• বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:০২ অপরাহ্ন

বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না আর্জেন্টিনার

Reporter Name / ৪ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

মাঠের ফুটবলে রোমাঞ্চকর জয় পেলেও মাঠের বাইরের এক অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবল দল। বিশ্বকাপে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ঐতিহাসিক জয়ের পর ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর আর্জেন্টিনার একচ্ছত্র অধিকার ও দাবির সমর্থনে একটি রাজনৈতিক ব্যানার প্রদর্শন করায় এখন লিওনেল মেসিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ওই ম্যাচে প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়েও শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় থমাস টুহেলের শিষ্যদের ২-১ ব্যবধানে পরাজিত করে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা। এনজো ফার্নান্দেজ ও লাউতারো মার্তিনেজের শেষ মুহূর্তের জাদুকরী গোলে জয় নিশ্চিত করে আগামী রোববারের মেগা ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার টিকিট পেয়েছে আলবিসেলেস্তেরা। তবে এই মহা-আনন্দের ক্ষণটি ম্লান হয়ে গেছে ম্যাচ শেষের এক বিতর্কিত উদযাপনের কারণে।

রেফারির ম্যাচ শেষের শেষ বাঁশি বাজার পরপরই আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা মাঠের ভেতরেই স্প্যানিশ ভাষায় লেখা একটি বিশালাকার ব্যানার হাতে নিয়ে উল্লাসে মেতে ওঠেন, যার স্পষ্ট রাজনৈতিক অর্থ ছিল “ফকল্যান্ডস আর্জেন্টিনার”। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে সেই বিতর্কিত ব্যানারটি মাঠের সবুজ ঘাসে বিছিয়ে রেখেও দীর্ঘক্ষণ পোজ দেন মেসি-মার্তিনেজরা। দক্ষিণ-পশ্চিম আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন এই ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমিকত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যে চরম কূটনৈতিক বিরোধ ও যুদ্ধংদেহী মনোভাব বিরাজ করছে। আর্জেন্টিনার পূর্ব উপকূল থেকে মাত্র ৩০০ মাইল দূরে অবস্থিত কৌশলগত এই দ্বীপপুঞ্জকে কেন্দ্র করে বিগত ১৯৮২ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দুই দেশের সামরিক বাহিনী এক রক্তক্ষয়ী ও বিধ্বংসী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। ৭৪ দিন স্থায়ী সেই ঐতিহাসিক সংঘাতের ফলে ৬৫৫ জন আর্জেন্টাইন এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনাসদস্য নিহত হন, যার ক্ষত আজও দুই দেশের মানুষের মনে সতেজ রয়েছে।

ফুটবল মাঠে আর্জেন্টিনার এমন রাজনৈতিক ও উসকানিমূলক আচরণ অবশ্য এবারই প্রথম নয়। এর আগে বিগত ২০১৪ সালে স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ শুরুর আগেও ঠিক একই বার্তা সংবলিত ব্যানার প্রদর্শন করেছিল আর্জেন্টাইন ফুটবলাররা। সেই সময় ফিফা অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দলের অসদাচরণ সংক্রান্ত শৃঙ্খলা বিধি লঙ্ঘনের দায়ে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে (এএফএ) ২০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করেছিল। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী, ফুটবল ম্যাচ চলাকালীন বা মাঠের ভেতরে যেকোনো ধরণের রাজনৈতিক, ধর্মীয় কিংবা ব্যক্তিগত বার্তা প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফলে সেমিফাইনালের মতো মেগা মঞ্চে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এমন স্পর্শকাতর ব্যানার প্রদর্শন করায় এবার আর্জেন্টিনার ওপর আরও বড় ধরণের নিষেধাজ্ঞা বা বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানা নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করছেন ফুটবল বোদ্ধারা।

এদিকে, সেমিফাইনালের এই ঐতিহাসিক বিজয়ের পর আর্জেন্টিনার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এর তীব্র হাওয়া লেগেছে। দলটির এই বিতর্কিত উদযাপনকে প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে আর্জেন্টিনার কট্টরপন্থী ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিসারুয়েল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) একটি আবেগঘন পোস্টে লিখেছেন, “এটি আমাদের জন্য কেবল আরেকটি সাধারণ ফুটবল ম্যাচ ছিল না”। নিজের ওই পোস্টের সাথে আর্জেন্টিনার ফকল্যান্ড যুদ্ধের বীর সেনাদের একটি স্মারক ভিডিও যুক্ত করে তিনি ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য করে আরও লেখেন, “তারা এই ব্যানারগুলো স্টেডিয়ামের ভেতরে নিয়ে যেতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিল, কিন্তু তারা হয়তো ভুলে গেছে যে আমরা এই ফকল্যান্ডসকে আমাদের রক্তে এবং হৃদয়ে বহন করি”। ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেও তিনি এক বিবৃতিতে উসকানিমূলক মন্তব্য করে বলেছিলেন যে, এই সেমিফাইনালটি ছিল মূলত “আগ্রাসনকারীদের তাদের আসল জায়গা দেখিয়ে দেওয়ার” একটি মোক্ষম সুযোগ।

চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের এমন অতি-উগ্র জাতীয়তাবাদী আচরণ বেশ কয়েকবার নজরে এসেছে। এর আগে শেষ ষোলোর রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে মিসরের বিপক্ষে নাটকীয় ৩-২ ব্যবধানে জয়লাভ করার পরও ড্রেসিংরুমে এবং মাঠে খেলোয়াড়রা ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ এবং আর্জেন্টিনার দুই ফুটবল ঈশ্বর ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসিকে উল্লেখ করে প্রতিপক্ষকে খোঁচা দিয়ে নানাবিধ জয়সূচক স্লোগান দিয়েছিলেন। তবে মাঠের খেলোয়াড় ও দেশের রাজনৈতিক নেতারা যুদ্ধের আবহ তৈরি করলেও, আর্জেন্টিনার শান্ত স্বভাবের মাস্টারমাইন্ড কোচ লিওনেল স্কালোনি কিন্তু ম্যাচের আগে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও পেশাদার লাইনে কথা বলেছিলেন। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন যে, তিনি মাঠের ফুটবল ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে কোনোভাবেই “একসঙ্গে মেলাতে যাচ্ছেন না”।

স্কালোনি অত্যন্ত পরিপক্বতার সাথে সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, “বাস্তবতা হলো এটি কেবলই একটি ফুটবল ম্যাচ। আমি এই দুই ভিন্ন বিষয়কে গুলিয়ে ফেলতে পারি না, বিশেষ করে বহু বছর আগে যুদ্ধের ময়দানে যা ঘটে গেছে, সেই দুঃখজনক ঘটনার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর খাতিরেই রাজনীতি দূরে রাখা উচিত। এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও দুঃখের সময় ছিল, এবং বাস্তবতা হলো এই রাজনৈতিক বিষয়ে আমাদের ফুটবলারদের করার মতো খুব বেশি কিছু নেই। বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও প্রতিনিয়ত নানা যুদ্ধ-বিগ্রহ ঘটছে এবং আমরা সবসময়ই যুদ্ধের অস্তিত্বের তীব্র সমালোচনা করি। অবশ্যই আমরা আমাদের শহীদ সেনাদের স্মরণ করি, কিন্তু এটি একটি স্রেফ স্পোর্টিং ইভেন্ট, আমাদের এই দুটিকে এক করা ভুল হবে”।

এনজো ও লাউতারোর শেষ মুহূর্তের জোড়া গোলে ইংল্যান্ডের হৃদয় ভেঙে যাওয়ার এই ম্যাচটি দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার কারণে আগে থেকেই চরম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ছিল। ফলে স্টেডিয়াম ও তার আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে ম্যাচটি আয়োজন করতে হয়েছিল মার্কিন প্রশাসনকে। খেলা শেষে মাঠের ভেতরে উত্তেজনা ছড়ালেও ইংল্যান্ড দলের অধিনায়ক হ্যারি কেইন অত্যন্ত খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতা দেখিয়ে মাঠেই আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের অভিনন্দন জানান। তবে মাঠের পরিবেশ শান্ত থাকলেও, ফিফার শৃঙ্খলা কমিটির টেবিল এখন আর্জেন্টিনার এই ব্যানার কাণ্ডের নথিতে উত্তপ্ত। ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার আগে লিওনেল মেসির দলের ওপর ফিফার কোনো নিষেধাজ্ঞা বা শাস্তির খড়্গ নেমে আসে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category