হরমুজ প্রণালিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথা ও ঘুম হারাম করার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ইরানের নৌবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডার আলিরেজা তাংসিরি। অবশেষে এই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী কমান্ডারের মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে ইরান। সোমবার (৩০ মার্চ) ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর এক বিবৃতির বরাত দিয়ে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা (IRNA) জানিয়েছে, গুরুতর আঘাতজনিত কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন আক্ষরিক অর্থেই এক নতুন এবং ভয়াবহ মোড় নিয়েছে।
ইসরায়েলি নিখুঁত অভিযানের দাবি ও আইআরজিসির স্বীকৃতি
কমান্ডার তাংসিরির মৃত্যু নিয়ে গত কয়েক দিন ধরেই আন্তর্জাতিক মহলে নানা গুঞ্জন চলছিল। এর আগে গত সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন যে, ইসরায়েলি বাহিনীর পরিচালিত একটি ‘নিখুঁত ও প্রাণঘাতী অভিযানে’ আলিরেজা তাংসিরি এবং তাঁর সঙ্গে থাকা আইআরজিসির আরও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী বন্দর আব্বাসে এক সুপরিকল্পিত হামলা চালিয়ে তাঁকে ‘নিষ্ক্রিয়’ করা হয়েছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার যে হুমকি ইরান বারবার দিয়ে আসছিল, তার নেপথ্যের প্রধান কারিগর ছিলেন এই তাংসিরি। অবশেষে আইআরজিসি তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি স্বীকার করে নেওয়ায় ইসরায়েলি দাবির সত্যতাই জোরালো হলো।
কূটনীতির আড়ালে মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি ও যুদ্ধকৌশল
তাংসিরির মৃত্যুর খবরের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে উঠে এসেছে আরেক ভয়াবহ তথ্য। জানা গেছে, কূটনৈতিক উপায়ে সংকট সমাধানের আনুষ্ঠানিক চেষ্টার আড়ালে ইরানে চূড়ান্ত ও সর্বাত্মক হামলা চালানোর জন্য ভেতরে ভেতরে প্রস্তুত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। টানা এক মাস ধরে চলা উত্তেজনার পর ওয়াশিংটন এখন স্থল ও আকাশপথে অভিযানের ছক কষছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন বাহিনী যদি ইরানে হামলা শুরু করে, তবে এর প্রথম ধাপটি হবে একটি সর্বাত্মক ‘ইলেকট্রনিক যুদ্ধ’। এই ধাপে উচ্চ প্রযুক্তির সাহায্যে ইরানের রাডার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক যোগাযোগের সব নেটওয়ার্ক অচল বা জ্যাম করে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। এরপরই শুরু হবে ব্যাপক ও ধ্বংসাত্মক বিমান হামলা, যার মূল লক্ষ্য হবে ইরানের সামরিক অবকাঠামো এবং প্রতিরক্ষা বর্ম গুঁড়িয়ে দেওয়া। সামরিক পরিভাষায় এই ধাপগুলোকে মূল আক্রমণের আগের ‘প্রস্তুতিমূলক অভিযান’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
টার্গেটে ইরানের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপসমূহ
মার্কিন বাহিনীর সম্ভাব্য এই সামরিক অভিযানের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হতে পারে পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের কৌশলগত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ‘খারগ দ্বীপ’। এই দ্বীপটি ইরানের অর্থনীতির লাইফলাইন, কারণ এখান থেকেই দেশটির মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ পরিচালিত হয়।
এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ ‘আবু মুসা দ্বীপ’ এবং এর আশপাশের ছোট ছোট দ্বীপগুলোও মার্কিন বাহিনীর নিশানায় থাকতে পারে। পাশাপাশি আরেকটি বড় লক্ষ্য হতে পারে ‘কেশম দ্বীপ’। এটি আকারে বেশ বড় এবং মূল ভূখণ্ডের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস থাকা এই দ্বীপে ইরান ড্রোন ও অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণের জন্য মাটির নিচে সুবিশাল টানেল বা সুড়ঙ্গ তৈরি করেছে বলে ধারণা করা হয়।
বিশ্লেষকদের সতর্কতা: ফাঁদ হতে পারে স্থল অভিযান
দ্বীপ দখলের এই মার্কিন পরিকল্পনাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে সতর্ক করেছেন সাবেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, বিশাল নৌবহর বা বড় যুদ্ধজাহাজ নিয়ে সমুদ্রপথে আক্রমণ চালানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এবার বেশ কঠিন হবে। কারণ, হরমুজ প্রণালির ওপর এখনো ইরানের শক্ত সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি রয়েছে।
তাই সমুদ্রপথের বদলে আকাশপথে কমান্ডো অভিযান চালানোর সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন সমরবিদরা। ভি-২২ অসপ্রে, চিনুক বা ব্ল্যাক হকের মতো অত্যাধুনিক ও দ্রুতগামী সামরিক হেলিকপ্টার ব্যবহার করে মার্কিন সেনাদের সরাসরি এসব দ্বীপে নামানো হতে পারে। কিন্তু বিশ্লেষকদের শঙ্কা, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে মার্কিন সেনারা হয়তো সহজেই দ্বীপগুলোতে নামতে সক্ষম হবেন, কিন্তু এরপরই তারা ইরানের দিক থেকে আসা ‘গুলি বর্ষণের সহজ লক্ষ্যবস্তু’ বা এক ধরনের মরণফাঁদে আটকে পড়তে পারেন। বৈরী পরিবেশে সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খল দুর্বল হয়ে পড়লে এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের অভাব থাকলে এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।