• বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০১:০৫ পূর্বাহ্ন

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট ভাঙার বড় কূটনৈতিক সাফল্য

Reporter Name / ৪ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ও শক্তিশালী চালিকাশক্তি হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা বৈদেশিক মুদ্রা। আর এই রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রে যে কটি দেশ সবচেয়ে বড় অবদান রেখে আসছে, তার মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া অন্যতম。 ঠিক এই কারণেই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজের প্রথম বিদেশ সফরের প্রারম্ভিক গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান。 বর্তমানে দেশটির আবাসন বা কনস্ট্রাকশন খাত, পাম অয়েল প্ল্যান্টেশন এবং ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাক্টরিগুলোতে লাখ লাখ বাংলাদেশী কর্মী নিজেদের শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন, যাদের পাঠানো কষ্টার্জিত অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী রাখতে সরাসরি ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে。 তবে বিগত দিনগুলোতে এই সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারে জেঁকে বসা রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত অভিবাসন খরচ এবং অবৈধ দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে সাধারণ কর্মীদের ভাগ্য নিয়ে চরম ছিনিমিনি খেলা হয়েছে। অতীতে মাত্র কয়েকটি এজেন্সির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের কারণে একেকজন সাধারণ শ্রমিককে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় গুনতে হতো, যার ফলে মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রথম দুই-তিন বছর কর্মীরা কেবল সেই ঋণের টাকাই শোধ করতেন। এই পুরো নেতিবাচক পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে দেশের চলমান ডলার সংকট কাটাতে প্রধানমন্ত্রীর এই সফল সফরটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি ঐতিহাসিক ‘টার্নিং পয়েন্ট’ এবং ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে。

কুয়ালালামপুরে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে。 এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান অর্জন হলো—বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মী নিয়োগে ঢাকার পক্ষ থেকে দেওয়া প্রস্তাবগুলো মালয়েশিয়া সরকার নীতিগতভাবে গ্রহণ করেছে。 কর্মী নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়াটিকে যেন সম্পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক রাখা যায় এবং কেবল বিশ্বাসযোগ্য ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমেই যেন বাংলাদেশীরা মালয়েশিয়ায় যেতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে দুই দেশই একমত প্রকাশ করেছে。 এখন থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের একচেটিয়া পকেট ভারী করার সুযোগ থাকবে না; বরং নিয়োগকর্তার প্রকৃত ও কেস বাই কেস চাহিদার ভিত্তিতে এবং কেবল লাইসেন্সধারী বৈধ এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানো সম্ভব হবে। খুব শীঘ্রই এই নতুন ও পরিচ্ছন্ন কর্মপদ্ধতি পুরোপুরি তদারকি করতে দুই দেশের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ (Joint Working Group) আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসতে যাচ্ছে।

মালয়েশিয়া বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও ডিজিটাল ইকোনমির দেশ হিসেবে সুপরিচিত。 এই সফরে মালয়েশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর ও হাইটেক ইন্ডাস্ট্রির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথেও প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে。 এর সুদূরপ্রসারী মানে হলো, বাংলাদেশ এখন আর শুধু কম দক্ষ বা শারীরিক শ্রমের শ্রমিক পাঠানোর সনাতন বৃত্তে আটকে থাকবে না; বরং মালয়েশিয়ার আধুনিক হাইটেক ইন্ডাস্ট্রির জন্য বাংলাদেশ থেকে দক্ষ আইটি (IT) এবং ইঞ্জিনিয়ারিং জনবল পাঠানোর এক বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে。 এই দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির ফলে প্রবাসীদের ব্যক্তিগত আয়ের অংক এবং দেশের রেমিট্যান্সের পরিমাণ একধাক্কায় বহু গুণ বেড়ে যাবে。 পাশাপাশি, যৌথ বিবৃতিতে বড় সুখবর দিয়ে জানানো হয়েছে যে, দুই দেশ ২০২৭ সালের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ (Free Trade Agreement) চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নিয়ে জোরকদমে কাজ করছে。 এর বাইরে ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান এবং আসিয়ান (ASEAN) জোটে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়েও মালয়েশিয়ার কাছ থেকে জোরালো কূটনৈতিক সমর্থন মিলেছে。

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের দালিয়ান সম্মেলনে অংশ নিতে মালয়েশিয়া থেকে গতকালই চীনের পথে রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে চীনের মূল কর্মসূচিতে যাওয়ার আগে প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশের জন্য যে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সাফল্য এসেছে, তা দেশের ভঙ্গুর রিজার্ভ এবং ডলার সংকটের বাজারে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সুবাতাস বইয়ে দেবে。 সাধারণ কর্মীরা যখন নামমাত্র বা যৌক্তিক খরচে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমাতে পারবেন, তখন তারা বিদেশে যাওয়ার প্রথম মাস থেকেই অবৈধ হুন্ডির পথ পরিহার করে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে টাকা পাঠানো শুরু করবেন。 অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে এনে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির চলমান ডলার সংকট ও রিজার্ভের খরা দূর করতে সরাসরি একটি শক্তিশালী ‘বুস্টার ডোজ’ হিসেবে কাজ করবে।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category