বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান কেবল ক্ষমতার পালাবদলই ঘটায়নি, বরং নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের এক বিশাল সুযোগও তৈরি করেছে। দেশের মানুষ যখন প্রথাগত দ্বিদলীয় রাজনীতির বাইরে একটি সুস্থ, দুর্নীতিমুক্ত ও জনবান্ধব ‘তৃতীয় শক্তি’ বা বিকল্প রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের সন্ধান করছে, ঠিক তখনই সেই শূন্যস্থান পূরণের লক্ষ্যে আটঘাট বেঁধে মাঠে নেমেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটি দেশজুড়ে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করার এক অভিনব কৌশল গ্রহণ করেছে। আর এই কৌশলের মূল ভিত্তি হলো—ডান, বাম, মধ্যপন্থী কিংবা সাবেক ক্ষমতাসীন দল, সব মত ও পথের পরিচ্ছন্ন এবং দেশপ্রেমিক নেতাদের এক ছাদের নিচে নিয়ে আসা।
স্থানীয় নির্বাচনের আগে ত্রিমাত্রিক কৌশল
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যেকোনো নতুন রাজনৈতিক দলের শক্তিমত্তা প্রমাণের প্রথম ও প্রধান পরীক্ষা হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এনসিপি সেই বিষয়টি অনুধাবন করেই মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট কৌশলে নিজেদের বিস্তার ঘটাচ্ছে। প্রথমত, নতুন করে সারা দেশে ব্যাপক দলভুক্তি বা সদস্য সংগ্রহ অভিযান; দ্বিতীয়ত, সমমনা সহযোগী ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে দলীয় ছাতার নিচে যুক্ত করা; এবং তৃতীয়ত, চব্বিশের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের ধারাবাহিকতাকে কেন্দ্র করে তরুণ প্রজন্মকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক রূপ দেওয়া। দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগেই তৃণমূল পর্যায়ে এই তিন কৌশলের সফল বাস্তবায়ন ঘটাতে পারলে এনসিপি দেশের রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী ‘বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।
ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক উত্তরসূরিদের অন্তর্ভুক্তি
এনসিপির সবচেয়ে বড় চমক দেখা যাচ্ছে তাদের সদস্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে। তারা শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বরং দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক দলের হেভিওয়েট নেতাদের উত্তরসূরিদের দলে টানছে। গত মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলামোটরে দলের অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে বেশ কয়েকজন আলোচিত মুখ এনসিপিতে যুক্ত হন।
এই যোগদান অনুষ্ঠানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছোট ছেলে ড. মোহাম্মদ নাদিমুর রহমান। তিনি বর্তমানে তুরস্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকায় সশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারলেও অনলাইনে যুক্ত হয়ে এনসিপির প্রতি তার একাত্মতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে দলে যুক্ত হয়েছেন ব্রিটিশবিরোধী ফরায়েজী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা হাজি শরীয়তুল্লাহর বংশধর আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হোসাইন। এছাড়া গাজীপুরের প্রবীণ বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অধ্যাপক এম এ এইচ আরিফও দলটির পতাকাতলে শামিল হয়েছেন। এই ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে আসা ব্যক্তিদের একই মঞ্চে উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, এনসিপি একটি সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা করছে।
তারুণ্যের শক্তিতে বলীয়ান ‘ওয়ারিয়র্স অব জুলাই’
কেবল ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সদস্যরাই নন, এনসিপির বড় ভরসার জায়গা এখন জুলাই বিপ্লবের তরুণরা। মঙ্গলবারের যোগদান অনুষ্ঠানে গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী সংগঠন ‘ওয়ারিয়র্স অব জুলাই’-এর প্রায় ৫০ জন সদস্য সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। সংগঠনটির নেতাদের দাবি, তাদের প্রায় ৪ হাজার সদস্য ইতোমধ্যে এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। এই বিপুলসংখ্যক তরুণ এবং আন্দোলনকারীর অন্তর্ভুক্তি দলটির মাঠপর্যায়ের শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে গত ২৪ এপ্রিলও দলটিতে বেশ কিছু আলোচিত মুখ যুক্ত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি ফেরসামিন হক ইকবাল (ফ্লোরা), বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ইসহাক সরকার, তরুণ প্রজন্মের কাছে পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর নুরুজ্জামান কাফি এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রেলওয়ের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম নিয়ে একক আন্দোলন করে দেশব্যাপী তুমুল আলোচনায় আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন রনি।
ডান-বামের মিশেল এবং ‘মধ্যমপন্থী’ নীতি
সম্প্রতি কয়েকজন সাবেক ছাত্রশিবির নেতার এনসিপিতে যুক্ত হওয়ার গুঞ্জনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে এমন একটি আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে যে, দলটিতে হয়তো বামপন্থীদের কোণঠাসা করে ডানপন্থীদের উত্থান ঘটছে। তবে দলের শীর্ষ নেতারা এই জল্পনা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছেন। এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ দলীয় আদর্শের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, ‘আমরা মধ্যমপন্থী। এখানে ডান, বাম সকলেই আছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সামাজিক আন্দোলনকর্মী—যাঁরা দেশের ইতিবাচক পরিবর্তন চাচ্ছেন, যাঁদের সঙ্গে কোনো দুর্নীতি, অস্ত্রবাজি, সন্ত্রাস বা চাঁদাবাজির মতো অপরাধের সংশ্লিষ্টতা নেই, আমরা তাঁদের সবাইকে জায়গা করে দিচ্ছি।’
আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের জন্যও উন্মুক্ত দ্বার
এনসিপির রাজনৈতিক কৌশলের সবচেয়ে সাহসী এবং ব্যতিক্রমী দিকটি হলো বিগত সরকারের দল আওয়ামী লীগ বা তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের পরিচ্ছন্ন নেতাদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। দলের নেতারা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের ট্যাগ থাকলেই কাউকে অচ্ছুত মনে করা হবে না।
দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘যাঁরা ছাত্রলীগের মধ্যে থেকেও জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলেন, যাঁদের বিরুদ্ধে অতীতে কোনো অপরাধ, দুর্নীতি বা ফ্যাসিবাদের দোসর হওয়ার রেকর্ড নেই, তাঁরা চাইলে নির্দ্বিধায় এনসিপিতে যুক্ত হতে পারেন।’ একই কথার প্রতিধ্বনি শোনা যায় হান্নান মাসউদের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, ‘মূল ব্যাপারটা হচ্ছে, অত্যাচারী বা জুলুমবাজ কাউকে আমরা দলে যুক্ত করব না। সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ কাউকে আমরা নেব না। কিন্তু এর বাইরে যাঁরা নিষ্কলুষ দেশপ্রেমিক আছেন, তাঁদেরকে আমরা স্বাগত জানাই।’
অপেক্ষায় আরও হেভিওয়েট নেতারা
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এনসিপির এই ‘বিকল্প শক্তি’ হয়ে ওঠার সম্ভাবনায় আকৃষ্ট হয়ে অন্য বড় রাজনৈতিক দলের অনেক প্রভাবশালী নেতাও এখন দলটিতে যোগ দেওয়ার কথা ভাবছেন। বিএনপির একজন স্থায়ী কমিটির সদস্যের সন্তানের সঙ্গে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের যোগদানের বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। এছাড়া, বিগত দিনে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হওয়া ঢাকা মহানগরীর একজন সাবেক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গেও এনসিপির যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
এর বাইরেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মনজুর আলমও এনসিপিতে যোগ দিতে পারেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। যদিও এসব বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবে স্থানীয় নির্বাচনের আগে এই ধরনের হেভিওয়েট নেতাদের যোগদান নিশ্চিত হলে তা এনসিপির জন্য একটি বড় ধরনের ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
সব মিলিয়ে, এনসিপি তাদের সদস্য সংগ্রহ ও দল গোছানোর প্রক্রিয়ায় যে অভিনবত্ব ও উদারতা দেখাচ্ছে, তা দেশের গতানুগতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এখন দেখার বিষয়, বিভিন্ন মতাদর্শ, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং প্রজন্মের এই ভিন্নমুখী স্রোতকে এনসিপি কীভাবে একটি সুশৃঙ্খল মোহনায় মেলাতে পারে এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ব্যালট বাক্সে এই ‘বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি’র দাবি কতটা প্রতিফলিত হয়।