প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের মূল দাম বা ট্যারিফের বাইরে এবার নতুন করে একটি বিশেষ পরিচালনা ব্যয় বা চার্জ যুক্ত হতে যাচ্ছে। ক্রস-বর্ডার বা আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের গ্রিড অপারেশন, শিডিউলিং, মিটারিং এবং সামগ্রিক লেনদেন সুচারুভাবে নিষ্পত্তি করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের ওপর ‘সেটেলমেন্ট নোডাল এজেন্সি’ বা এসএনএ চার্জ আরোপের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ভারতের রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান এনটিপিসি বিদ্যুৎ ব্যাপার নিগম লিমিটেড বা এনভিভিএনের সঙ্গে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের এই সংক্রান্ত একটি নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে এই বিষয়ে দাপ্তরিক মতামত চেয়ে অর্থ বিভাগে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে, যার ফলে আমদানিকৃত বিদ্যুতের সার্বিক খরচের ওপর দীর্ঘমেয়াদে একটি বাড়তি আর্থিক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে ভারতীয় পক্ষ থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের বিপরীতে এক ভারতীয় পয়সা হারে এই চার্জ আদায়ের প্রস্তাব দেওয়া হলেও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে নিবিড় দরকষাকষির মাধ্যমে তা কমিয়ে প্রতি ইউনিটে শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ ভারতীয় রুপি বা আধা পয়সায় নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থ বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে যে ভারতের নিজস্ব বিদ্যুৎ আইন ও সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি রেগুলেটরি কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী এই চুক্তি স্বাক্ষর করা অত্যন্ত বাধ্যতামূলক। যদি কোনো কারণে এই চুক্তি স্বাক্ষরে বা দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অনাবশ্যক বিলম্ব ঘটে, তবে বাংলাদেশমুখী প্রায় এক হাজার একশ ষাট মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির পুরো প্রক্রিয়াটি আকস্মিক ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই চার্জের পরিমাণ আপাতদৃষ্টিতে খুচরা মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে এর চূড়ান্ত আর্থিক বহর বেশ বড় আকার ধারণ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
উল্লেখ্য, প্রতি ইউনিট বলতে এক কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ শক্তিকে বোঝানো হয় এবং এই হিসাবে নির্ধারিত এসএনএ চার্জ নিয়মিত বিদ্যুৎ মূল্যের সঙ্গে আলাদাভাবে যোগ হবে। এর আগে থেকেই নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে ভারতের বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একই ধরনের এসএনএ চার্জ প্রযোজ্য রয়েছে এবং তাদেরও প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ঠিক একই হারে এই পরিচালনা ব্যয় বহন করতে হয়। ভারতের আঞ্চলিক গ্রিডে বাংলাদেশকে একটি স্বতন্ত্র কন্ট্রোল এরিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয় বিধায় এনার্জি অ্যাকাউন্টিং এবং ডেভিয়েশন চার্জসহ নানা ধরনের অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ নিষ্পত্তির জন্যই এই কাঠামোগত ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। বর্তমান চুক্তির আওতায় আসা কেন্দ্রগুলো থেকে প্রতি ঘণ্টায় যে পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানি হয়, তার ওপর ভিত্তি করে এই নতুন চার্জ নিয়মিত পরিশোধ করতে হবে।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বাণিজ্যিক চুক্তির আওতায় ভারত থেকে সবমিলিয়ে প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে এনভিভিএনের মাধ্যমে এনটিপিসি, দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন, ত্রিপুরা এবং সেম্বকর্পের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসা মোট ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ক্ষেত্রেই মূলত এই নতুন এসএনএ চুক্তি কার্যকর হতে যাচ্ছে। তবে আদানি পাওয়ারের ঝাড়খণ্ডের গড্ডা প্ল্যান্ট থেকে যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ আনা হয়, তার মূল ক্রয় চুক্তির মধ্যেই এই ধরনের গ্রিড চার্জ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো পূর্বে থেকেই অন্তর্ভুক্ত থাকায় সেটির জন্য আলাদা কোনো চুক্তি করার প্রয়োজন পড়ছে না। দেশীয় গ্যাস ও জ্বালানির তীব্র সংকট এবং উৎপাদন সীমাবদ্ধতার কারণে জাতীয় চাহিদার বড় একটা অংশ যখন আমদানির মাধ্যমে মেটাতে হচ্ছে, তখন এই অতিরিক্ত এসএনএ চার্জ যুক্ত হওয়া দেশের বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নতুন এক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসবে।