রযুক্তির সঠিক ও সময়োপযোগী ব্যবহারের মাধ্যমে হাজারো মানুষের জীবন ও দেশের সম্পদ বাঁচানো সম্ভব। হয়তো কোনো একদিন নীতিনির্ধারকদের ঘুম ভাঙবে এবং সচল হবে দেশের প্রতিটি রাডার।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category